ধ্যানবিন্দু। বইপাগলদের তীর্থক্ষেত্র যেন এই দোকান…
কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউজ– এ কথাটা যেমন এক নিমেষে বলে ফেলি তেমনই ইদানীং বলছি ‘ধ্যানবিন্দু’র কথাও। দু’হাজার বারো সালের সেপ্টেম্বরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট শিশুটি আজ বাংলা সাহিত্যের বাজারে একটা গুরুত্বপূর্ণ আসন। সেই তিন ফুট বাই তিন ফুট সরু পরিসরের টিনের ঘর ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের কোণে বকুল গাছের তলায়। সেখান থেকে যাত্রা শুরু তাঁর। আর আজ সফল ভাবে প্যারামাউন্টের বিপরীতে জমজমাট ভাবে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে।
শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিনকে প্রাধান্য দিয়ে এই উদ্যোগ। কেন? অভীক ব্যানার্জি, ধ্যানবিন্দুর কর্ণধার, বলছিলেন, তাঁরা ছোটোবেলায় বন্ধুরা মিলে দেওয়াল পত্রিকা করতেন। কলেজে উঠে চাঁদা তুলে করেন ‘নীল অপেরা’। নিজেদের পকেটের পয়সায় সেই পত্রিকা বের করে তারপর সারাবছর তা রাখা থাকত ঘরে। আর, নিকটাত্মীয় বা পরিচিতদের শেষ অবধি বিলিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু অভীকদা ভাবলেন, যে এইটা লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যত হতে পারে না। তাঁকে পৌঁছাতে হবে পাঠকের কাছে। যারা সত্যিই পড়তে চান এই লিটল ম্যাগাজিন। পাঠক তৈরি করতে হবে। “ হ্যাঁ, পাঠক আমরা তৈরি করি। তবে, আনেথিকাল ভাবে মিথ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে নয়।” ধ্যানবিন্দু পত্রিকার পাশাপাশি নিজেদের প্রকাশিত বইও আছে। অভীকদা বললেন, “একটা বইয়ের উপযোগিতা, ভালোলাগা আমরা বুঝতে পারলে সেটুকু মানুষকে বলি। এক বছর হয় না , দু’বছর হয় না। পাঁচ বছর বাদে হলেও মানুষ ধীরে ধীরে পড়লেন। এখানেই জয়। যেমন, সেই মাকড়সাটা যে গুহার দেওয়ালে সাতবারের মাথায় উঠেছিল। পঞ্চাশ জন পাঠক তৈরি হলে তা আড়াইশো জনের সমান, কারণ সেক্ষেত্রে তাদের থেকে অন্যরাও বইটি হাতে নিয়ে দেখেন।”
ধ্যানবিন্দুর ভাণ্ডারে বিবিধ পত্র-পত্রিকা
পাতিরাম-এ তখন এই ছোটো ছোটো লিটল ম্যাগাজিনগুলো প্রায় রিফিউজড হত। অথচ, তথাকথিত বেশি দামের ‘লিটল’ নামাঙ্কিত পত্রিকারা অনায়াসে শোভা পেত। সে সমস্ত খারাপ লাগা থেকেও এই উদ্যোগ। ধ্যানবিন্দু সেই স্বপ্ন, যারা দু টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকা, তিরিশ টাকা, হাতে লেখা, জেরক্স করা—সমস্ত ধরনের পত্রিকা রাখে। সুব্রতদা এবং অভীকদারা কমার্শিয়াল হাউজের বই যদি বা কোনটা রাখবো, কোনটা নয় ভাবেন– কিন্তু পত্রিকা রাখা নিয়ে কখনো না করেন না। কারণ অভীকদা মনে করেন, ধ্যানবিন্দু পত্রিকার জন্যই, লিটল ম্যাগাজিনের জন্যই। এটা সেই দোকান, যেখানে ছশো টাকা দামের শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার বইয়ের সঙ্গে সাদরে বাস করছে তিরিশটাকার লিটল ম্যাগাজিন। কারণ, সাহিত্যকে হাত ধরে চিনিয়ে দেয় এঁরা। মাকে ছেড়ে পা ফেলা তো সম্ভব নয়।
তবে কী লাভের চিন্তা একেবারেই করো না অভীকদা? উত্তরে হেসে বললেন, “ঈশানী, দোকানটা যখন করেছিলাম তখন এত কিছু ভাবিনি। এই দোকানটা আমার জীবিকা নয়, প্যাশন ছিল। সেই প্যাশন থেকেই আজ যা দেখছিস। এটা আমার একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল , বলতে পারিস স্ট্যান্ডপয়েন্ট। ফলে কমার্শিয়াল বইয়ের প্রফিট মার্জিন বেশি– তা কখনো ভাবিনি। তবে একটা কথা বুঝেছিলাম, ভর্তুকি দিয়ে কোনো উদ্যোগ সফল হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।” তিন বছর অভীকদা ধ্যানবিন্দু থেকে কোনো মাইনে নেননি। কারণ, তখন লড়াই ছিল এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার। ধ্যানবিন্দুর পাঠকের বয়স নেই। যারা এঁর আগের জেনারেশন তারাও ধ্যানবিন্দুর উপর নির্ভর করেন।
আরও পড়ুন
১০০ ডিঙিয়েও আজও অমলিন ‘সন্দেশ’-এর স্বাদ
ভালোবাসার ছোট্ট ঘটনাগুলোর একটা অভীকদা বললেন। রবিশংকর বল, একজন বিখ্যাত লেখক অথচ ভারি লাজুক মানুষটি, দোকানের ভিড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সুব্রত আমার জন্য বইটা রেখে দাও, আজ টাকা নেই পরদিন নিয়ে যাব। ছোটো ছোটো পারিবারিক ভালবাসা। ঘরোয়া সম্পর্কের উষ্ণতা। লিটল ম্যাগাজিনকে স্বাধীনতা দিয়েছে ধ্যানবিন্দু। ছোটো পত্রিকা, ছোটো প্রকাশন সবার জায়গা ‘বইপত্র’ নামক ধ্যানবিন্দুর নিজস্ব রিভিউয়ের জায়গা। ছোটো কাগজকে যেন বড় কাগজের দাক্ষিণ্য না নিতে হয়। বেশিরভাগ পত্রিকা চলে ব্যক্তিগত পরিচিতির উপর। কিন্তু অভীকদা বলেন, সাহিত্য আর ব্যক্তিগত পরিচিতি আলাদা। সুযোগ কেন নেবেন কেউ পরিচিত হবার। তাঁর পত্রিকা ‘নীল অপেরায়; ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, “বাংলা কবিতায় এখন মামা ভাগ্নের যুগ চলছে।”
বুড়োর চায়ের দোকানের কাছে ছিল এরকমই একটা দোকান। ‘কাগজের বাগ’ নামে একটা বন্ধ গুমটি। সে আশির দশকের কথা। অয়ন চক্রবর্তী , পরীদা সবার সাহায্যে এই দোকান শুরু হয়। সুব্রতদা তখন গয়না বিক্রি করতেন। তার আগে বারো বছর একটা ঠেলে নিয়ে যাওয়া দোকানে উনি বই বিক্রি করতেন। বিহারি মালিকের সঙ্গে সংঘাত হয় কী বই রাখা হবে তা নিয়ে। সেই অভাব আর বাড়ি বাড়ি তারপর গয়না বিক্রি। অভীকদা আর সুব্রতদা তারপর এই উদ্যোগ নিলেন। আজ সেই ছোট্ট পরিসর থেকে ধ্যানবিন্দু উঠে এসেছে।
কলেজ স্ট্রিট চত্বরে ধ্যানবিন্দুর দোকান
আপনারা হয়তো দেজ-এ যান, আনন্দ-তে যান, গিফটের জন্য বই খোঁজেন। কী বই তার খেয়াল রাখেন না। তবে ধ্যানবিন্দুতে কেউ উপহার কিনতে নয়, পাঠক হিসেবে আসে। ছোটো পত্রিকাকে, প্রকাশকদের যেমন কমার্শিয়ালের ছাতার থেকে বাইরে এনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে অভীকদারা। পাঠক তৈরি করেছেন নিজেদের হাতে। লিটল ম্যাগাজিনকে নিয়ে বহু মানুষের অজ্ঞতা দূর করেছেন। আজ এই দোকানটার জন্য অভীকদা অরুন্ধতীদি চাকরি ছেড়ে দিনরাত এক করে খাটছেন। এই স্বপ্নকে সত্যি করেছেন। মাঝরাতে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে অভীকদাকে পাঠানো রবিশংকর বলের সেই মেসেজ
" ধ্যানবিন্দু এক স্বপ্নের বইঘর।"