১০০ ডিঙিয়েও আজও অমলিন ‘সন্দেশ’-এর স্বাদ

সন্দেশ পত্রিকার ১০০ বছর উপলক্ষে দুই বাঙালি পরিচালকের শ্রদ্ধা

“বাবু তাহাকে বলিলেন, ‘দেখ দু-আনার সন্দেশ কিনিয়া আন তো।’ চাকরটি দু-আনার পয়সা লইয়া সন্দেশ কিনিতে বাহির হইল, আর ভাবিল সে কী বিপদেই পড়িয়াছে। ‘সন্দেশ’ বলিলে তাহার দেশের লোক বুঝে ‘সংবাদ’। সে জিনিস যে আবার কী করিয়া পয়সা দিয়া কিনিতে পারা যায়, আর গেলেও তাহা যে কোথায় মিলে, তাহা সে কোনমতেই ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিল না। কাজেই বেচারা আর কী করে! সে পয়সা ক-টি হাতে লইয়া পথের পাশে দাঁড়াইয়া রহিল। যে আসে তাহাকেই বিনয় করিয়া বলে, ‘এ ভাইয়া! দো আনাকো সন্দেশ কাঁহা মিলি?”

‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় এমনই কিছু মজার গল্প লিখছেন রসিক উপেন্দ্রকিশোর। ‘সন্দেশ’! দেখতে যেমন লোভনীয়, খেতে তেমনই উপাদেয়- আবার তেমনই উপকারী ও পুষ্টিকর, ‘সন্দেশ’- কে না ভালোবাসে! আজ্ঞে, এ সন্দেশ ঠিক ‘সে’ সন্দেশ নয়। একেবারে আগাগোড়া রংবেরঙের বাহারি কাগজের তৈরি সন্দেশ। আজ থেকে ঠিক একশো পাঁচ বছর আগে এই সন্দেশ প্রকাশ করেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ১৯১৩ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হল এই পত্রিকার যাত্রা। এরপর ১৯১৫ সালে উপেন্দ্রকিশোর চলে গেলে সন্দেশের হাল ধরেন সুকুমার রায়। সন্দেশ শুধুমাত্র সাহিত্য পত্রিকা নয়, এর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য ও পরম্পরা। ১৯৩৪-এর পর দীর্ঘ সাতাশ বছরের বিরতি। ১৯৬১ সালের মে মাসে সত্যজিৎ রায় ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যৌথ সম্পাদনায় পুনঃপ্রকাশ ‘সন্দেশ’-এর। একে একে সম্পাদক হয়ে যোগদান করেন লীলা মজুমদার, নলিনী দাশ, বিজয়া রায় এবং সন্দীপ রায়। যে সন্দেশ এখনও অব্যাহত। 

 

এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার শতবর্ষের কথা মাথায় রেখে সৌম্যকান্তি দত্ত এবং সৌরদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্মাণ করেছেন ‘সন্দেশ ১০০’ তথ্যচিত্র। যেটি নির্মিত হয়েছে মূলত ক্রাউড ফান্ডিং-এর সাহায্যে। এগিয়ে এসেছেন সন্দীপ রায়ও। এর আগে সন্দেশ পত্রিকাকে নিয়ে এমন তথ্য সংরক্ষণের কাজ হয়নি। সেদিক থেকে বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এই কাজ প্রশংশার দাবি রাখে। ‘সন্দেশ ১০০’ তথ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সন্দীপ রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, প্রচেত গুপ্ত, সব্যসাচী চক্রবর্তী প্রমুখ। থাকছেন সন্দেশ পরিবারের সদস্যরাও। প্রায় এক ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রে দেখা যাবে উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার এবং সত্যজিৎ রায়ের করা সন্দেশের প্রচ্ছদ, অলংকরণ, হেডপিস, অরিজিনাল ব্লক, লেখার পাণ্ডুলিপি এবং অজস্র দুর্লভ ফটো ও রেকর্ডস। এছাড়া বিভিন্ন সময়ের সন্দেশী লেখক-শিল্পী গোষ্ঠীর সাক্ষাৎকার তো থাকছেই।

প্রবাদে আছে ‘রসে বশে বাঙালি’- ‘সন্দেশ’ পত্রিকা একা হাতে শুধুমাত্র কিশোর বয়সের কথা ভেবে রীতিমত একটা লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল। সেই লড়াইয়ের অংশীদার হয়েছেন কিশোর থেকে তরুণ সমাজ। এখনও সন্দেশ পত্রিকায় লিখে গর্ব অনুভব করেন তরুণ লেখকরা। কে বলেছে ‘সন্দেশের জমানা আজ আর নেই!’ তরুণ পরিচালকদ্বয় আরেকবার তা প্রমাণ করলেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়ে গেছে এই তথ্যচিত্রের প্রদর্শন। পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন টলি পাড়াও। ‘সন্দেশ ১০০’ টিমকে কুর্নিশ। 
 

Developed by DXDasia