
প্রয়াত কিংবদন্তি পরিচালক এবং কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি এবং সত্তরের শক্তিশালী এই চলচ্চিত্র নির্মাতা বারবার কৃতজ্ঞ থেকেছেন কবিতা আর পেইন্টিং-এর কাছে। তাঁর সিনেমার ফ্রেমে ঢুকে পড়ে কবিতার ইমেজারি, আবার কবিতায় চলে আসে রাতের ঘন কালো স্বপ্নদৃশ্যের ফ্রেম। এই অবাধ্য যাতায়াতই ছিল তাঁর নেশা। সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজ বা ভাষাকে বুদ্ধবাবু ব্যাকরণগতভাবে মানতে চাননি। বরং প্রথাগত চলচ্চিত্রায়ণের বাইরে বেরিয়ে ‘সিস্টেম’কে বারবার আঘাত করা, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের প্রতি সমস্ত প্রতিবাদী স্বর ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর সিনেমা-দর্শন। ১০ জুন, বৃহস্পতিবার সকাল ছ'টা নাগাদ বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্য জগতে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চলে গেলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। বৃহস্পতিবার সকাল ছ'টা নাগাদ ঘুমের মধ্যেই দক্ষিণ কলকাতায় নিজের বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দূরত্ব’ থেকেই নিজস্ব ভাষার প্রতি ঝোঁক বুদ্ধদেবের। খোঁজাও শুরু। তাঁর চলচ্চিত্র শুধুমাত্র বাঙালি বা ভারতীয়দের ভাবিয়েছে এমন নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের যে ধারাবিবরণী রচিত হতে থেকেছে দশকের পর দশক, বুদ্ধদেবের নাম জ্বলজ্বল করছে সেখানে। সমস্ত দেখা, সামাজিক প্রতিফলন, রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের জটিল মনস্তত্ত্ব বারবার তাঁর ফ্রেমে উঠে আসতে থেকেছে।
এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এমন একেকটা সময় আসে, যখন মনে হয় খিদে মিটছে না। আমি সিনেমা করে চলেছি এত বছর ধরে, তবু প্রত্যেক নতুন সিনেমা আরম্ভ করি যখন, মনে হয় নতুন সিনেমা করছি। ভয় করে, আতঙ্কিত থাকি। প্রত্যেকবার নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করি, বদলাতে থাকি। তেমনি খিদে প্রত্যেকবার আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আর আমি বুঝতে পারি যে, এর মধ্য দিয়েই আমি বেঁচে থাকি। এটা না থাকলে আমার বেঁচে থাকাটাই মুশকিল হতো।”
সমস্ত শিল্পীই হয়তো তাঁদের নিজেদের কাজে বেঁচে থাকতে চান এবং অন্যকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেন। কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের বেঁচে থাকার সংজ্ঞাটা একটু অন্যরকম। তিনি সরাসরি বাস্তবের মাটিতে হাঁটেন না, আবার কল্পনায় গা ভাসিয়ে দেওয়া তাঁর স্বভাববিরোধী। তিনি বাঁচেন গভীর অতলান্ত এক জাদু-বাস্তবতায়। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র মানুষ কথা বলে না বা ইঙ্গিত দেয় না। সম্মতির আহ্বান আসে গাছপালা, পশুপাখির থেকেও। দাশগুপ্ত বলেন, “প্রপস একটা বাস্তবজাত ভাবনা, বাস্তবে একটা চেয়ার থাকবে, তার ওপর কুশন থাকবে, কিন্তু আমার সমস্যা হচ্ছে ওই বাস্তবটা নিয়ে। আমার কখনও মনে হয়নি, বাস্তব শেষ কথা। বারবার মনে হয়েছে, এক্সটেন্ডেড রিয়্যালিটির কথা। যখন এটার কথা কেউ ভাববে, তখন প্রপসগুলো ইনসিগনিফিকেন্ট হয়ে যাবে। তখন আর ওগুলো কাজ করবে না, তখন দেখা যাবে ব্যাগ উড়ে বেড়াচ্ছে, চাদর উড়ে বেড়াচ্ছে, বালিশ উড়ে বেড়াচ্ছে। কোলবালিশ রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। এই যে বাস্তবাতীত জগৎ, এটা বাস্তবের আরেকটা দিক, সেটা আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে।”
আর ঠিক এখানেই বাকিদের চেয়ে অনেকটা আলাদা হয়ে যান তিনি। জীবন যেন আস্ত ম্যাজিক। সে অনবরত খেলা দেখাচ্ছে। সেই খেলা আন্দোলিত হচ্ছে শরীরের প্রতিটি কোষে, রক্তে-শিরায়-ধমনীতে। সেখান থেকেই অদৃশ্য কেউ একজন কোনো এক অন্ধকার থেকে ছুঁড়ে দিচ্ছে প্রশ্ন। উত্তর কী আর কীভাবে দেওয়া যায় তার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। এখানেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে একটা শূন্যস্থান বা স্পেস। যেখানে বসে আছেন পরিচালক এবং দর্শক। যে স্পেস থেকে তৈরি হচ্ছে পরিচালক-দর্শকের বন্ধুত্বপূর্ণ যাত্রা। প্রত্যেকে নিজেদের মতো ভাবার অবকাশ পেয়ে যাচ্ছেন। এই খেলা খেলতে ভালোবাসতেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।
শুধুমাত্র নগরজীবনের কথাই বলেননি তিনি, বলেছেন গ্রামের হতদরিদ্র ‘দলিত’ মানুষদের কথা, সামান্য ভাত খাওয়ার অধিকারের কথা, মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের কথা। ‘দূরত্ব’ থেকে ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘তাহাদের কথা’ থেকে ‘আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা’, ‘আনোয়ার কা আজিব কিস্সা’ থেকে ‘উড়োজাহাজ’ – দীর্ঘ এক সুতো বুনে চলেছেন বুদ্ধদেব। ৭৭ বছর বয়সে চলে গেলেন কিংবদন্তি পরিচালক-কবি। সংস্কৃতির যেকোনোরকম সংকটে তাঁকেই দরকার ছিল। জরুরি সময়ের নতুন ভাষা-পথের সন্ধান দিতে পারেন একমাত্র তাঁর মতো শিল্পীরাই।
