
দর্শকদের পারদ ছিল তুঙ্গে, কিন্তু সেই কৌতূহলের পরিণতি বড্ড করুণ
২০১৫ সালে বাংলাদেশের বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের অভিযান প্রকাশনী বইটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেই দুই বাংলায় তা ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে দেয়। এই বই কেনার জন্য কলকাতা বইমেলায় অভিযান প্রকাশনীর স্টলে ভিড় উপচে পড়ে, এবং তা নিজের চোখেই দেখা।
পাঠক গোগ্রাসে কেন গিলেছিল এই উপন্যাস, সেই প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাওয়া ভুল কিছু নয়। কারণ কেন্দ্রীয় চরিত্রে মুশকান জুবেরির শরীরী অভিব্যক্তি, কথা বলা, চাহনি এমনকি তাঁর একাকিত্ব সবটাই রহস্যময়। তিনি যখন নিরুপম চন্দ (রাহুল বোস)-কে বলেন, “কোনও প্রমাণ ছাড়া আপনি কি শুধু অনুমানের ভিত্তিতে ভদ্রমহিলাদের ছেলেধরা উপাধিতে ভূষিত করেন?” – তখন পরিস্থিতি ক্রমশ বদলে যায়। গল্প নতুন মোড় নিতে শুরু করে।
শুরুতেই কিছু কথা বলে নেওয়া দরকার। এই ওয়েব সিরিজটি পরিচালনা করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত সৃজিত মুখার্জি। তিনি ট্রেলারে চমক দেন, উত্তেজিত করেন। যিনি একবার সংলাপে লিখেছিলেন, ‘মরবে মরো, ছড়িও না’ – তিনি কীভাবে ছড়াতে পারেন? আমবাঙালি এসবই ভাবেন। তাঁর কাজও দেখেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড়ও ওঠে। কিন্তু সৃজিতবাবু এসব কোনোদিনই বিশেষ পাত্তা দেননি। এটা তাঁর ফেসবুক এবং ট্যুইটার প্রোফাইলে গেলেই বোঝা যায়। কিন্তু কেমন হল ‘রেক্কা’ (সিরিজিটির সংক্ষিপ্ত নাম)? এ প্রশ্ন এখন বাংলার ঘরে ঘরে। অনেকেই সিরিজটি দেখেও ফেলেছেন। আজ অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে লিখতে বসা।
মূল উপন্যাসকে খুব বেশি এদিক ওদিক করেননি সৃজিত। তাই উপন্যাসে কী ছিল আর ওয়েব সিরিজে কী হল – এসব আলোচনা বৃথা। বরং এই আলোচনার ফোকাসে থাকবে ‘হইচই’-এর সিরিজটিই। মুশকান জুবেরি খুব একা। একটা বিশাল প্রাসাদে তাঁর সঙ্গী একাকিত্ব। সুযোগ পেলেই তিনি রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে ওঠেন। কখনও রান্নাঘরে, কখনও বাথরুমে, কখনও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে, কফিতে চুমুক দিতে দিতে। কখনও গল্পের মূল এসেন্স মাথায় রেখে সেই গান হয়, কখনও জাস্ট এমনি এমনিই। সিরিজের পর্বগুলির নামও রবিঠাকুরের গানের লাইন দিয়েই তৈরি করা হয়েছে। মুশকানের রেস্তোরাঁর নাম ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ খেতে আসেননি তো কার কী এসে যায়? আরেহ্ এসে যায়। এটা নিয়েই তো গল্প। সেই রেস্তোরাঁর নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে গেছে। সে রান্নার স্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। মুশকান জুবেরি স্পেশাল মেনু মুশকান নিজেই বানান। তার যে কী স্বাদ তা রাহুল বোসের এক্সপ্রেশনেই বোঝা যায়।
সৃজিত মুখার্জি রহস্য ভালো জমাতে পারেন। ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘জুলফিকার’, ‘কাকাবাবু’ সিরিজ, ‘ভিঞ্চিদা’ কিংবা ‘দ্বিতীয় পুরুষ’ – রহস্যকে তিনি উদযাপন করেন। তেমনই কিছু হবার কথা ছিল আলোচ্য ওয়েব সিরিজে। হলও। কিন্তু কীভাবে হল সেইটি গুরুত্বপূর্ণ। হইচই ফেলে দেওয়া একটা উপন্যাস, সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত পরিচালক, তাবড় তাবড় সব অভিনেতা – সব মিলিয়ে দর্শকদের পারদ ছিল তুঙ্গে। কিন্তু সেই কৌতূহলের পরিণতি বড্ড করুণ।
গল্প বলে দেওয়া এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে যাঁরা উপন্যাসটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন। সেই মুশকান জুবেরি নাকি ডাইনি, গ্রামে তাঁকে নিয়ে গুজব আছে। তদন্ত করছেন বিশেষ গোয়েন্দা অফিসার (ছদ্মবেশি সাংবাদিক) নিরুপম চন্দ। সব নিয়ে ৯ খানা পর্ব। সাধারণত সৃজিতের ছবিতে টেকনিক্যাল দিকগুলো বেশ শক্তিশালী হয়। মূলত ক্যামেরা, সম্পাদনা ও আবহ। এখানেও কিছু দৃশ্যে ক্যামেরার কাজ চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সম্পাদনা বড্ড দুর্বল। পাশাপাশি এটাও সত্যি পাহাড় কোলে বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রীদের বা ভেঙে পড়ে থাকা বিমানকে সৃজিত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু কেন এত দীর্ঘ সংলাপের ব্যবহার? কেন এত সংগীত বা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের (সংগীত পরিচালক- জয় সরকার) ব্যবহার? সেখানে গল্প অনুযায়ী অনেকক্ষেত্রেই সাইলেন্স ডিম্যান্ড করে। সিরিজের গতিও বেশ ধীর। থ্রিলারধর্মী ওয়েব সিরিজে এরকম ধীর গতি তার নিজস্ব প্রাণ হারায় বলেই মনে হয়। যত্রতত্র গানের ব্যবহার কিছু জায়গায় হাসির খোরাকও দিয়েছে। একটা দৃশ্যের কথা বলব – আতর আলির সঙ্গে যখন নিরুপম চন্দের দেখা হয়, ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয়। আতর আলি জানিয়েছিলেন, তার মোবাইলের ডিসপ্লেতে সমস্যার কারণে কোনো নম্বর দেখা যায় না। কোনো নম্বর ডায়াল করে কল করতে পারেন না। তাই প্রয়োজনে নিরুপম চন্দকেই কল করতে হবে। কিন্তু কিছু দৃশ্য পর মুশকান জুবেরির বাড়ির পাঁচিলে বসে সেই মোবাইল দিয়েই নিরুপম চন্দকে কল করছেন। আবার যখন নিরুপম কলব্যাক করল, তখন ডিসপ্লে দেখে কল রিসিভ করছেন আতর আলি। এটা বোধহয় বেশ বড়ো ভুলই।
দুটি মহিলা চরিত্রের কথা বলব, যাদের কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। সিরিজটি দেখার পর মনে হয়েছে, এরা না থাকলেও মূল গল্পে কোনও সমস্যা হত না। শেফালী (শ্রেয়া ভট্টাচার্য) এবং সোমারানি (হুসনে শবনম)। এখানে অত্যন্ত ম্লানভাবে তাঁদের দেখানো হল। চরিত্রদুটির কোনো ভিত্তিই রইল না। ধীর গতির এই গল্পে তাঁরা আরও একটু জায়গা পেলে মন্দ হত না। অন্যদিকে ফালু চরিত্রে দেবপ্রিয় মুখার্জি খানিক একঘেয়ে অভিনয় করেছেন সুন্দর একটি চরিত্র পেয়েও। সিরিজে তাঁকে দেখতে ভালো না লাগলেও, অতিক্ষুদ্র দৃশ্যে তাঁর সঙ্গে সোমারানির কেমেস্ট্রি মন্দ লাগেনি।
মুশকান জুবেরি চরিত্রে আজমেরি হক বাঁধন বাংলাদেশের খুবই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। সম্প্রতি তাঁর একটি ছবি কান চলচ্চিত্র উৎসবেও মনোনীত হয়েছিল। মুশকান চরিত্রে তিনি কেমন অভিনয় করবেন, তার জন্য একটা আগ্রহ বরাবরই ছিল। কিন্তু হায়! তিনি মিষ্টি হাসিই হেসে গেলেন, বাঁকা হাসি আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তাঁর চরিত্রের দাবি ছিল তিনি সুন্দরী যৌবনা এবং একইসঙ্গে বুদ্ধিমতী। এখানে তাঁকে দেখতে ভালো লাগলেও অভিনয় দুর্বল বলে মনে হয়েছে। চরিত্রের গভীরের রাস্তা তিনি আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মূল গল্পে মুশকান তো শুধুমাত্র সিডাকটিভ নন!
রাহুল বসুর অভিনয়ও বিশেষ গতি পায়নি। তবে স্বল্প চরিত্রে অঞ্জন দত্তকে ভালো লেগেছে। অনির্বাণ চক্রবর্তীও রয়েছেন স্বমহিমায়। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অভিনয়। তাঁর অভিব্যক্তি এবং ডায়ালেক্টে আতর আলি প্রাণ পেয়েছে।
আরও পড়ুন: সৃজিতের হাত ধরে বড়োপর্দায় ফিরছেন মহানায়ক
ভয়, রহস্য, ছিমছাম ঘুমন্ত এক মফস্সল, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে আদ্যোপান্ত রহস্যময়ী এক মোহিনী – এলিমেন্টস ছিল অনেককিছুই। কিছুতে মন ভরল। অনেককিছুতেই মন ভরল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই রেস্তোরাঁয় কেন খেতে এলেন না, সবশেষে তো এই উত্তর পেতেই হবে। সিরিজে তার আভাস ছিটেফোঁটা আছে মাত্র। খুবই সামান্য বিষয়। তাকে অযথা এত বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখানো, এ সব বাঙালির স্বভাব। ব্যাপারটি হল, যে জমিদার বাড়িটিকে নিয়ে এত কাণ্ড, এত হইহুল্লোড়, অনেকবছর আগে সেই জমিদারের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এক চিঠিতে তার কারণও ব্যাখ্যা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের তাৎপর্য এইটুকুই। সিরিজটি দেখতে ভালো লেগেছে। যেমন লাগে সৃজিতের কাজ দেখে। তবে কী কেন কীভাবের কারণ অনুসন্ধান করলেই দেখার রাস্তা ক্রমশ ছোটো হতে থাকবে। রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে…’।
ওয়েব সিরিজঃ রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি
মূল উপল্যাসঃ মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
পরিচালনাঃ সৃজিত মুখার্জি
অভিনয়ঃ আজমেরি হক বাঁধন, রাহুল বোস, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, অঞ্জন দত্ত, অনির্বাণ চক্রবর্তী
প্রযোজনাঃ ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্
