ছোটোদের গল্প নিয়ে বড়োদের ছবি হবে না, এমন ধারণা রক্ষণশীল : ‘রে’ রিভিউ

যতটা সত্যজিৎ-হীন ভাবা হচ্ছে এই সিরিজকে, ততটা দরিদ্র সে নয়

সম্প্রতি ‘নেটফ্লিক্স’-এ সত্যজিৎ রায় রচিত চারটি গল্প অবলম্বনে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘রে’ দর্শকমহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। অনেকের অভিযোগ এই যে মূল আখ্যান থেকে চিত্রনাট্য অনেকখানি দূরে সরে যাওয়ায় এই সিরিজের পর্বগুলিতে সত্যজিতের চিন্তার নির্যাস বা রচনার ধারাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই অভিযোগ নেহাতি অবান্তর, তার কারণ খুব স্বাভাবিকভাবেই আখ্যান থেকে চিত্রনাট্যকে চলচ্চিত্র উপযোগী হয়ে উঠতে অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় — এ আমাদের জানা কথা। সত্যজিৎ নিজে আজীবন সাহিত্যধর্মী ছবি করেছেন এবং প্রয়োজন মতো মূল আখ্যানের সঙ্গে চিত্রনাট্যে তফাৎ ঘটিয়েছেন। তাছাড়াও আমাদের মনে রাখতে হবে, লেখকের চিন্তার নির্যাস বলে অদতে কিছু হ​য় না; ওটা একটা মিথ। যে কোনও আখ্যান তার পাঠের মাধ্যমে পুনর্নিমিত হ​য়। পরিচালকের অভিযোজন তাঁর ব্যক্তিগত আখ্যান পাঠ ও ব্যাখ্যা। অন্যদিকে পরিচালক যে ছবিটি আমাদের উপহার দিলেন, সেটি এক নতুন আখ্যান — তার পাঠ ও ব্যাখ্যা হওয়া উচিত স্বতন্ত্র। যদিও বিশ্বে এমন অনেক সাহিত্যধর্মী ছবির উদাহরণ অছে, যা মূল আখ্যানকে এতটুকু বিচলিত করেনি — যেমন মাইকেল হানেকের কাফকার অসমাপ্ত উপন্যাস অবলম্বনে ‘দ্য ক্যাসেল’, কিন্তু সেই সব ছবি কখনও ব্যতিক্রম আবার কখনওবা পরিচালকের বিশেষ কোনও নিরীক্ষার প্রয়াস।

সত্যজিতের দর্শকদের আর এক অভিযোগ এই যে, সত্যজিৎ যেখানে ছোটোদের জন্য বা কিশোর পাঠকদের কথা মাথায় রেখে এই গল্পগুলি লিখেছিলেন, সেখানে এই সিরিজের পর্বগুলিতে তা হয়ে উঠেছে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য​। এই অভিযোগটিও যথেষ্ট সমস্যাজনক, কারণ কোনও ছোটোদের গল্প নিয়ে বড়োদের ছবি হবে না, এমন ধারণা রক্ষণশীল। তাছাড়া বিশ্বের বিখ্যাত শিশু-কিশোর কাহিনিগুলির মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যায় বিস্তর হিংস্রতা বা যৌনতার হাতছানি — যেমন ‘লিটল রেড রাইডিং হুড’। সত্যজিতের গল্পে সেই সম্ভাবনা নেই, এ কথা কে বলতে পারে? তাই গল্প থেকে চিত্রনাট্যে রূপান্তরের মাধ্যমে এই  ওয়েবসিরিজ সত্যজিৎ এবং তাঁর কাজকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয়।এই সিরিজে সত্যজিৎকে অনুভব করা যাবে কিছুটা অন্যভাবে। তিনজন সমসাময়িক পরিচালক: সৃজিত মুখার্জি, অভিষেক চৌবে এবং ভাসন বালা তৈরি করেছেন চারটি পর্ব চারটি গল্প অবলম্বনে। পর্বগুলিতে বারবার ফিরে আসে সত্যজিতের রাজনীতি ও দর্শন। কখনও আবার সত্যজিৎ হয়ে ওঠেন ‘টেকস্টুয়াল’ বা ‘ইন্টার-টেকস্টুয়াল রেফারেন্স’। প্রথম (‘ফরগেট মি নট’ ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’) ও তৃতীয় (‘হাঙ্গামা হ্যায় কিউ বার্পা’ ‘বারীণ ভৌমিকের ব্যারাম’) পর্বে খুব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সত্যজিতের ক্ষমতা বিরোধী রাজনীতি ও মূল্যবোধের দর্শন। ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন রাষ্ট্রীয় স্তরে ঘটতে পারে, অবার ব্যক্তিগত স্তরেও তা ঘটা স্বাভাবিক। আসলে স্বৈরাচার আমাদের মনের মধ্যেই তার জাল বিস্তার করে। কিন্তু যে সকল সুতো দিয়ে গাঁথা হয় সেই স্বৈরাচারের ভাবমূর্তি, তার একটিতে ধরে টান দিলে এক লহমায় তা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঠিক এমনটাই দেখানোর চেষ্টা করেছেন সৃজিত সিরিজের প্রথম পর্বে, যেমনটা সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন তাঁর ‘হীরক রাজার দেশে’-র মতো ছবিতে। মানুষের বিবেক বোধ হয়ে ওঠে তৃতীয় পর্বের বিষয়। অপরাধ স্পৃহা স্বৈরাচারের মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অপরাধ বা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা বিবেক বোধের পরিচয় ও মনুষ্যত্বের জয়। এই প্রসঙ্গে সব চেয়ে প্রথমে মনে আসে ‘মহানগর’ ছবিটি ও তারপর ‘সীমাবদ্ধ’।ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবক্ষয়ের বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে নির্মিত সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে (‘বহুরূপিয়া’ ‘বহুরূপী’) সৃজিত নিয়ে আসেন এক মনমুগ্ধকর ‘ইন্টার-টেকস্টুয়ালিটি’। পর্বটির শুরুতেই প্রেমে আহত হয় গল্পের প্রধান চরিত্র ইন্দ্রাশিস।ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’।সত্যজিতের ছবির জগতের সঙ্গে যাঁদের পরিচিতি রয়েছে, তাঁদের বুঝতে কোনও অসুবিধে হবে না যে, এই দৃশ্য ‘চারুলতা’-র স্মৃতি উসকে দেয়। চারুলতার ব্যর্থ প্রণয়ের কষ্ট ফিরে আসে ইন্দ্রাশিসের চোখের বলিরেখায়। পরবর্তী একটি দৃশ্যে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল অঞ্চলে অবস্থিত কোনও বহুতলের ছাদ মনে করিয়ে দেয় ‘প্রতিদ্বন্ধী’ ছবির সেই বিখ্যাত ‘রুফ সিন’। যদিও দুটি দৃশ্যের ‘কন্টেক্সট’ আলাদা, তবুও প্রতিদ্বন্দ্বের ‘টেনশন’-টি ফুটিয়ে তোলার জন্যই হয়তো সৃজিত এই ‘ইন্টার-টেকস্টুয়ালিটির’ ব্যাবহার করেছেন। অন্যদিকে চতুর্থ পর্বে (‘স্পটলাইট’’স্পটলাইট’) ‘নায়ক’ ছবিটির কিছু মুহূর্ত ও অন্তর্দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আগেই উল্লেখ করেছি, সত্যজিৎ এই পর্বগুলিতে অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠেন ‘টেকস্টুয়াল রেফারেন্স’। তাই চতুর্থ পর্বে বারবার আমরা গল্পের নায়ককে পরতে দেখি সত্যজিতের হাতে আঁকা ছবির প্রিন্টওয়ালা টি-শার্ট। আবার তৃতীয় পর্বে দেখা যায় সত্যজিতের গল্পের খাতা। এইভাবে সত্যজিৎ রায় এই গল্পগুলির মধ্যে ঢুকে পড়েন, যেমনভাবে রবীন্দ্রনাথ ঢুকে পড়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘নৌকাডুবি’-তে।পর্বগুলি নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশকিছু চমক চোখে পড়ে। যেমন দ্বিতীয় পর্বের শেষ দৃশ্যে প্রধান চরিত্রের অন্ধত্বের সঙ্গে মিশে যায় স্ক্রিনের অন্ধকার। এই অন্ধকার একই সঙ্গে রূপক ও আক্ষরিক। সেখানে দর্শকের দৃষ্টি এক হ​য়ে যায় অভিনেতার দৃষ্টিহীনতার সঙ্গে। তৃতীয় পর্বে ট্রেনের কামড়া হয়ে ওঠে প্রধান চরিত্রের মন, যেখানে ভিড় করে আসে স্মৃতি ও অপরাধবোধ। তবে চতুর্থ পর্বের নির্মাণ কিছুতা দুর্বল বলে মনে হয়। ভাসন বালার কাজে সিনেম্যাটোগ্রাফি খুব সুন্দর হলেও চিত্রনাট্য মজবুত ন​য়। হর্ষবর্ধন কাপুরের অভিন​য় দক্ষতা আলি ফজল, কেকে মেনন বা মনোজ বাজপেয়ী-দের মতো এখনও গভীরতা অর্জন করেনি। এই পর্বে গানের ব্যবহারও যথাযথ লাগেনি।

তবে এক জায়গায় এসে চারটি পর্বই সত্যজিতের ছবির উদ্দেশ্যকে তুলে ধরে: কেবল বিনোদন নয়, ছবির মাধ্যমে নান্দনিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তুত করা। তাই যতটা সত্যজিৎ-হীন ভাবা হচ্ছে এই সিরিজকে, ততটা দরিদ্র সে নয়।

 

 

Developed by DXDasia