দ্য টপ – দ্য টপ – দ্য টপ

ফিরে দেখা সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক' : অভিনেতার ব্যক্তি-নিঃসঙ্গতার গল্প

“Success is not the key to happiness. Happiness is the key to success. If you love what you are doing, you will be successful.” -Albert Schweitzer

সাফল্য এবং সুখ — কোনটি কার মাপকাঠি তারই সন্ধানে সত্যজিৎ রায়ের নায়ক (১৯৬৬)। ইউরোপীয় নব্য-বাস্তববাদকে হাতিয়ার করে চলা সত্যজিতের চলচ্চিত্র ভাবনার কেন্দ্রে ছিল মূলত পরিবর্তনশীল ব্যবস্থার সঙ্গে সংগ্রামরত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ঘটেচলা বিপর্যয় এবং নানান সুখ-দুঃখের কাহিনি। তাঁর প্রত্যেকটি ছবিতেই ব্যক্তি মানুষের জীবন সফরকে আমরা খুঁজে পাই। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ‘নায়ক’ ছবিটিও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সত্যজিতের অন্যান্য ছবির থেকে ‘নায়ক’-এর আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণ হল লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজকে ভেঙে তাকে সাধারণের ভিড়ে মিশিয়ে দেওয়া।

৫৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এতগুলো বছর পার করেও ‘নায়ক’ সমান গুরুত্বের সঙ্গেই প্রাসঙ্গিক থেকে যায়। সুপারস্টার অরিন্দম মুখার্জির জীবনযুদ্ধ থেকে এ প্রজন্মের তরুণ শিল্পীরাও যেমন অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়, তেমনই সৃষ্টিশীলতার তুঙ্গে পৌঁছনোর পর এক আত্মক্ষয়কারী শূন্যতার প্রতিবিম্বের মুখোমুখি দাঁড়ানো যায় নিঃশব্দে।

বেশ কিছু ফ্ল্যাশব্যাক এবং স্বপ্ন-দৃশ্য সহযোগে পরিচালক অরিন্দম মুখার্জীর জীবনের যে সফরকে উপস্থাপন করেন, তাকে দুটি অধ্যায়ে ভাবা যেতে পারে। প্রথমটিতে অরিন্দম মুখার্জির কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে নায়ক হয়ে ওঠা, এবং দ্বিতীয়টিতে নায়ক হিসাবে তার টিকে থাকার যুদ্ধ। একদিকে গতি এবং অন্যদিকে স্থিতি (স্ট্যাগনেশান) — এ দুইয়ের টানাপোড়েনে নির্মিত সত্যজিতের নায়ক। ট্রেনযাত্রা যেন নায়কের জীবন সফরেরই মেটাফোর হয়ে উঠেছে। ট্রেন সফরের মাঝে অত্যন্ত কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে যায় ‘বিবেক’রূপী জার্নালিস্ট অদিতি সেনগুপ্তের সঙ্গে। ইন্টারভিউয়ের অজুহাতে ‘দেবতুল্য’ নায়কের জীবনরহস্য উঠে আসে। এ যেন একপ্রকার নায়কেরই আত্মানুসন্ধান।

ছবিতে ফ্ল্যাশব্যাকগুলো মূলত ব্যবহার করা হয়েছে গতিময় অতীতকে ধরার জন্য। এক হার না মানা উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আত্মবিশ্বাসেরর নাম অরিন্দম মুখার্জি। মধ্যবিত্ব বাঙালির ম্যাটিনি আইডল হয়ে ওঠা, সাফল্যের রাস্তায় আসা সমস্ত প্রতিকূলতাকে সরিয়ে দেওয়া, ফিল্ম অ্যাক্টিংয়ের ব্যাপারে মেন্টর শঙ্করদার দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুল প্রমাণ করে দেওয়া, নবাগত হিসাবে প্রতিষ্ঠিতের জায়গা দখল করে নেওয়া, প্রতিশোধস্পৃহা — এসবই অত্যন্ত বর্ণময় এবং গতিশীল। তাই তো আজও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংগ্রামী তরুণ শিল্পীদের কাছে সে প্রেরণা হয়েই থেকে গেছে। কে ভুলতে পারে তার সেই উদ্ধত, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সংলাপ, “করবো। আলবাৎ করবো। আই উইল গো টু দ্য টপ… দ্য টপ… দ্য টপ…।”

ছবির স্বপ্নদৃশ্যগুলি আসলে আত্ম-বীক্ষণ। গতির মাঝে আসা এই স্থিতি (স্ট্যাগনেশান) আসলে মনে করায় যে শুধুমাত্র এগিয়ে চলাই সাফল্য নয়। চলার পথে নিজের বিবেক এবং ব্যক্তি-সম্পর্কের সঙ্গে প্রতিনিয়ত করে যাওয়া আপোষ যে ভয়ঙ্কর শূন্যতার জন্ম দেয়, তাকে অতিক্রম করা অসম্ভব। হাড়হিম করা একটি স্বপ্নদৃশ্যের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, যেখানে নায়ক টাকার পাহাড়ে টাকার চোরাবালির  মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে টাকা ফুঁড়ে ওঠা কঙ্কালের হাত যাতে ধরা আছে রিং হয়ে চলা ফোনের রিসিভার। এই ডাক কি মহাকালের? শেষ হয়ে আসার ইঙ্গিত? তলিয়ে যেতে যেতে তার বাঁচার আকুতি। শঙ্করদা তাকে উদ্ধার করতে পারতো, কিন্তু করলো না। লোভ এবং প্রলোভনের ফাঁদে পা দেওয়ার পাপ কি এভাবে প্রতিশোধ হয়ে ফিরে এলো শঙ্করদার প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে?

‘নায়ক’ আসলে হিরোইক ক্যারিশ্মার আড়ালে রক্তমাংসে গড়া এক ব্যক্তি মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট নিঃসঙ্গতার গল্প। ট্রেন সফরে অন্যান্য যে চরিত্ররা এসেছে তারা সকলেই কোনো না কোনোভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। তাদের প্রায় সকলেই  ক্লিষ্ট। নায়ক আসলে তাদের একজন হয়েও তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন। তার একমাত্র যোগাযোগের সেতু হয়ে ওঠে অদিতি, যার সঙ্গে কথপোকথনে এই আপাত সফল, স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষটি ছদ্মবেশ খুলে বেরিয়ে এসে ধরা দেয় অনেক ত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে। তাকে বলতে শোনা যায়, “আমরা ছায়ার জগতের মানুষ, আমাদের বেশি কথা বলতে নেই। তাহলে পাবলিকের কাছে আমাদের ইমেজ নষ্ট হয়ে যায়।” তাই একজন ব্যক্তি যখন বিপননযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হয় তার সাফল্যের প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

*নায়ক (১৯৬৬) | রচয়িতা ও পরিচালক: সত্যজিৎ রায় | শ্রেষ্ঠাংশে: উত্তমকুমার, শর্মিলা ঠাকুর | প্রযোজনা: আরডি বনশাল অ্যান্ড কোং

 

Developed by DXDasia