সত্যজিৎ রায়ের অনুসন্ধিৎসু চোখ বরাবরই পাখির চোখ করেছে বর্ণিল বাংলাকে
সত্যজিতের ক্যানভাস বরবরাই ছিল বৈচিত্র্যময়। নানা রং ও বর্ণের সমাবেশ ছিল তাতে। তাঁর বাংলাও ছিল তেমনই বহুবর্ণের। একটি মাত্রায় সে বাংলাকে আটকে সুযোগ নেই। একেকটি ছবিতে সত্যজিত বাংলাকে ছুঁতে চেয়েছেন একেকভাবে। কোথাও সে বাংলা বিমর্ষ ভঙ্গিতে ধরা পড়লেও, কোথাও হাজির হয়েছে অসংখ্য রং নিয়ে।
'পথের পাঁচালি'র কথাই ধরা যাক। এ বাংলা প্রকৃত অর্থে বিভূতিভূষণের বাংলা। যেহেতু গল্পটা বিভূতিবাবুর হাত ধরেই সৃষ্টি। কাজটা সহজ ছিল না সত্যজিতের জন্য। কিন্তু কঠিন সেই কাজটাই অনেক মায়া ও মমতা দিয়ে করেছেন সত্যজিৎ। যে কারণে বিভূতিকে সঙ্গে নিয়েই সে বাংলা অনেকাংশে সত্যজিতের হয়ে উঠেছে। যে কারণে দৃশ্যগুলো কেবল গতানুগতিক দৃশ্য হয়ে থাকেনি। প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে সেই দৃশ্যগুলোয়।
শুটিং-এর অপু-দুর্গার সঙ্গে মহড়ায় রায় বাবু
একেবারেই শুরুর দৃশ্যে দুর্গা যখন জঙ্গলের ভেতরে ছুটোছুটি করছিল, সেই দৃশ্য প্রথমবার দেখার পর আমার নিজের গ্রামের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। এই লেখাটা লেখার সময় আরেকবার যখন দেখতে বসি, সেই একই অনুভূতি আবার ফিরে আসল। প্রথম দেখার সেই অনুভূতি। সত্যজিৎ তাই কখনো পুরোনো হওয়ার নয়, ম্লান হওয়ার নয়। অনেক অনেক বছর পরও সত্যজিৎ একইরকমভাবে প্রাসঙ্গিক থেকে যান। এর অন্যতম একটি কারণ হলো, আমাদের নস্টালজিয়ার সুক্ষ্ম বিষয়গুলোকেই বারবার ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর আমাদের চিয়ায়ত নস্টালজিয়ার অনেকটা জুড়েই বাস গ্রামের। গ্রাম মানে এবার আপনি গ্রামবাংলাও ভাবতে পারেন আবার শহুরে বাংলাও। সত্যজিৎ নিজেও হয়তো বারবার সেই বাবলের ভেতর ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা যখনই বাংলার কথা ভেবেছি, সেটা হয় দুর্গার জঙ্গলে ছুটাছুটি কিংবা কাশবনের ভেতর খেলতে খেলতে অপুর ছুটে যাওয়ার সেই অমর দৃশ্য।
পথের পাঁচালির এই একটা দৃশ্যই আমার মনে হয় পুরো একটা সিনেমা। এই দৃশ্য কখনো পুরোনো হয় না। এই বাংলাও কখনো ম্লান হয় না। এমনকি বাস্তবে এই দৃশ্যের আর কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও, আমার ধারণা পথের পাঁচালি থেকে এই দৃশ্য বাস্তবে আবার সৃষ্টি করা যাবে। সত্যজিৎ বাংলাকে এতটাই `শুদ্ধভাবে’ সৃষ্টি করেছেন। যেখানে কোনো কিছুই বানানো বলে মনে হয় না। কোনো দৃশ্যেই কোনো খাদ নেই। অপু-দুর্গার পায়ের নিচে ভাঙতে থাকা মাটি যেন আমার নিজের পা-ও স্পর্শ করতে পারে। যেন এই বাংলার পথ ধরে আমি হাজার বছর ধরে হেঁটে যেতে পারব। সেই কাশবন ছুঁয়ে পার করতে পারব আরও অনেক জীবন।
পাঁচালির ঠিক উল্টোটা আবার আমরা পাই 'আগন্তুক'-এ। মনমোহন মিত্রের চোখ দিয়ে আমরা এবার অন্য এক বাংলাকে দেখি৷ একজন আউটসাইডারের চোখ দিয়ে দেখি বাংলাকে। যিনি সব ছেড়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। তার ফিরে আসাই যে বাংলাকে আবার মূর্ত করে তোলে। অপু-দুর্গার বিস্ময় দৃষ্টি যেন এখানে অন্যভাবে ফিরে আসে। যেখানে কোমল পানীয় স্বাদের ভেতর দিয়েও নিজের অতীতকে খুঁজতে চেয়েছেন মনমোহনবাবু। এই ছবিতে মূলত অতীতচারী ও সংস্কৃতি খোঁজায় প্রয়াসী এক সত্যজিৎকেই আমরা খুঁজে পাই। মনমোহনবাবুর ভেতর দিয়ে অন্য এক বাংলাকে তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। যা কিনা ঘটনার ভেতরে বসে হয়তো কখনও আবিষ্কার করা যায় না।
এই ছবির শেষের দিকের একটি দৃশ্যে আমরা দেখি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে এক আদিবাসী গ্রামে চলে গেছেন। এটা আসলে সত্যজিতের বৈচিত্র্যময় বাংলাকে খুঁজে দেখার এক ধরনের প্রয়াস। যা কিনা 'পথের পাঁচালি' থেকে একেবারেই ভিন্ন। এসেন্সটাও একেবারে আলাদা।
আগন্তুক ছবির দৃশ্য
তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, 'আগন্তুক' সত্যজিতের সর্বশেষ সিনেমা এবং 'পথের পাঁচালি' প্রথম। বাংলা বা স্বদেশ দেখার ক্ষেত্রে হোক সেটি ল্যান্ডস্কেপ কিংবা চেতনাগত দিক থেকে আমার মনে হয় সত্যজিৎ একটা বৃত্তপূরণ করেছেন। যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানেই যেন ফিরে গেলেন। কারো হয়তো ভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু আমার এমনটাই মনে হয়।
এখানে দুটি সিনেমার কথা উল্লেখ করা হলেও, সত্যজিতের প্রতিটি সিনেমা আসলে তাই। তাঁর অনুসন্ধিৎসু চোখ বরাবরই পাখির চোখ করেছে বর্ণিল বাংলাকে। যা চিরায়ত ও শাশ্বতও বটে৷ সেখানেই আমরা বারবার ফিরে যেতে চাই।