
তুলসী চক্রবর্তী ছিলেন টলিপাড়ার ‘পরশপাথর’
তুতুলসী চক্রবর্তী যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করতেন, তাহলে অভিনয় দক্ষতার জন্য তিনি ‘অস্কার’ পেতেন – এমনটাই মনে করতেন চিত্র-পরিচালক সত্যজিৎ রায়। কিন্তু হায়! দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়েই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে দিলেন তুলসী। অভিনয়ের গুণে যে-কোনো চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতে পারতেন তুলসী চক্রবর্তী। ভালো গাইতে পারতেন, নাচেও দক্ষতা ছিল, তবলা এবং নানান বাজনায় ছিলেন পারদর্শী। এগুলির সঙ্গে যোগ হয়েছিল অভিনয়ের সাবলীলতা। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী এই মানুষটি রুপোলি পর্দায় তাক লাগিয়ে দিতেন দর্শকদের।
সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে সুচিত্রার সঙ্গে তুলসী
ছোটোবেলা কেটেছিল কাকার কাছে। কাকা প্রসাদ চক্রবর্তীর অর্কেস্ট্রা ছিল। তিনি স্টার থিয়েটারে কাজ করতেন। কাকার সঙ্গে থিয়েটারে যেতেন তুলসী, তখনই তাঁর মধ্যে অভিনয়ের প্রাথমিক আগ্রহ জেগেছিল। কর্মজীবনের অনেক রকম পেশার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। মদের দোকানে বয়ের কাজ করেছেন, সার্কাসের জোকারও ছিলেন। ছাপাখানায় কম্পোজিটারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, এমন সময়ে একটা থিয়েটারের হ্যান্ডবিলে নজর পড়ে তাঁর। অভিনয়ের প্রতি সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। ছাপাখানার ৩২ টাকার মাইনে ছেড়ে মাসিক ৮ টাকার মাইনেতে স্টার থিয়েটারে যোগ দিলেন। এভাবেই ঘুরে গেল জীবনের মোড়।
সত্যজিৎ রায় জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন, তুলসী চক্রবর্তী না থাকলে তিনি ‘পরশপাথর’ বানাতে পারতেন না। কিংবদন্তি এই অভিনেতা যদিও ‘পরশপাথর’ ছাড়া অন্য কোনও চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেননি। ‘সহ অভিনেতা’ হিসেবে তাঁকে পাওয়া গেছে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘একটি রাত’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘পথের পাঁচালি’, ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ ইত্যাদি ছবিতে। উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করেছেন প্রায় তিন ডজন চলচ্চিত্রে। সিনে-পাড়ায় কথিত আছে, উত্তমকুমারের চেয়েও তাঁকে বেশি টাকার অফার করা হয়েছিল সহ অভিনেতা হিসাবে। কিন্তু শ্রদ্ধেয় তুলসী তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, তাঁর সমসাময়িক অভিনেতাদের মধ্যে একমাত্র শক্তিশালী অভিনেতা উত্তমকুমার। তাই উত্তম তুলনামূলক কম টাকা পাবেন, এ মেনে নিতে পারবেন না। কতটা বিনয়ী এবং কাজের প্রতি সৎ হলে এমনটা ভাবা যায়। আজকালকার দিনে যা একেবারেই দুলর্ভ।
পথের পাঁচালি ছবিতে মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে
অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীর বাড়ি মাত্র আড়াই ফুট চওড়া। হাওড়ায় এখনও গেলে দেখা যাবে। গলির নাম কৈলাস বোস থার্ড বাই লেন। ছোট্ট গলিটার একদম শেষপ্রান্তে একটা ভাঙাচোরা টিনের চালের দেড়তলা বাড়ি। জং ধরা তালা ঝুলছে দরজায়। প্রায় ৬০ বছর আগে অভিনেতা প্রয়াত হন। দশ বছর আগে গত হয়েছেন তাঁর স্ত্রী ঊষারানিদেবী। তাঁরা নিঃসন্তান। সেই থেকে এই বাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বাসিন্দারা মধ্য হাওড়ার খুরুট অঞ্চলের এই বাড়িটিকে হেরিটেজ করার দাবি তুলেছেন সম্প্রতি। এলাকার মানুষই আগলে রেখেছেন এই বাড়ি।
পরশপাথর ছবিতে একাই রাজ করেছেন তুলসী চক্রবর্তী
সাল ১৯৫৩। ‘কই, কোথায় গেলে গো’ – এই সংলাপ তখনকার দিনে ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার বাংলার ঘরে ঘরে। নির্মল দে’র ছায়াছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। প্রায় আট সপ্তাহ রমরমিয়ে চলেছিল প্রেক্ষাগৃহে। উত্তম-সুচিত্রা তখন নবতম জুটি। তাঁদের থেকেও দর্শক মনে রেখেছিলেন, তুলসী-মলিনাকে। দর্শকদের দাবি ছিল এই ছবির নায়ক-নায়িকা আসলে তাঁরাই। অ্যান্ড্রু রবিনসন একবার তুলসী চক্রবর্তী সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “Chakrobarty recalls Chaplin to his best. Instead of moustache, he has a pair of eyes of bulbous as a frog’s which he opens wide with every emotion known to man.” তুলসী চক্রবর্তী সার্কাসে থাকার সময় অনেক রকমের খেলা শিখেছিলেন। শিখেছিলেন লাঠি ঘোরানোর আদবকায়দা। যা পরবর্তীকালে অভিনয়ের সময় বিভিন্ন চরিত্রে ব্যবহার করেছিলেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে। ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রে খুব অল্প সময়ের উপস্থিতি ছিল তাঁর। গ্রামের পাঠশালার পণ্ডিতমশাই। ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, কাউকে বকছেন। সেই সময় তাঁর সেই ছড়ি ঘোরানো খুব মন দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে কতটা সাবলীল অভিনেতা ছিলেন তিনি। আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। একবার এক সিনেমার শ্যুটিং চলাকালীন বৈষ্ণব সাজার অনুমতি পেয়েছিলেন তুলসী চক্রবর্তী। বৈষ্ণব সেজে শ্রীখোল হাতে পরিচালকের সামনে যেতেই পরিচালক তাঁকে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তুলসী চক্রবর্তী শট দিলেন। খোল বাজাচ্ছেন, মুখে হরিনাম, চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে বুক। পরিচালক এত খুশি হলেন যে দেড় মিনিটের শট তিনি চার মিনিট নিলেন এবং তা সম্পাদনার পর মূল সিনেমাতেও রাখলেন। ছোটোবেলায় শেখা হারমোনিয়াম, তবলা, পাখোয়াজ কাজে দিয়েছিল অভিনয়েও।
‘কই, কোথায় গেলে গো’ – এই সংলাপ তখনকার দিনে ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার বাংলার ঘরে ঘরে। নির্মল দে’র ছায়াছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। প্রায় আট সপ্তাহ রমরমিয়ে চলেছিল প্রেক্ষাগৃহে। উত্তম-সুচিত্রা তখন নবতম জুটি। তাঁদের থেকেও দর্শক মনে রেখেছিলেন, তুলসী-মলিনাকে। দর্শকদের দাবি ছিল এই ছবির নায়ক-নায়িকা আসলে তাঁরাই।
আসলে তুলসী চক্রবর্তী যখন যা শিখেছেন, সেটাই অত্যন্ত মনোযোগ নিয়ে শিখেছেন। এইরকম ধৈর্য তাঁর ছিল। শ্যুটিং-এ আসার জন্য তাঁকে ট্যাক্সির অফার করা হলে সরাসরি না বলতেন। কারণ তুলসী পছন্দ করতেন বাসে বা ট্রামে যাতায়াত করতে। এমনই এক হৃদয়খোলা শিল্পী তিনি। এই সততার বড্ড অভাব আজ। তাই বারবার ফিরে যেতে হয় সেইসব দিনে, যে দিনগুলোয় রাজ করেছেন তুলসীর মতো অভিনেতারা। যাঁরা নিজের ‘দেখনদারি’ প্রচারের থেকে শিল্পকেই গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন বারবার।

