বাংলাদেশের ‘বাতিঘর’ — যেন আস্ত বইমেলার মাঠ
‘বাতিঘর মানেই প্রতিদিন বইমেলা’ -এমন একটা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে চট্টগ্রামের লোকমুখে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরের চেরাগীপাহাড় মোড়ে ছোটো পরিসরে একটি সাধারণ দোকানের আশ্রয়ে শুরু হয় বাতিঘর। পরবর্তীতে ২০১২ সালে প্রেসক্লাব ভবনের নিচতলায় বড় আকারে এর সম্প্রসারণ ঘটে। বাতিঘর বই-দোকানের প্রতিষ্ঠাতা দীপঙ্কর দাশ। এক দশক আগে যিনি কিনা চাকরি করতেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে৷ তখন না ছিল পুঁজি, না ছিল ভালো রুজি। যে বয়সে তরুণরা চাকরি, কেরিয়ার, টাকা এসবের পেছনে ছুটছে- দীপঙ্করবাবু তখন আন্তর্জাতিক মানের এক গ্রন্থবিপণি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে আছেন।

প্রেসক্লাব সংলগ্ন বাতিঘর প্রতিষ্ঠার ঠিক অল্পকিছু দিনের মধ্যেই চট্টগ্রামের পাঠক/পাঠিকা মহলের মধ্যমণি হয়ে ওঠে এই গ্রন্থবিপণি, হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। দোকানের ভিতর অসংখ্য বইসমেত আলোকোজ্জ্বল সাজসজ্জায় যে-কোনো বই-পড়ুয়াকে আকৃষ্ট করবে। বাতিঘর দোকানের পরিবেশটাকেই পাল্টে দিয়েছে। যা যে-কোনো বই-দোকানের থেকে আলাদা।
ভিতরে প্রবেশের পর আরও বিচিত্র চমক মুগ্ধ করে পাঠককে। মেঝেতে কাঠের পাটাতন, মোটা দড়ি ঝুলছে, দুই এক জায়গায় পড়ে রয়েছে পণ্যবাহী কনটেইনার। আর স্বচ্ছ কাচের ফাঁক গলে চোখ মেলে দিলে যেন মনে হয়, বইয়ের সমুদ্রবাহী এক জাহাজ একটু একটু করে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরান্তে। বিচিত্র বইয়ের ঘ্রাণ, ঘোরগ্রস্ত নিয়ন-আলোয় যেন এক নান্দনিক প্রদর্শনী চোখের সামনে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে।

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, দর্শন, ইতিহাস, নাট্যকলা, সঙ্গীত, বিশ্বসাহিত্য, আঞ্চলিক সাহিত্যের আলাদা আলাদা বিভাগ করা আছে। আছে বইমেলায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের বিচিত্র সমাহার সহ প্রায় সত্তর থেকে আশি হাজার বই। আছে বসে বসে বই পড়ার সুব্যবস্থা, আছে ক্যাফে কর্নার। সেখানে নতুন লেখক থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিক, শিল্পীরা আসেন আড্ডা দিতে, সৃষ্টি হয় পাঠক-লেখক সম্পর্ক, কবিতে-কবিতে মেলবন্ধন। কথায়, তর্কে-বিতর্কে মুখর হয়ে ওঠে এই গ্রন্থবিপণি।

দীপঙ্কর দাশের স্বপ্নের বাতিঘর তাঁর স্বপ্নের মতোই সমৃদ্ধ আর সুন্দর হয়ে উঠছে দিনদিন৷ তাঁর কথায়, “বড় পরিসরে এই গ্রন্থবিপণিটি গড়ে তুলতে সাত বছর সময় লেগেছে। আন্তর্জাতিক মানের এই গ্রন্থবিপণি করতে নগদ যে খুব বেশি পুঁজি লেগেছে তা নয়, কারণ বন্ধুবান্ধব, প্রকাশক ও প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষের সবাই খুব সহযোগিতা করেছেন। আমার স্বপ্ন হল সারাদেশে বিপুল পরিমাণে পাঠকসমাজ তৈরা করা এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে আন্তর্জাতিক মানের গ্রন্থবিপণি প্রতিষ্ঠা করা।”

বলা বাহুল্য, বাতিঘর এখন একটি প্রকাশনারও নাম৷ ২০১৭ সালের ২১শে ডিসেম্বর তারা রাজধানী ঢাকার বাংলামটর এলাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আট তলায় আরও বড় পরিসরে বাতিঘর প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিমধ্যে দীপঙ্কর দাশের এই বাতিঘর নতুন পাঠক তৈরিতে এবং বাঙালির সুন্দর মনন সৃষ্টিতে অনস্বীকার্য ভূমিকা রাখছে। একদিন বাতিঘরের এই বাতি, এই আলো, দেশে-বিদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে এই প্রত্যাশা সকলের।