
এই নীলকুঠির পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে কাজলা নদী
বাংলায় নীলকর সাহেবদের অত্যাচার এবং নীল বিদ্রোহের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। ১৭৭৭ সালে ফরাসি বণিক লুই বোনার্ড প্রথম ভারতে নীল চাষ শুরু করেন। ক্যারল ব্লুম নামের এক ইংরেজ নীলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তখন নীলের ব্যবসা ছিল খুব লাভজনক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুনাফা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলায় উৎপাদিত নীল। ১৮৩০ সাল নাগাদ সারা বাংলায় ১ হাজারেরও বেশি নীলকুঠি ছিল বলে জানা যায়।
প্রথম দিকে নীলকর সাহেবরা নীল চাষের জন্য কৃষকদের থেকে জমি কিনতেন অথবা ভাড়া নিতেন। পরবর্তীকালে তারা চাষিদের ওপর অত্যাচার শুরু করলেন। ভয়ানক নির্যাতন করে চাষিদের নীল চাষে বাধ্য করা হত। যে চাষি দাদন বা অগ্রিম অর্থ নিতেন, তিনি আর নীল চাষের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারতেন না। নীলকর সাহেবরা ছিলেন প্রতরণায় সিদ্ধহস্ত। তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের আইন তথা প্রশাসন। চাষিরা আদালতে গিয়েও সুবিচার পেতেন না। শেষে নীল চাষিরা বিদ্রোহ করেন। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে সংগ্রামের আগুন।
এখন আর নীলকর সাহেবরা নেই। কিন্তু নানা জায়গায় তাঁদের নীলকুঠিগুলি রয়ে গিয়েছে। সেগুলোকে নিয়ে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা রকম গল্প, জনশ্রুতি। বাংলাদেশের মেহেরপুর জেলার আমঝুপি নীলকুঠিকে ঘিরে রয়েছে এমনই গল্প। লোকে বলে থাকেন, এই বাড়িতেই নাকি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য লর্ড ক্লাইভ ষড়যন্ত্র করেছিলেন মির জাফরের সঙ্গে। তবে বেশির ভাগ গবেষকের মতে, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

মেহেরপুর জেলা সদর থেকে মোটামুটি ৬ কিলোমিটার দূরে আমঝুপি গ্রামে এই নীলকুঠি অবস্থান করছে কাজলা নদীর পাশে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮১৫ সাল বা তার কয়েক বছর পরে এটি স্থাপিত হয়েছিল। প্রথম দিকে এখানে নীলকুঠি থাকলেও পরবর্তীকালে এই স্থাপত্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হত। প্রায় ৭৭ একরের মতো জায়গা জুড়ে গোটা নীলকুঠি চত্বর। প্রবেশপথ রয়েছে দু’টি। চত্বরের মাঝখানে মূল ভবন। দু’দিকে ফুলের বাগান। এখানকার এক বিশেষ দ্রষ্টব্য কবুতরের ঘর। চিঠি আদানপ্রদানের জন্য যে সব পায়রাকে কাজে লাগানো হত, তারা এই ছোট্ট ঘরেই থাকত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। মন্ত্রীসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার এক আমবাগানে, যার অবস্থান আমঝুপি নীলকুঠির কাছেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই নীলকুঠিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
তথ্যঋণ – ফারুখ আহমেদ, খাদিজা খাতুন স্বপ্না, সোমনাথ ভট্টাচার্য।
