ঋতুপর্ণের যাপনে রবীন্দ্রনাথঃ আড্ডায় প্রবুদ্ধ ব্যানার্জী ও ইন্দ্রজিৎ সেন — শেষ পর্ব

“ঋতু পারফেকশনিস্ট এবং খুঁতখুঁতে ছিল ঠিকই, তা বলে কাজে অযথা নাক গলাত না”

(গত পর্বের পর)

ইন্দ্রজিৎঃ গান রেকর্ডিংয়ের কোনো বিশেষ ঘটনা মনে পড়ছে?

প্রবুদ্ধঃ বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটনাই মনে আছে। ‘গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে’-র কথা তো জানিসই। কৌশিকী এবং ওঁর কিছু ছাত্রী গেয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে আসার আগে ঋতুর সম্পর্কে আরও কিছু বলে নিতে চাই। ঋতু পারফেকশনিস্ট এবং খুঁতখুঁতে ছিল ঠিকই, তা বলে কাজে অযথা নাক গলাত না। যে কোনো সূক্ষ্ম ভুল ধরিয়ে দিত। ওর সেলফ-অবসেশন এবং জটিল মনস্তত্ব সম্পর্কে মানুষের যে ধারণাই থাক না কেন, সমালোচনা গ্রহণ করতে পারত সহজভাবেই। 

সমালোচনা ঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে পারলে ও সেটাকে কেবল খেলোয়াড়িভাবে নিত তাই নয়, শরীরী ভাষাও পাল্টে যেত। আমি অনুভব করেছি, সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাকে ও সবার ওপরে রাখত। এবং তাঁরাও ওর সঙ্গে ধীরে ধীরে একাত্ম হয়ে যেতেন। আস্থার অভাব থাকলে ওর আচরণেই সেটা প্রকাশ পেত। তাই কঠোর পরিশ্রম করে ওর শ্রদ্ধা আদায় করে নিতে হত। তখন আস্থা চলে আসত নিজে থেকেই। 

এবার গানের কথায় আসি। একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমায় হতে হয়েছিল। ঋতু ভীষণভাবে চাইত যাতে আমি শ্যুটে হাজির থাকি। কিন্তু তাতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। ও সব জায়গাতেই গোটা টিমকে নিয়ে যেতে চাইত। স্টুডিও সিকোয়েন্সে নিজের হাতে আমার মেকআপ করে দেয়। আমার অধৈর্য সত্ত্বেও তারপর থেকে সেটাই হতে থাকে। এটা কি শুধুই আমার প্রতি শ্রদ্ধা? আসলে ক্যামেরার প্রতি আমার অনীহা এবং সবার সঙ্গে শ্যুটে আমার বিতৃষ্ণা ও লক্ষ করেছিল। ভেবেছিল, আমি হয়তো মেকআপ নিতে চাইব না।

সিনটাকে যেভাবে ও ভিস্যুয়ালাইজ করেছিল, তাতেও একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, সেই দৃশ্যে আমরা রেকিতে যাব। দু’জন ক্যামেরাম্যানও সঙ্গে থাকবে। প্রধান ক্যামেরাম্যান শমীক হালদার ঋতুর সঙ্গে হাঁটবে। সেটা শ্যুট করবে সঞ্জীব, আমাদের দ্বিতীয় ক্যামেরাম্যান। হঠাৎ ঋতু ঠিক করল যে আমি জানলা খুলে সঞ্জয় দাসের দিকে তাকাব। সঞ্জয় জুম রেকর্ডারে রেকর্ডিং করবে। ঋতু তখন শমীককে কিছু একটা বলতে যাবে, আমি ইশারা করে থামাব, কারণ রেকর্ডিং চলছে।

প্রথমবার আমি যখন সেটা করলাম, আমার আচরণ ছিল মৃদু। ঋতুকে স্পেস দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর তা পছন্দ ছিল না। চেয়েছিল আমি আঙুল তুলে দৃঢ়ভাবে নিষেধ করব। ও সেটা করেও দেখিয়েছিল আমায়।

‘জীবনস্মৃতি’র সেটে প্রবুদ্ধ ব্যানার্জী

ইন্দ্রজিৎঃ রেকর্ডিংয়ের সময় গান নিয়ে ঋতুপর্ণর মনোভাব কেমন ছিল?

প্রবুদ্ধঃ পরিচালকের দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোর ছিল। যেমন ধর, “হরিনাম নিয়ে জগৎ মাতালে”-র শুরুতে ও চেয়েছিল “যদি তোর ডাক শুনে” থাকুক। আমার মত ছিল কণ্ঠের বদলে “যদি তোর ডাক শুনে” বাঁশিতে করা হোক, যেটা দৃশ্যের সঙ্গে বেশি মানানসই হবে। ঋতু আমার কথা মেনে নেয়। 

“হরিনাম নিয়ে জগৎ মাতালে”-র জন্য আমি কার্তিকদাস বাউল এবং তাঁর দলকে বলেছিলাম। কিন্তু রেকর্ডিংয়ের সময় কার্তিক যতই চেষ্টা করুক না কেন, ঋতুর পছন্দ হয়নি। ওর বক্তব্য ছিল ছিল কার্তিকের গলা অনেক বেশি মার্জিত এবং সুরেলা, যা আম-মানুষের সঙ্গে যায় না। আমার তখন মনে হল, কার্তিকের বদলে কোনো অদক্ষ গায়ককে ডাকলে ভালো করতাম। অবশেষে কোরাস দিয়ে গাওয়ানো হল, কারণ তারা কার্তিকের মতো দক্ষ নয়। খানিক বেসুরো সেই গান শুনে ঋতু উচ্ছ্বসিত। বলল, “দ্যাখ এবার কী সুন্দর লাগছে শুনতে!”

যে দৃশ্যে রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরী দেবীর সামনে “কতবার ভেবেছিনু” গাইবেন, তাতে আরেকটা সমস্যা হাজির হয়। আমরা রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বরে এই গান শুনেছি। প্রথমে চেয়েছিলাম সমদর্শীকে দিয়ে সেভাবেই গাওয়াব। অডিশনের জন্য ওকে আমার বাড়ি ডেকে পাঠালাম। কিন্তু দেখি, সমদর্শীর গলা অনেক বেশি সমকালীন। 

তখন অন্য গায়কের খোঁজ করতে থাকলাম। কিন্তু পছন্দসই কাউকে পেলাম না। রেকর্ডিংয়ের আগের দিন পর্যন্ত এমন চলল। বন্ধুদেরও সাহায্য চেয়েছিলাম। তাদেরই একজন রাত ১টার সময় জানাল যে এমন একজনের খোঁজ পেয়েছে, যেরকম আমি খুঁজছিলাম। রাতুল চন্দ নামের একটি ছেলে, থাকে অনেক দূরে, অশোকনগরে। আমার তখন স্মার্টফোন ছিল না। তাকে এসএমএসে বললাম ওই গানের চারটে লাইন রেকর্ড করে মেল পাঠাতে। রাত তখন দু’টোর কাছাকাছি। পরের দিন সকালে রেকর্ডিংয়ের কথা ছিল। 

ঋতু জানত যে কণ্ঠশিল্পী না পাওয়ায় আমি চাপে আছি। কিন্তু সেটা আমার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু রেকর্ডিং নির্ধারিত সময়েই করতে হবে, কারণ স্টুডিও ভাড়া নেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

যাই হোক, রাতুল গান রেকর্ড করে পাঠাল। ওর গলার মধ্যে এক ধরনের প্রাচীনত্ব ছিল, যেটা আমার পছন্দ হয়। ওকে স্টুডিওতে ডেকে পাঠাই। ঋতুর সামনে দু’লাইন গেয়ে শোনাল, ঋতু তাতে খুশি। আমি যখন “গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে”-র বাঁশি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, ঋতু ওকে গানটা সম্পর্কে বুঝিয়ে দিতে লাগল – কোথায় চুপ থাকতে হবে, কোথায় জোর দিতে হবে, কোথায় না গেয়ে শুধু গুনগুন করতে হবে।

“মধুর তোমার শেষ যে না পাই” গানটি নিয়ে ঋতুর সঙ্গে আমার মতের অমিল হয়। শূন্যতা বোঝাতে আমি প্রবীণ কণ্ঠস্বর চেয়েছিলাম। কিন্তু ও চেয়েছিল অল্পবয়সী মিষ্টি গলা। কৌশিকীকে দিয়ে গাওয়ানো হল। আমি যেভাবে গাইয়েছিলাম, সেটা শুনে ঋতু বলল, “তোর ভার্সনটা আমি রাখছি, কিন্তু আমি অন্যরকম ইন্টারপ্রেটেশন চাই”। আমাকে জানাল কীভাবে গানটা কৌশিকীকে দিয়ে গাওয়াতে হবে, সেটাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হল।

আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর প্রেক্ষিতে ঋতু “আমার প্রাণের পরে” ব্যবহার করতে চেয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ওর পছন্দ ছিল পুরুষ কণ্ঠ, তাই আমি মনোময়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু পুরুষ কণ্ঠের ব্যবহার আমার মাননসই লাগেনি। মনে হয়েছিল, এরকম অগভীর দুঃখের প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে অসম্ভব। ঋতু যদিও গানটা রাখতে বদ্ধপরিকর, আমি ওকে নারী কণ্ঠ ব্যবহারের কথা বললাম। সঙ্গে সঙ্গে ও তাতে রাজি হয়। শ্রাবণী সেন গাইলেন সেই গান।

ঋতুপর্ণ সংগীত জগতের লোক ছিল না। এমনকি ওর গলাকেও খুব সুরেলা বলা যাবে না। কিন্তু ওর স্বভাব এত তীক্ষ্ণ ছিল যে বুঝতে পারত বড়ো প্রেক্ষাপটে কোনটা রাখা উচিত আর কোনটা নয়। সেই কারণেই আমাকে দিয়ে “যদি তোর ডাক শুনে”-র একটা অংশ গাইয়েছিল, কারণ ওর সেটা মানানসই মনে হয়েছিল।

ইন্দ্রজিৎঃ অর্থাৎ, তিনি সংগীতের কার্যকরী দিকগুলি নিয়ে (functional aspects) অনেকবেশি ভাবতেন..

প্রবুদ্ধঃ একেবারেই। আমার মনে আছে শুটিং শুরুর আগে ঋতু আমাকে প্রচুর রেফারেন্স মিউজিক শোনাত। যার বেশিরভাগটাই আমার শোনা ছিল। কিন্তু ঋতু জানত না। শেষ পর্যন্ত আমি বেশিরভাগ রেফারেন্সই ব্যবহার করিনি। তবে ঋতু কিন্তু ওর মতামত নিয়ে কখনোই অনড় ছিল না। সেই উন্মুক্ত মানসিকতা সবসময় ওর মধ্যে স্পষ্ট ছিল।

ইন্দ্রজিৎঃ তুই কি অনুভব করেছিলি যে, ঋতু তোর কাজে হস্তক্ষেপ করছেন?

প্রবুদ্ধঃ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ক্ষেত্রে একেবারেই নয়। শুধুমাত্র যে গানগুলো নিয়ে ঋতু সারাক্ষণ ভাবত ও অনুভব করত সেখানে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করত। বিজিএমের জন্য আমি স্ক্র্যাচগুলো মেইল করতাম, যেটা ও বাড়িতে খুব মন দিয়ে শুনত। একটা-দুটো বাদে সব গানগুলোই অপরিবর্তিত থেকেছে।

এই প্রসঙ্গে ছবির থিম মিউজিক সম্পর্কে তোকে একটা গল্প বলি। আমি ঋতুকে বলেছিলাম, থিম মিউজিকে একধরনের পুনরাবৃত্তি থাকবে। সাত মাত্রায় একটা সুর কম্পোজ করলাম, ইন্সট্রুমেন্টের মধ্যে ছিল সরোদ, চেলো, বাঁশি, সরোদের সঙ্গে মিল রাখার জন্য একটা নাইলন স্ট্রিং গিটার। পিসটা কম্পোজ করা হয়েছিল ভীমপলশ্রী রাগে, যেটা শুনতে বেশ শ্রুতিমধুর হয়েছিল।

ঋতুর কাছে যখন এটা নিয়ে গেলাম, তিন থেকে চারবার একনাগাড়ে শুনল। শোনার পর সেদিন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল। আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম আবার স্বস্তিও পেয়েছিলাম। কারণ সিনেমার থিম মিউজিক ফাইনাল হয়ে যাওয়া মানে যুদ্ধে অর্ধেক জয়লাভ করা। আমি তো সবসময়ই বেলা করে ঘুম থেকে উঠি, ঋতু উঠত একদম সকাল সকাল। 

যাইহোক, আমার থিম মিউজিকের প্রশংসার পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল ঋতুর মিসড কল দেখে। কলব্যাক করতেই ও বলল, “তুই যে মিউজিকটা করেছিস, একেবারে বিশ্রী। ওটা ফেলে দে”। আমি একেবারে চুপ করে গেলাম। শুধু বললাম, “ঠিক আছে”। বুঝতে পারলাম ঋতু যে মেজাজে এখন আছে, সেখানে তর্ক করার কোনও অর্থ নেই। যে কারণেই হোক না কেন, মিউজিকটার প্রতি ও খুব বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। কী ভুল হয়েছে, সেইসব ভাবতে ভাবতে আবার কম্পোজ নিয়ে বসলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গিটারে কিছু জিনিস কম্পোজ করলাম। 

আবার ঋতুকে ফোন করলাম। অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে ঋতু বলল, “তুই কি কিছু ভাবলি? তুই কি আসবি একবার? এখানেই লাঞ্চ করতে পারিস”। ঋতুর আরেকটা বিষয় হচ্ছে মানুষকে খাওয়াতে ও খুব ভালোবাসত। আর নিজে শুধু ডালিয়া খেত। আমার গিটারটা নিয়ে সেদিন ওর বাড়ি চলে গেলাম। ঋতুর সহকারীকে বললাম কয়েকটা দৃশ্য একটু দেখাও, আমি বাজাচ্ছি। ঋতু রিপিট করতে বলল। অবশেষে ঋতু বলল, “ঠিক আছে, ফাইনাল”। আমি বললাম, “হ্যাঁ, আজকের জন্য”। ঋতুর উত্তর, “বেশি ব্যাঁকা ব্যাঁকা কথা বলিস না”।

তারপর বলল, “তুই কী ধরনের সংগীত পরিচালক? নিজেকে খুব পেশাদার ভাবিস? আমি যখন তোকে বললাম বিশ্রী হয়েছে, তুই ওকে বলে ফোন কেটে দিলি। আমি হয়তো আরও কিছু বলতেও যাচ্ছিলাম। আজকের পিসটা তো ফাইনাল হয়ে গেল। কিন্তু তুই কি সত্যিই জানতে চাস, কেন ফেলে দে বলেছিলাম?” 

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? ঋতু বলল, "সমস্যা কী জানিস? গতকাল তুই চলে যাবার পর অনেকক্ষণ মিউজিকটা শুনলাম। এবং বারবার মনে হচ্ছিল আমি ডুবে যাচ্ছি। দ্যাখ প্রবুদ্ধ, এটা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ছবি। তাঁর গানও আসবে। যে গানের একটা অন্তর্নিহিত ঐশ্বর্য রয়েছে। তাই ছবির থিম মিউজিক এতটা শক্তিশালী হওয়া উচিত নয়, যেখানে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে এটার সংঘর্ষ তৈরি হয়। দর্শকদের মধ্যে একটা বিভাজন তৈরি হয়ে যায়। যে মিউজিকটা তুই আজ করলি, সেটার একটা নির্দিষ্ট গঠন এবং ব্যক্তিত্ব রয়েছে। ফলে বিষয়টা অনেক ফ্লেক্সিবেল হল।"

এটা শোনার পর ঋতুর প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। একইভাবে আমি নিশ্চিত বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত অন্য কেউ এই ছবির বিষয় হলে প্রথম মিউজিকটাই ফাইনাল হয়ে যেত। কারণ ঋতু জানত মেলোডিই রাজা।

দৃশ্য বোঝাচ্ছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ

ইন্দ্রজিৎঃ ব্যক্তিগত ঋতুপর্ণ বা ক্রিয়েটিভ ঋতুপর্ণ হিসাবে তোর মাথায় কী আসে? ওই সাত-আট মাসে কী কী শিখলি ওঁর থেকে?

প্রবুদ্ধঃ ঋতুর ইন্সটিংক্টটাই আমার মাথায় আছে। মানুষ হিসাবে ঋতুপর্ণর নানারকম দ্বন্দ্ব ছিল। আমি শুনেছি ঋতু আড্ডা মারতে ভীষণ পছন্দ করত। আমার সঙ্গে সেটা কোনোদিনও হয়নি। আমাদের সম্পর্কটা খানিকটা পেশাদারি ছিল। ঋতু কখনও ওর ব্যক্তিগত জীবনের কথা আমাকে বলেনি। আসলে ঋতুপর্ণ ঘোষ এমন একটা চরিত্র, যার সঙ্গে অনেকেই তাদের ব্যক্তিগত জীবন শেয়ার করতে চাইবে। কারণ ওর দৃষ্টিভঙ্গিটাই আলাদা ছিল। একটা জিনিস আমার মনে হয়, এমন সময় আমাদের আলাপ হয়েছে যেখানে কিন্তু একটা প্যারামিটার বারবার চলে আসত। সেটা ওর রূপান্তর হওয়ার চেষ্টা। যেটা ওর কাজেও ছাপ ফেলেছে। ওর ওষুধ খাওয়া, অসুস্থ হয়ে যাওয়া, দিনের পর দিন কাজ আটকে যাওয়া, রূপান্তর হওয়ার কষ্ট-যন্ত্রণা সবটাই ওর কাজে ফুটে উঠেছে। তার মানে এই নয়, ঋতু অপেশাদার। একটা দৃশ্যের ভিস্যুয়ালাইজিং ওর কাছে পরিষ্কার থাকত সবসময়। 

শ্যুটিংয়ের মাঝে একদিন জোড়াসাঁকোয় গেলাম, ঋতু 'আয়' বলে জড়িয়ে ধরল। বলল রাখিবন্ধনের দৃশ্যে আমি দেখাব 'বাংলার মাটি বাংলার জল' গাইতে গাইতে খোল-করতাল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একদল লোক। আমি তো তখনও ট্র্যা ক তৈরি করিনি। লিপস ম্যাচ করবে না তো। ঋতু বলল, "আমি ওসব জানি না। তুই মিউজিক ডিরেক্টর, এটা তোর সমস্যা৷ কিন্তু আমি এটাই চাই।"

আমার গানটা মুখস্থ নেই। একজন লাইব্রেরি থেকে বইটা এনে দিল। ওদের গানটা শেখাতে শুরু করলাম। সেটা রেকর্ড করে স্টুডিওতে মিক্সিং হল। তারপর কিছু প্রফেশনাল লোকজনদের দিয়ে কোরাসে গাওয়ানো হল। ওই লিপ এবং পাইলট ট্র্যা ক দেখে দেখে সবাই গাইল।

ঋতুপর্ণ এমন একজন মানুষ যাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই, তুই এটা আগে ভাবিসনি কেন? ও হয়তো সঙ্গে সঙ্গে বলবে, এটা কি যুদ্ধের স্ট্র্যাখটেজি হচ্ছে, যে সবকিছুই আগে ভেবে ফেলব? এটাই হচ্ছে ঋতুপর্ণ ঘোষ।

(সমাপ্ত)

Developed by DXDasia