কে এই ঋতুপর্ণ? মেয়েলি পুরুষ নাকি পুরুষালি মেয়ে! নাকি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পী!

ঋতুপর্ণ, স্রোতের বিপরীতে নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করা একটি ব্র্যান্ড

সালটা তখন ২০০৪, বয়স বারো কী তেরো। সিনেমা নিয়ে অনুভব, পরিজ্ঞান, চেতনা তখনও বিশেষ গড়ে ওঠেনি। তাই ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘পরশ পাথর’ এগুলির বাইরে অন্য কোনও সিনেমা দেখার ঝোঁকও তেমন ছিল না। সেই সময়েই জীবনে ঋতুর আগমন, ‘উনিশে এপ্রিল’ ছবির মধ্যে দিয়ে। তখন পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষকে চিনতাম না, চেনার সুযোগ হয়নি। ঐ সময়ে পরিচালকদের নিয়ে বিশেষ চর্চাও হত না, লাইমলাইট পেতেন না আর কী। যদিও পরিচালক ঋতুপর্ণের আবির্ভাব আমার জন্মের আগেই। ততদিনে বেশকিছু জাতীয় পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে এসে গিয়েছে। সেই থেকেই বেড়ে উঠেছে অচেনা ঋতুর প্রতি অনুরাগ। সম্পর্ক নিয়ে এত ভাবনার বিষয় রয়েছে? 

উনিশে এপ্রিল আপেক্ষিকভাবে যতটা সরল, তার চেয়েও বেশি গভীর। তাই বারো বছর বয়সে বুদ্ধির বিকাশ হওয়ার আগেই ছবিটি দেখে আবেগে ভেসে যাওয়া। সেই আবেগ একেবারে অচেনা, নতুন। এই ছবিটি দেখেই মানুষটির হৃদয়ের সঙ্গে পরিচয়। 

উনিশে এপ্রিল

কেমন দেখতে ঋতুকে?  

বয়স বাড়ার পর আগ্রহ জন্মাল আমার সাধের পরিচালককে নিয়ে। মাথায় কোঁকড়া চুল, চোখে গোল চশমা, বিনয়ী দুটি চোখ, পরিমিত হাসি। শুরু হল ঋতুপর্ণ অন্বেষণ। বুঝলাম, তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করা একটি ব্র্যান্ড। স্রোতের বিপরীতে চলা মানুষ। আগ্রহ জন্মালো সেই পুরুষটিকে নিয়ে যাঁর নারীর অন্তরমহল নিয়ে গভীর নাড়াঘাটা। ক্রমেই ঋতুর পরিবর্তন সমাজের কাছে জটিল হতে শুরু করল। কৈশোরে ‘মেয়েলি পুরুষ’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় তাঁকে দেখেই, তবে তখন বুঝতে অসুবিধে হয়নি মানুষটি মেয়েলি পুরুষ নাকি পুরুষালি মেয়ে! সেটি আলোচ্য বিষয় নয়, মানুষটি নারীদের একান্ত আপন, তাঁর সৃষ্টিগুলো মহামূল্যবান। কোনো এক সাক্ষাৎকারে ঋতুপর্ণ বলেছিলেন— “এই শহর না আমায় নিতে পারবে, না ফেলতে পারবে”। জীবিতকালে তাঁকে নিয়ে যে ফিসফিসানি হয়েছে, মৃত্যুর পর তা সব চাপা পড়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে তাঁর সুবিদিত কাজ। এই ছোটো পরিসরে ঋতুপর্ণ ঘোষকে ধারণ করা সম্ভব নয়।

বাড়িওয়ালি 

টলিউডে তখন নারীকেন্দ্রিক সিনেমা বিশেষ হত না। অপর্ণা সেন কিছু কাজ করতেন বটে। ঋতুপর্ণের সব চলচ্চিত্রেই নারীর অন্তর্নিহিত অনুভূতিগুলো উঠে এসেছে। দহন, বাড়িওয়ালি, শুভ মহরত, চোখের বালি, রেইনকোট, দোসর, চিত্রাঙ্গদা। মায়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকাটাও তাঁর নারীসত্তাকে আরও সুদৃঢ় করেছে— মা-ই ছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু। 

পুরোনো ঋতুপর্ণ 

একটা সময়ে তাঁর সৃষ্টিগুলিকে উপেক্ষা করে ‘লিঙ্গ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল সমাজের একাংশ। ঋতুপর্ণর পুরুষ বন্ধু ক'জন? তাঁর সাম্প্রতিকতম ঘনিষ্ট পুরুষ বন্ধুটি কে? 

তাঁর জীবিতকালে আমার খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করত, ঋতুপর্ণ সমকামী নন, রুপান্তরকামী নন, হিজড়ে নন, নারী নন, পুরুষও নন, তিনি কোনোটিই নন, তিনি শুধু মানুষ। প্রচলিত জীবনের বোধ ও যৌনতার সীমারেখা অতিক্রম করে যে মানুষটি দাঁড়াতে পেরেছিলেন, তিনিই ঋতুপর্ণ ঘোষ।

ঋতুপর্ণ ঘোষকে শেষবার দেখা গিয়েছিল তাঁরই পরিচালিত ‘চিত্রাঙ্গদা’ ছবিতে। নারীর বহু জন্মান্তরের গল্প বলেছে ঋতুর ‘চিত্রাঙ্গদা’, যেখানে রয়েছে দু'জন পুরুষের সংসার বাঁধতে চাওয়ার গল্প। সেখান থেকে তৈরি হওয়া সংঘাত। যে সংঘাতের জেরে অপারেশন টেবিলে পৌঁছে যাওয়া লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরুষ থেকে নারী হয়ে উঠতে চাওয়া। নারী ও পুরুষের ছকে বাধা চরিত্রের বাইরে পুরুষ অঙ্গে নারী চরিত্রের গুণাবলী অথবা নারী অঙ্গে পুরুষের গুণাবলী মেনে নেওয়া– যা বাঙালির বিবেককে দংশন করেছিল। ছবিতে দেখা যায় রুদ্রের (ঋতুপর্ণ) বাবা তাঁর ছেলের মেয়েলি ভাব, নাচ করা পছন্দ করেন না, লজ্জা পান তাও বলা যেতে পারে। ছেলের 'লিঙ্গ' পরিবর্তনের সংকল্প হৃদয়ে বজ্রাঘাত করেছিল মা,বাবার। লড়াই শুধু সমাজের সঙ্গে নয়, পরিবারের সঙ্গেও। 

চোখের বালি 

কেন একজন পুরুষ পুরুষকে ভালোবাসবে না? দুনিয়ায় আদতে সমকামী-বিষমকামী কোনও মেরু নেই, দুটোই সমান এবং সমান্তরাল। 

চিত্রাঙ্গদা একজন্মে বহু জন্মান্তরের কথা বলে, অনেক মেয়ের মনের কথা বলে। 

ঋতুপর্ণ নিজেই বলেছিলেন, তাঁর এই ছবিতে বহু মেয়ের গল্প ধরা আছে, ইচ্ছেটাই হল চিত্রাঙ্গদার গল্প। তার সঙ্গে খুলে দিয়েছিলেন 'অপ্রাকৃতিক যৌনতার' ট্যাবু ভাঙার ধারা। 

চিত্রাঙ্গদা 

একসময়ে ওষুধ, কাজের চাপ, মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা সব নিয়ে সুস্থ শরীরটা তেজ হারালো। ৩০ মে, ২০১৩ হঠাৎ চলে গেলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। মুক্তি পেলেন আপন আকাশে। 

রবীন্দ্রনাথের কথায়, “রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে”।কত নির্ভীক পরিচালক আসবেন, ট্যাবু ভাঙবেন। তবে তিনি রয়ে যাবেন দিনের তারার মতো, চিরকাল।

 

Developed by DXDasia