
রবীন্দ্রনাথ ও এন্ড্রুজ— বন্ধুত্বের গল্প!
লেখিকা মহুয়া দাশগুপ্তের কণ্ঠেও শুনে নিতে পারেন এই লেখা
রূপকথার রাজপুত্র যখন সাতসমুদ্র তেরোনদীর পাড়ে যাত্রা করতেন, তখন সঙ্গে থাকত মন্ত্রীপুত্র, বন্ধুর জন্য নিবেদিত প্রাণ! রূপকথায় কিন্তু রাজপুত্র সচরাচর মন্ত্রীপুত্রকে সঙ্গে যেতে নিষেধ করতেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর দীনবন্ধু এন্ড্রুজের বন্ধুত্বটাও বেশ রূপকথার মতো মনোরম ছিল। কিন্তু ১৯১৬ সালের জুন মাসে জাপান থেকে ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকা যাবেন বলে স্থির করেন। কিন্তু মন্ত্রীপুত্রের মতো নিবেদিত প্রাণ এন্ড্রুজকে সঙ্গে নিতে কিছুতেই রাজি হলেন না। পরে ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ চিন দেশে যাওয়ার সময়ও এন্ড্রুজকে নিয়ে যাবার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এন্ড্রুজ তখন মহাত্মা গান্ধির কাছে যান এবং সেইসময় রটে যায় এন্ড্রুজ সাহেব চিরকালের জন্য শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু এই গুজবটি উপেক্ষা করেই রবীন্দ্রনাথ ও এন্ড্রুজের সম্পর্ক আমৃত্যু অবিচল ছিল। বন্ধুত্বের গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯১২ সালে।
১৯১২ সালের ৩০ জুনের এক মনোরম গ্রীষ্মসন্ধ্যা! লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড হীথে বিখ্যাত চিত্রকর রোটেনস্টাইনের বাড়ির সাহিত্য আসরে প্রথম দেখা রবীন্দ্রনাথ এবং এন্ড্রুজের। সেদিন সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন ইয়েটস, মে সিনক্লেয়ার, এজরা পাউন্ড এবং আরও অনেকে! রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখার অনুভূতি এন্ড্রুজের কাছে প্রথম প্রেমের অনুভূতির থেকে কম কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথের কাব্যসুধা, এন্ড্রুজকে ভারতের সংস্কৃতির সূক্ষ্ম মাধুর্য সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে। সেদিন রাতে এন্ড্রুজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেরিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও পরে বলেছিলেন, সেদিন নিস্তব্ধ রাতে এন্ড্রুজ সাহেবের মন পূর্ণ ছিল গীতাঞ্জলির ভাবে। ঈশ্বর প্রেম আর রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভালোবাসা তাঁর কাছে খানিকটা এক হয়ে থাকবে। অনেকটা দেবতাকে প্রিয় করি, প্রিয়কে দেবতার মতোন। এখন এই টানেই বিদেশ থেকে এন্ড্রুজ চলে আসবেন ভারতবর্ষে। শান্তিনিকেতনে, রাঙামাটির দেশে নতুন জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে এক বিদেশি হয়ে উঠবেন ভারতবাসীর কাছের মানুষ।
কলকাতার এক গোরস্থানে এন্ড্রুজ সাহেবের মূর্তি
ইংল্যান্ডের নিউ ক্যাসেল অন টাইন শহরে ১৮৭১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জন্মেছিলেন এন্ড্রুজ। তাঁর বাবা এডউইন এন্ড্রুজ ছিলেন ধর্মযাজক। মা ছিলেন মধ্যবিত্ত সংসারের চালিকা শক্তি। ছোটোবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন এন্ড্রুজ। বার্মিংহাম ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন এন্ড্রুজ। এইসময় খ্রিস্টান সোশ্যাল ইউনিয়নের সভাপতি বিশপ ওয়েটকটের সান্নিধ্য এন্ড্রুজকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এই সংবেদনশীল মন নিয়েই এন্ড্রুজ ১৯০৪ সালের ৩০ মার্চ ভারতে এসে পৌঁছলেন। ছোটোবেলায় মায়ের মুখে ভারতবর্ষের গল্প শুনেছিলেন তিনি। বিদেশি বলে দূরে থাকবেন না— এই অঙ্গীকার নিয়েই ভারতে প্রবেশ করলেন এই বিদেশি বন্ধু। ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এন্ড্রুজ সাহেব এসে পৌঁছলেন শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ তখন বিদেশে। তীর্থযাত্রীর মতো এন্ড্রুজ শান্তিনিকেতনের খোলা প্রাঙ্গন, উপাসনাগৃহ দেখে এসে রাতে যেন অনুভব করলেন দেবেন্দ্রনাথকে এবং রবীন্দ্রনাথকে। পরে দিল্লি ফিরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিজের বন্ধুত্বের দাবিতেই তিনি রবীন্দ্রনাথের শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে চান। এরপর এন্ড্রুজ সাহেব শান্তিনিকেতনে প্রবেশ করতে পারলেন। আম্রকুঞ্জের সম্বর্ধনায় রবীন্দ্রনাথ ছন্দোময় অভ্যর্থনা জানালেন—
‘প্রতীচীর তীর্থ হতে প্রাণরসধার/ হে বন্ধু এনেছো তুমি, করি নমস্কার। / প্রাচী দিল কণ্ঠে তব বরমালা তার /হে বন্ধু গ্রহণ করো কবি নমস্কার।’ শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থ এন্ড্রুজকেই উৎসর্গ করলেন। তারপর? তারপর কালের গর্ভে ধরা রইলো সেই ছবি— খালি পা, পরনে খাটো খদ্দরের ধুতি, গায়ে হাতকাটা পাঞ্জাবি, সাদা দাড়ি গোঁফ আর মুখে সরল হাসি — এন্ড্রুজ সাহেব হনহন করে চলেছেন কাঁকড়ঢালা রাঙা রাস্তায়।
এই পর্যন্ত ব্যাপারটি রূপকথার গল্পের মতোই সুন্দর। রূপকথায় যেমন রাজপুত্রের জন্য মন্ত্রীপুত্রের আত্মবলিদান খুব চেনা একটা মোটিফ, তেমনটাই ভঙ্গি ছিল এন্ড্রুজের। একদিকে যেন সাহেব হওয়ার অপরাধ থেকে মুক্তির জন্য নিজেকে ভারতবাসীর সবরকম কাজে, লড়াইয়ে, বিপ্লবে সামিল হতেন এন্ড্রুজ। যেমন ভারতবর্ষের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এন্ড্রুজ। গান্ধিজির অহিংস আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল দীনবন্ধু এন্ড্রুজের। বই লিখেছেন ভারত ও ইংল্যান্ডের রাষ্ট্র সুরক্ষা বিষয়ে, আফিম ব্যবসার বিরুদ্ধে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির সম্পর্ক নিয়েও লেখা আছে তাঁর। ‘ট্রু ইন্ডিয়া’ এন্ড্রুজেরই লেখা। ভারতবর্ষের জন্য এন্ড্রুজের ভাবনার শেষ ছিল না। কুলি ধর্মঘটের সময়, কুলিদের সঙ্গে মাটিতেও শুয়েছেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন। স্বজাতি ইংরেজদের অন্যায় আচরণের জন্য ভারতবাসীর কাছে নতজানু হয়েছেন বারবার । বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা, অধ্যাপনা করা ছাড়াও বৃদ্ধ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রিকশাও টেনে দিয়েছিলেন এন্ড্রুজ সাহেব।
শান্তিনিকেতনে গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ এবং এন্ড্রুজ সাহেব
এইসবকিছুর কেন্দ্রে কিন্তু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে কেন্দ্র করেই এন্ড্রুজ ছড়িয়ে রেখেছিলেন তাঁর বিচিত্র কর্মের জাল। নীরদচন্দ্র চৌধুরী কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠের মতো এন্ড্রুজের চরিত্রের একটি ভিন্ন দিক দেখিয়েছেন তাঁরই লেখা ‘আত্মঘাতী বাঙালি’র শেষ প্রবন্ধটিতে। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক তীব্র অধিকারবোধ ছিল এন্ড্রুজের। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে থাকা কিছু বিদেশি অনুরাগীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করতেন নাকি এন্ড্রুজ। রবার্ট ব্রিজেস, এলমহার্স্ট ইত্যাদিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আলগা করার চেষ্টা করেছিলেন নাকি এন্ড্রুজ। একবার ১৯২১ সালে লেনার্ড এলমহার্স্ট শান্তিনিকেতনে আসার জন্য রবীন্দ্রনাথকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এন্ড্রুজ সাহেব রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য না শুনেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, অর্থের অভাবে আসা যাবে না। এলমহার্স্টও ছাড়ার পাত্র নয়। ফান্ড তৈরি করে আসার প্রস্তাব দিয়ে এলমহার্স্ট রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তড়িঘড়ি যোগাযোগ করেন এবং সাদর আমন্ত্রণ পান। ইংল্যান্ড সম্পর্কেও সদর্থক ভাবনা ছিল না এন্ড্রুজের। একটাসময় রবীন্দ্রনাথের উপর অধিকারবোধ প্রবল হয়ে ওঠে এন্ড্রুজের। রবীন্দ্রনাথ এইসব বিপত্তি এড়াতেই সব ভ্রমণে এন্ড্রুজের সঙ্গ চাইতেন না। আমেরিকা সফরে না নিয়ে যাওয়ার কারণ এন্ড্রুজের অতি-অধিকারবোধ।
‘ভারতীয়দের এন্ড্রুজ পূজা’ একেবারেই মেনে নিতে পারেননি নীরদচন্দ্র চৌধুরী। এন্ড্রুজের অনেক অনেক কাজের প্রতি ইঙ্গিত করে, নীরদচন্দ্র চৌধুরী এন্ড্রুজের অল্পদিন করে শান্তিনিকেতন থাকাকে ব্যঙ্গ করেছেন।তুলনা করেছেন , ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে’র হঠাৎ হঠাৎ অদৃশ্য হওয়া ‘চেশায়ার ক্যাট’ এর সঙ্গে।
রবীন্দ্রনাথ এবং এন্ড্রুজ
একবার রবীন্দ্রনাথের সাদা দাড়ি দেখে এন্ড্রুজেরও শখ হয় দাড়ি রাখার। দেখতে তেমন ভালো না লাগলেও এন্ড্রুজ নিজের কথায় অবিচল থাকেন। সারাজীবন তাঁকে সেইরূপেই দেখা যায়। এন্ড্রুজ প্রসঙ্গে বেশ অশালীন ভাবেই নীরদচন্দ্র বলেছিলেন , ‘কিন্তু এই ন্যাকা-হাবার এমনই সারল্য এবং আত্মহারা ভাব ছিল যে, তাঁহাকে স্নেহ না করিয়া পারা যাইত না।’ একবার বিয়ের প্রবল শখও হয় এন্ড্রুজ সাহেবের । কিন্তু অনেক খুঁজেও মনের মতো পাত্রী না পাওয়ায় অকৃতদারই রয়ে গেলেন দীনবন্ধু এন্ড্রুজ। রবীন্দ্রনাথের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা সবসময় ঘিরে থাকলে রবীন্দ্রনাথও একটু অস্থির হবেন, বলাই বাহুল্য! অস্থির হয়তো হয়েছেন কখনও। কিন্তু বন্ধুকে ভালোবেসেছেন। এন্ড্রুজ ভারতবর্ষের জন্য ভেবেছেন বলে নিজের দেশের মানুষদের উপেক্ষা পেয়েছেন আর পেয়েছেন ভারতবাসীর সংশয় ও সন্দেহ। মনে মনে একলা হয়ে যাওয়া একটি মানুষই প্রিয়জনের প্রতি অধিকারবোধ দেখিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়।
১৯৪০ সালের ৫ এপ্রিল ৬৯ বছর বয়সে এন্ড্রুজ সাহেব মারা যান। রবীন্দ্রনাথ নিজের অসুস্থতার কারণে তাঁকে দেখতে যেতে পারেননি। কিন্তু এন্ড্রুজের মৃত্যুর পর ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে স্মরণ করেছিলেন বন্ধু তাঁকে। স্বার্থসম্পর্কহীন তাঁর নির্ভীক মহত্ত্ব আরও জ্যোতির্ময় হয়ে ধরা দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মনে। অস্থিরচিত্ত, আবেগপ্রবণ এই বিদেশি বন্ধুকে রবীন্দ্রনাথ কখনওই ভুলে যাননি। কারণ তিনিই ছিলেন এন্ড্রুজ সাহেবের বন্ধু, সখা, প্রভু!
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্র পরিকর/ পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
আত্মঘাতী বাঙালি/ নীরদচন্দ্র চৌধুরী
