বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যঙ্গ, কুৎসার মাধ্যমে সাংবাদিক হিসাবে বিখ্যাত হয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন!

কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ বারবার আক্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথকেও

সে এক সময় ছিল। সদ্য ঘুম ভেঙে জেগে উঠছে বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি। মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর, বিদ্যাসাগরের যতিচিহ্ণ , বিহারীলালের গীতিকবিতা সোনার কাঠি হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘুমন্ত রাজকন্যের মতো আমাদের বাংলা সাহিত্যকে। তখন রেনেসাঁ, জেগে ওঠারই সময়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ম্যাজিক কলমের স্পর্শ যেন নতুন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করছে  বাংলা সাহিত্যের সংরূপগুলির। পাঠকমহলে রবি ঠাকুরের লেখা তখন আনকোরা, নতুন। আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে দিয়েই লেখক আরও দৃপ্ত , আরও শানিত হয়ে ওঠেন। একথা সত্যি। কিন্তু সমালোচক যদি হন কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের মতো ব্যক্তিত্ব? তাহলে গল্পটা একটু অন্যরকম হয় বটে। আজ রবীন্দ্রবিরোধী গোষ্ঠীর অন্যতম এক ব্যক্তি  কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের কথা বলি। 

কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ বারবার আক্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথকেও

১৮৬১, এই সংখ্যা কয়টি ছাড়া সবটাই অমিল ছিল রবীন্দ্রনাথ আর কালীপ্রসন্নের। দুজনেই জন্মেছিলেন ১৮৬১ সালে। কলকাতার ভবানীপুরে থাকতেন কালীপ্রসন্ন। হিতবাদী সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। ব্যঙ্গ লেখক হিসেবেও সেই আমলে বেশ পরিচিতি পেয়েছিলেন । একসময় ‘ফকিরচাঁদ  বাবাজি’ নামে বঙ্কিমচন্দ্র, কেশবচন্দ্র, হেমচন্দ্রকে ব্যঙ্গ করে অনেক লেখা লিখেছিলেন। সেই আমলে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের শিষ্য ছিলেন। এই ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা  বঙ্কিমচন্দ্রকে এবং তাঁর অনুসারীদের ‘শব-পোড়া মড়াদাহের দল’ বলে ব্যঙ্গ করতো আর বঙ্কিমচন্দ্রও সোমপ্রকাশের দলকে ‘ভট্টাচার্যের চানা’ বলে ব্যঙ্গ করতেন। কালীপ্রসন্ন ‘রুচিবিকার’ নামের একটি কবিতা প্রকাশ করার পর তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন এক ব্রাহ্ম সম্পাদক এবং বিশিষ্ট নেতা হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। হেরম্বের অভিযোগ ছিল ওই কবিতা তাঁর স্ত্রীকে ব্যঙ্গ করে লেখা। ১৮৯৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি জেনকিন্স কালীপ্রসন্নকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং পাঁচমাস জেল খাটার পর মুক্তি পেয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন। নীরদচন্দ্র চক্রবর্তীর ‘রবীন্দ্রনাথের নিন্দা ও নিন্দাকারীরা’ প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালে স্বদেশী আন্দোলনের জন্য আটজন নেতা রেঙ্গুনে নির্বাসিত হন। তাদের মধ্যে কালীপ্রসন্নও ছিলেন। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর আর দেশে ফেরা হয়নি।জাহাজেই তাঁর মৃত্যু ঘটে এবং বঙ্গোপসাগরের জলে তাঁর দেহ বিসর্জন দেওয়া হয়।  

সে যাই হোক, তাঁর জীবনের একটি সময় তিনি ‘রাহু’ ছদ্মনামে রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি গ্রাস করার জন্য ব্যয় করেছিলেন। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কড়ি ও কোমল’। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বোঝার মতো মন আর সময় কোনোটাই ছিল না কালীপ্রসন্নের। তাই শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকে আঘাত করার মানসিকতা থেকেই কালীপ্রসন্ন ‘রাহু’ ছদ্মনামে ‘কড়ি ও কোমল’ এর কয়েকটি কবিতা প্যারোডি করে ‘মিঠে কড়া’ নামে একটি পুস্তিকা ছাপালেন। তখন ১৮৮৮ সাল। আখ্যাপত্রে ঘোষণা করা  হলো— ‘ইহা কড়িও নহে, কোমলও নহে, পুরো সুরে মিঠেকড়া।’ এরপর? পাতার পর পাতা রবীন্দ্রনিন্দা। যাঁরা ‘কড়ি ও কোমল’ পড়েননি, তাঁরাও কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের ‘মিঠে কড়া’র নাম শুনেছিলেন। কারণ, ঠাকুরবাড়ির ‘পায়রা কবি’ যে নগদ একটাকা মূল্যের জোরেই বই ছাপাতে সক্ষম , এমন কথা আর কে কোথায় বলেছে? এইসব সমালোচনার অন্তরালে রোম্যান্টিক ও ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্যের দ্বন্দ্বের কথা নাহয় নাই বললাম। কিন্তু খেউর , খিস্তি আর অশালীন ইঙ্গিতে একজন নবীন কবিকে ক্ষতবিক্ষত  করেছিলেন কালীপ্রসন্ন, হিতবাদী পত্রিকার সম্পাদক। 

‘উড়িস নে রে পায়রা- কবি/ খোপের ভিতর থাক ঢাকা। / তোর বকবকম আর ফোঁস ফোঁসানি/ তাও কবিত্বের ভাব মাখা/ তাও ছাপালি গ্রন্থ হ’লো/ নগদ মূল্য এক টাকা। — এমন কত শব্দ বিষাক্ত তীরের মতো ছুটে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের দিকে। অথচ, রবীন্দ্রনাথের আচরণ কখনোই শালীনতার সীমা ছাড়ায়নি। উপরন্তু কালীপ্রসন্নকে নিজের বৈষ্ণবপদ সংগ্রহ করে রাখা খাতাটিও দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে খাতাও ফিরত পাননি আর নিজের প্রাপ্য সম্মানও। তাঁর হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন। ‘মিঠে কড়া’ র লেখকের বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছিলেন ‘কাকাতুয়া দেবশর্মা’ নামে। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৩ সালে  কালীপ্রসন্নদের মতো সমালোচকদের কথা ভেবেই লিখেছিলেন, ‘সে কোনো লেখা ঢাকিয়া বলিত না। এমন উৎসাহের সহিত অবিমিশ্র প্রচলিত ভাষায় গাল পাড়িত যে, ছাপার অক্ষরগুলো পর্যন্ত যেন চক্ষের সমক্ষে চিৎকার করিতে থাকিত।’ আর সাধারণ গড়পরতা বাঙালি পাঠক তাকে ধ্রুবসত্য বলে মেনে নিত। 

এখন, মনে প্রশ্ন জাগে হিতবাদীর সম্পাদকের এত রবীন্দ্র বিদ্বেষ কেন? কালীপ্রসন্ন তো দেশপ্রেমিক  ছিলেন। তাঁর স্বদেশ বিষয়ক লেখাও রয়েছে। নীরদ চন্দ্র চৌধুরী অনুমান করেছিলেন, কালীপ্রসন্নের ইংরেজ বিদ্বেষের একটি শাখা ব্রাহ্ম বিদ্বেষ। রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো বিলেত ফেরত ব্রাহ্ম ছিলেন বলেই হয়তো গোঁড়া কালীপ্রসন্নের ক্রোধ। কিন্তু আমরা এই মতটিকে মেনে নিয়েও একটু অন্য কথা বলি?

কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ ছিলেন সেকালের অত্যন্ত সফল সাংবাদিক । ১৮৯৪  থেকে একটানা বারো বছর ‘হিতবাদী’র সাংবাদিক ছিলেন তিনি। ‘হিতবাদী’র হিন্দি সংস্করণও প্রকাশ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন। কিন্তু, তাঁর একটি প্রবণতাই ছিল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে কুৎসা রচনা। কেন? সমালোচক হিসাবে তিনি সার্থকতা পাননি। লেখক হিসাবে তো নয়ই। দেশের জন্য জেল খাটলেন। একমাত্র সাংবাদিকতা করে গেলেন একনিষ্ঠভাবে। এইখানেই আমরা আমাদের অনুমানের আতশ কাচটি রাখি। 

কালীপ্রসন্ন দেশপ্রেমিক  ছিলেন। তাঁর স্বদেশ বিষয়ক লেখাও রয়েছে।

সাংবাদিকতায় ‘Yellow journalism’ একটি প্রচলিত কথা। নিউইয়র্কের দুটি খবরের কাগজ ‘The world’ এবং ‘ The journal’-এর মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতার সূত্রে এই ধারণাটি আসে। খবরের কাগজ বিক্রির জন্য অতিনাটকীয় প্রেম, রোমান্স অথবা কোনো ব্যক্তিত্বের ব্যঙ্গাত্মক ইমেজ , কুৎসা ইত্যাদি নিয়ে খবর তৈরি হতো। খবর! সংবাদপত্র বিক্রির জন্য! কারণ সাধারণ মানুষের এই জাতীয় খবর পড়তে ভালো লাগবে। এই প্রসঙ্গে সাংবাদিক William Randolf Hearest আর Joseph  Pulitzer -এর নাম করা যায়। ১৮৯০ সাল নাগাদ এই পদ্ধতি  তাঁরা প্রয়োগ করেছিলেন সংবাদপত্র বিক্রির জন্য। ১৮৯০ সালেই ‘Yellow journalism’ ধারণাটিও মান্যতা পায় সাংবাদিকতার অন্যতম শাখা হিসেবে। 

কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ কিন্তু এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে শুরু করেছিলেন এর অনেক আগে থেকেই। তাঁর আমলে ‘হিতবাদী’ র বিক্রি অনেক বেশি হয় এবং অর্থাগমও হয়। একথা প্রমাণিত। কে বলতে পারে, আসলে সংবাদপত্র বিক্রির জন্য প্রবল উদ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে মুখরোচক  সংবাদ তৈরি করতেন সাংবাদিক কালীপ্রসন্ন। তাঁর দেশপ্রেমিক সত্তাটিও ভুলে যাওয়া যায় না। রবীন্দ্রসমালোচক, ঈর্ষাকাতর  কালীপ্রসন্নের মুখোশের আড়ালে হয়তো এক দক্ষ দেশপ্রেমিক সাংবাদিক লুকিয়ে ছিলেন। দেশের ‘হিত’ যাঁর গোপন ব্রত ছিল! সেইদিক থেকে বাংলার এক সাংবাদিক ১৮৯০ এর আগে থেকেই Yellow journalism এর ধারণাটির ব্যবহারিক প্রয়োগ করেই ফেলেছিলেন। যদি তাই হয়, তাহলে তাঁর জীবন , পেশা এবং লেখাকে একসূত্রে গেঁথে নিতে অসুবিধা হয় না। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
১. রবীন্দ্রসাহিত্যে সমালোচনার ধারা, আদিত্য ওহদেদার
২. রবীন্দ্র বিদূষণ ইতিবৃত্ত , আদিত্য ওহদেদার
৩. জ্যোতির্ময় রবি ও কালোমেঘের দল, সুজিত সেনগুপ্ত
৪. আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ, নীরদচন্দ্র চৌধুরী
৫. www.britannica.com

Developed by DXDasia