দিগম্বরীদেবী — ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে এক অনালোচিত তেজস্বিনী!

উনিশ শতকের গৃহবধূ কি স্বামীর একটু করে দূরে সরে যাওয়া সহ্য করতে দায়বদ্ধ ছিল?

জগদ্ধাত্রী প্রতিমার মতো রূপ ছিল তাঁর। শোনা যায় , তাঁর মুখের আদলেই গড়া হতো ঠাকুরবাড়ির দেবী প্রতিমার মুখাবয়ব। লোকে তাঁকে বলতো— ‘লক্ষ্মীর অবতার!’ একঢাল কোঁকড়া চুল, প্রতিমার মতোন মুখ, চাঁপার কলির মতো আঙুল, দুই পদপল্লবে দৈব সৌন্দর্য— এমনটাই তো ছিলেন দিগম্বরী দেবী। তিনি ছিলেন যশোরের নরেন্দ্রপুরের পিরালী বংশের মেয়ে। বাবার নাম রামতনু চৌধুরী , মা ছিলেন আনন্দময়ী। সেই আমলে ঠাকুর বাড়ির ছেলেদের জন্য পিরালী বংশের মেয়েদেরই নির্বাচন করা হতো। বাড়ির দাসী পুতুল নিয়ে যে মেয়ে পছন্দ করে আসতো, সেই মেয়েই হতো ঠাকুরবাড়ির বউ। সে অনেক কাল আগের কথা। এমনি করেই একদিন দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে দিগম্বরীর।

তখন ১৮০৯ সাল। দ্বারকানাথ তখন সবেমাত্র জমিদারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দুই চোখে। দিগম্বরী তাঁর যোগ্য দোসর। ধর্মপথের সঙ্গিনী। যে সময়কার কথা বলছি, তখন ঠাকুরবাড়ি গোঁড়া বৈষ্ণব। নিরামিষ আহারে, আচার, নিষ্ঠায় তাঁদের সকলে বলতো — ‘মেছুয়াবাজারের গোঁড়া!’ দ্বারকানাথও তখন অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ! প্রতিদিন দুই ঘণ্টা জপধ্যান করতেন, নিয়মিত নিরামিষ খেতেন, গৃহদেবতার নিত্য আরাধনা করতেন। প্রতিদিন পুজোর কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন তাঁর ধর্মপত্নী দিগম্বরী। 

দিগম্বরী প্রতিদিন ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠতেন। গঙ্গাস্নান করে শুরু করতেন হরিনাম জপ। লক্ষ হরিনামের মালা ছিল তাঁর। অর্ধেক জপ সকালে করে সামান্য দুধ ও ফল খেতেন। পরাণ ঠাকুর নামে এক আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ তাঁর পুজো ও রাঁধবার উপকরণ সংগ্রহ করে দিতেন। স্বপাকে আহার করতেন দিগম্বরী। দুপুরবেলা রাসপঞ্চাধ্যায় এবং শ্রীমদ্ভাগবত পড়তেন নিয়মিত। বিকেলে শুদ্ধবস্ত্রে হরিনামের অবশিষ্ট অংশ জপ করতেন। অনেকসময় দয়া বৈষ্ণবী এসে ধর্মগ্রন্থপাঠ করে যেত। একাদশীর দিন সামান্য ফলমূল খেয়ে থাকতেন। ধর্মনিষ্ঠা দ্বারকানাথের মা অলকাসুন্দরীরও ছিল। কিন্তু দিগম্বরী ধর্মগতপ্রাণ ছিলেন। জীবনের শুরু থেকেই স্বামীর সঙ্গে ধর্মাচরণের মধ্যে দিয়েই দিন শুরু হত তাঁর। ব্যস্ত দ্বারকানাথকে সারাদিনে আর কতটুকুই বা পেতেন দিগম্বরী? ওই পুজোর অবসরেই দুজনের ভালোলাগাটুকু এক হয়ে ছিল। ওইখানেই কেন্দ্রীভূত ছিল দিগম্বরীর দাম্পত্যের ভিত্তি এবং সম্পর্কের প্রতি আস্থা। দিগম্বরী ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বময়ী এবং রাশভারি স্বভাবের। তাঁর নীরব শাসন লক্ষ্মীশ্রীর মতোই ঘিরে থাকতো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলকে। দ্বারকানাথ ও দিগম্বরীর ছয়টি সন্তানের মধ্যে জীবিত ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ এবং নগেন্দ্রনাথ। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দিগম্বরীকে লক্ষ করলে বলা যায়, তাঁর অনুভূতি তিনি প্রকাশ করার থেকে অন্তরের গোপনতম প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রাখতেই পছন্দ করতেন। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে যে দেবীর মর্যাদা তিনি পেয়েছিলেন, সেই দৈবী সত্তা রক্ষা করাই  তাঁর জীবনের লক্ষ্য হয়ে গিয়েছিল বলেই মনে হয়। তাঁর মুখাবয়বের দেবী প্রতিমা ঠাকুরদালানে মানুষের পুজো পেত। সেই মুখশ্রীকে দৈবী ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ করে রাখার তাগিদটাই হয়তো তাঁর জীবনে মুখ্য হয়ে গিয়েছিলো। সেই আমলে একাদশীর দিন শুধু ফলমূল খাওয়ার মানসিক দৃঢ়তা বেশিরভাগ  সধবা নারীদের মধ্যে দেখা যায়নি। বিষয়টি ব্যতিক্রমী।

দ্বারকানাথ ঠাকুর 

১৮১৫ সালে রাজা রামমোহন রায় ‘আত্মীয়সভা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দ্বারকানাথ একদিকে নিষ্ঠাবান মূর্তিপূজক হয়েও রামমোহনের ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে ব্রাহ্মধর্মকেও সমর্থন করেন। ব্যবসা যত ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল, ততই দ্বারকানাথ জীবনে অঙ্ক কষে চলতে শিখলেন। সাহেবসুবোদের প্রভাবিত করতে বেলগাছিয়া ভিলায় নিত্য বসতে লাগলো বিনোদনের আসর। সেখানে মদ , মাংস, পুরুষ ,নারীর অবাধ বিচরণ কিছুই বাদ রইল না। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও শুরু হল সাহেব সুবোদের আনাগোনা এবং পানাহার। রামমোহনের প্রভাবে দ্বারকানাথ নিজেও শুরু করলেন মদ ও মাংস গ্রহণ। হতে পারে , মনটাকে যেকোনো রকম সংস্কারের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে লক্ষ্যে স্থির হয়ে চলছিলেন দ্বারকানাথ, নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে নিতে চাইছিলেন, হয়তো ইউরোপীয়  সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার একটা তাগিদ ছিল তাঁর। কিন্তু এই বদল গোটা সমাজ মেনে নিলেও একটি মুখচোরা, ধর্মগতপ্রাণ মেয়ে মেনে নিতে পারেননি। তিনি দিগম্বরী। আধুনিক সময় হয়তো দিগম্বরীর গোঁড়ামি, মানসিক সংকীর্ণতার কথা তুলতে পারে। কিন্তু আমরা বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখতে পারি। অন্দরমহলে দিগম্বরীর ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ভালোলাগা ছিলো না। নির্ভর করতেন দ্বারকানাথের পরিচিত ধর্মাচরণে। সেই পরিচিত পুরুষ যখন ঠিক বিপরীত অভিমুখে ছুটে চললেন, তখন সমান্তরাল পথে দিগম্বরীর অস্তিত্বকেও তিনি অস্বীকার করে গেলেন নিজের অজান্তে। কানাঘুষো কথায় বিশ্বাস করেননি দিগম্বরী। পর্দানশীন সেই যুগে নিজেই আর দু-একজন অন্তঃপুরিকার সঙ্গে গোপনে পৌঁছে গিয়েছিলেন বেলগাছিয়া ভিলায়। নিজের চোখে দেখেছিলেন দ্বারকানাথের সাহেবদের সঙ্গে একাসনে বসে পানাহার। আসলে, মেয়েদের মনে প্রিয় পুরুষের একটা আদর্শ মূর্তি থাকে। একবার ভেঙে গেলে, তা আর জোড়া লাগে না। দিগম্বরীরও নিশ্চয়ই দ্বারকানাথ সম্পর্কে এমন কোনো অনুভূতি ছিল। চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনেও ঘটে গেল এক দারুণ বিপ্লব। ইতিহাস কিন্তু তার খোঁজ রাখেনি।

বুঝিয়ে কাজ হবে না জেনে দিগম্বরী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন — স্বামীকে ত্যাগ করার। দূর দূরান্ত থেকে ব্রাক্ষ্মণরা এলেন। হিন্দু বিবাহে তখনও বিচ্ছেদের নিয়ম ছিল না। সেই আইন তখন ভবিষ্যতের গর্ভে—তখনও অনাগত ১৯৫৪ সালের অজানার আঁধারে রয়েছে। সেই কারণে, দ্বারকানাথের সঙ্গে সহবাস না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন এই তেজস্বিনী নারী। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন দ্বারকানাথের মা অলকাসুন্দরী এবং ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল। দিগম্বরীর নেতৃত্বে ঠাকুরবাড়ির মহিলারা দ্বারকানাথকে বসতবাড়ি থেকে বহিষ্কার কয়ার  সিদ্ধান্ত নেন— এমনটাই বলেছিলেন ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা দ্বারকানাথের জীবনীতে। দ্বারকানাথ একরকমভাবে স্বেচ্ছা নির্বাসন গ্রহণ করেন জোড়াসাঁকোর বৈঠকখানা বাড়িতে। কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখে স্বামীর প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন দিগম্বরী। প্রতিদিন প্রাতঃকালে  একটি প্রণাম এবং সাংসারিক সৌজন্যমূলক কথোপকথন — এই ধার্য ছিল দ্বারকানাথের জন্য। দিগম্বরী থাকতেন জোড়াসাঁকোর বাড়ির উত্তরপূর্বাঞ্চলে। কোনোদিন যদি দ্বারকানাথের সঙ্গে বাক্যবিনিময় হত তাঁর, সেই দিন সাত ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করে শুদ্ধ হতেন তিনি। এমনি ছিল স্বামীর প্রতি তাঁর কঠিন উদাসীনতা । স্বামীর ঘর ত্যাগ না করেই আজীবন মৌন ভর্ৎসনা করে গিয়েছিলেন দিগম্বরী নিজের স্বামীকে। কতটা মানসিক জোর থাকলে এই আচরণ করা যায় বলুন তো!

এখন মনে প্রশ্ন জাগে, এতটা কাঠিন্য কেন? শুধুই কি পানাহারের কারণে দ্বারকানাথকে ত্যাগ করেছিলেন দিগম্বরী? নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা দ্বারকানাথের জীবনীতে লিখেছিলেন, ‘যখন হইতে দ্বারকানাথ সাহেবদের সহিত খানায় যোগ দিলেন এবং মদ্যপান করিলেন সেই দিন হইতে তাঁহার পত্নী নিজ সম্বন্ধ কার্যত বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছিলেন। —— আসল কথা এই যে হয়তো কোনো ইংরেজ মহিলা আসিয়া well Dwarakanath বলিয়া হাতে একটা বিস্কুট গুঁজিয়া দিলেন, তখন তো আর তিনি ফেলিয়া দিয়া তাহার অপমান করিতে পারেন না——’।  উনিশ শতকের এক সুন্দরী, তেজস্বিনী গৃহবধূ কি স্বামীর এই একটু করে দূরে সরে যাওয়া সহ্য করতে দায়বদ্ধ ছিল? সমাজ তাই মনে করতো বটে। এখনও অনেকেই মনে করেন দিগম্বরীর অতিরিক্ত ধর্মপ্রাণতা দ্বারকানাথকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিয়েছে। কিন্তু একটি মেয়ের মনের অভিমানের প্রকাশ ঠিক কেমন হবে, তা কে ঠিক করে দেবে? বছরের সব ঋতুতে স্বামীর সঙ্গে কথা বলে কোন অভিমানে একটি মেয়ে ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে শুদ্ধ হতে চাইতেন? তাঁর চোখের জল ওই সাতঘড়া জলের সঙ্গে ধুয়ে যেতো কীনা , তার খবর উনিশ শতক কেন, এই একবিংশ শতকও রাখে না। শরীরের প্রতি এই ইচ্ছাকৃত অত্যাচারে, ব্রত উপবাস পালনের মাত্রাধিক্যে দিগম্বরীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। এরপর ১৮৩৯ সালের ১৮ জানুয়ারি তেরো বছরের সন্তান ভূপেন্দ্রনাথের মৃত্যুর ঠিক তিনদিন পরেই ২১ জানুয়ারি দিগম্বরী দেবী মারা যান। যে লক্ষ্মীমন্ত পা একদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি স্পর্শ করেছিল সৌভাগ্য নিয়ে, সেই প্রতিমার মতো দুটি চরণ থেকে সকলে জ্যোতির্ময় আলোর বিচ্ছুরণ দেখেছিলেন দিগম্বরীর মৃত্যুর পর । দ্বারকানাথের  কোম্পানির  মালসমেত জাহাজ সমুদ্রে ডুবে যায় দিগম্বরীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই। দ্বারকানাথ সেদিন অনুভব করেছিলেন নিজের লক্ষ্মীছাড়া অবস্থা। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছেন একটি দৃপ্ত, বিদ্রোহিনী নারী। সময় তাঁর কাঠিন্যকেই মনে রেখেছে। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে দিগম্বরী বিষয়ে খুব একটা তথ্য পাওয়া যায় না। কেই বা জানে, হয়তো ওই দৃপ্ত মুখোশের আড়ালে একটা অভিমানী মুখের গল্প নির্বাসিত হয়ে আছে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে। দিগম্বরীর অভিমান আর বিপ্লব এক হয়ে গিয়েছিল। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
১) ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
২) দ্বারকানাথের জীবনী , ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩) ঠাকুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন, সমীর সেনগুপ্ত
৪) দ্বারকানাথ— পরাধীন দেশের রাজপুত্র , রাজা ভট্টাচার্য

Developed by DXDasia