
তরুণ কবি তখনও বিশ্বকবি হয়ে ওঠেননি
‘শুন সখি,বাজত বাঁশি/ গভীর রজনী, উজল কুঞ্জপথ,/ চান্দ্রম ডারত হাসি।/ দক্ষিণপবনে কম্পিত তরুগণ/ তম্ভিত যমুনাবারি,/ কুসুমসুবাস উদাস ভইল, সখি,/ উদাস হৃদয় হমারি।’
মনটা কেমন প্রাচীন পদাবলীর পুরোনো বইয়ের হলদে পাতায় উঁকি দিচ্ছে না? মধ্যযুগের কোনো কবির পদে রাধা গভীর রজনীতে উদাস হয়ে যাচ্ছেন কৃষ্ণের বাঁশি শুনে। এমনটাই মনে হচ্ছে তো? কিন্তু মধ্যযুগ নয়, উনিশ শতকের এক তরুণ কবি কোনো এক মেঘলা মধ্যাহ্নের ছায়াঘন অবকাশে বাড়ির ভিতরে এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হয়ে একটি স্লেটে প্রথম এমনই একটি পদ লিখেছিলেন— ‘গহনকুসুম কুঞ্জমাঝে—’! তারপর তো ধীরে ধীরে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীর নির্মাণ ও সৃষ্টি হল। ওই তরুণ কবি তখনও বিশ্বকবি হয়ে ওঠেননি। তাই অনায়াসে ভানুসিংহ ঠাকুরের নামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন আর পাঠকের দরবারে মধ্যযুগের নস্টালজিয়া নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো এক নতুন পদাবলী। বেশ রহস্য ঘনিয়ে তুললেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ ওই পদগুলিকে ঘিরে। এক বন্ধুর কাছে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদলেন! ব্রাহ্ম সমাজের লাইব্রেরিতে বহুকালের একটি জীর্ণ পুঁথি খুঁজে পাওয়ার গল্প! রবীন্দ্রনাথ নাকি ভানুসিংহ নামের কোনো এক প্রাচীন কবির পদ কপি করে এনেছেন। সেই তথাকথিত ‘কাপি করা’ পদ শুনে সেই শ্রোতার মুগ্ধতার রেশ বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসের পদের মুগ্ধতার সীমাকে যখন ছাড়িয়ে যেতে বসেছে, তখন রবীন্দ্রনাথ নিজের কবিত্ব স্বীকার করে নিজের খাতাখানা দেখিয়েছিলেন। তারপর উত্তর এসেছিল— ‘নিতান্ত মন্দ হয় নাই।’ এরপর ‘ভারতী’ পত্রিকার পাতায় বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় তেরোটি ভানুসিংহ ঠাকুরের পদ প্রকাশিত হয়েছিল।
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ছোটোবয়স থেকে অপেক্ষাকৃত বড়ো বয়স পর্যন্ত দীর্ঘকালের সূত্রে গাঁথা’ কয়েকটি কবিতা নিয়ে ‘ ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ’ প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংস্করণের আখ্যাপত্রে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে প্রকাশক রূপে বিজ্ঞাপিত করেছিলেন— ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী শৈশবসঙ্গীতের আনুষঙ্গিক স্বরূপে প্রকাশিত হইল। ইহার অধিকাংশই পুরাতন কালের খাতা হইতে সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছি।’ এরপর ১৯২১ সালে এই পদগুলি গ্রন্থাকারে আবার প্রকাশিত হয় । কিন্তু তখন কবির পরিচয় নিয়ে এই রহস্য রোমাঞ্চ ছিল না। অথচ, ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত এই ব্রজগাথাগুলির উচ্চারণ বিষয়ে বেশ একটা নির্দেশ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ— ‘এই ব্রজগাথাগুলি হিন্দুস্থানী উচ্চারণে ও দীর্ঘ হ্রস্ব রক্ষা করিয়া সংস্কৃত ছন্দের নিয়মানুসারে না পড়িলে শ্রুতিমধুর হয় না— প্রত্যুত হাস্যজনক হইয়া পড়ে।’ ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর ‘ নবজীবন ’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ একটি অস্বাক্ষরিত পরিহাসমূলক রচনায় কাল্পনিক এই ভানুসিংহ বিষয়ে একটি আলোচনা করেছিলেন। প্রবন্ধে ইঙ্গিত ছিল, রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভানুসিংহ! রবীন্দ্রনাথ ভানুসিংহ সম্পর্কে একথাও বলেছিলেন যে, ভানুসিংহের কবিতা একটু বাজিয়ে বা কষিয়ে দেখলেই তার মেকি বার হয়ে পড়ে। তাতে আমাদের দেশি নহবতের প্রাণগলানো ঢালা সুর নেই। তা আজকালকার সস্তা আর্গিনের বিলাতি টুংটুং মাত্র।
উনিশ শতকে এর আগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বৈষ্ণবপদাবলীর প্রেরণায় লিখেছিলেন ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’। কিন্তু সেই কাব্যের ভাষা ছিল বাংলা এবং রাধাকে মধুসূদন আধুনিক নারীর মতো সম্মান দিয়ে বলেছিলেন— ‘Mrs Radha’! সেখানে মধ্যযুগের আবহ বা ভাষার ঝংকার ছিলো না। রবীন্দ্রনাথ অনুসরণ করেছিলেন অন্য এক কিশোর কবিকে, চ্যাটার্টনকে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু অক্ষয়বাবুর কাছে ইংরেজ কবি চ্যাটার্টনের গল্প শুনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অল্পবয়সে আত্মহত্যা করেছিলেন সেই কিশোর কবি। এই পদগুলি লেখার অন্তরালে চ্যাটার্টনের প্রেরণার কথা উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— ‘আপাতত ওই আত্মহত্যার অনাবশ্যক অংশটুকু হাতে রাখিয়া কোমর বাঁধিয়া দ্বিতীয় চ্যাটার্টন হইবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইলাম।’
টমাস চ্যাটার্টন! কোলরিজ তাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘আ মান ডে অন চ্যাটার্টন’, কিটস নিজের ‘এনডিমিয়ন’ এবং শেলি ‘অ্যাডোনিস’ তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। বিখ্যাত টেট গ্যালারিতে রাখা হয়েছিল তাঁর বড়ো প্রতিকৃতি। পৃথিবী তাঁকে ভোলেনি! কিন্তু এইসবই হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর। চ্যাটার্টনের জীবন তো শেষ হয়ে গিয়েছিলো কিশোর বয়সেই। আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। কারণ ব্রিটেনের গোঁড়া মানসিকতার পাঠকসমাজ তাঁকে সম্মান নিয়ে বাঁচতে দেয়নি। ব্রিস্টল শহরের এক গির্জার কর্মচারী ছিলেন তাঁর বাবা। দরিদ্র পরিবার, কল্পনাপ্রবণ এক বালক আর তাঁর মধ্যযুগীয় কবিতার প্রতি অজানা টান— এই তো চ্যাটার্টনের জীবনের গল্পের সূত্র। মধ্যযুগের কবিতা, কাব্যের ভাষা ও বিষয় খুব ভালোবাসতেন ছেলেটি। গির্জার কোনো এক গোপন প্রকোষ্ঠে পুরোনো আমলের কবিতা পড়ে হবহু নকল করতে শুরু করেছিলেন তার ভাষা, ভঙ্গি, ছন্দ এবং নকল করেছিলেন পঞ্চদশ শতকের কবিদের হস্তাক্ষর। তারপরেই তাঁর মানসলোকে জন্ম নিলেন রাউলিং নামের এক মধ্যযুগীয় কবি। এই নামের আড়ালে চ্যাটার্টন সত্যিই লিখে ফেললেন অসংখ্য মধ্যযুগের আবহে লেখা কবিতা। প্রকাশ করে ফেললেন সকলের অজানা থম্পসন রাউলি নামে মধ্যযুগীয় কবির কবিতা। এই অসাধারণ কবিতা পাঠকের মন ছুঁয়ে গেল। কিন্তু টমাস চ্যাটার্টন পাঠকদের কাছে নিজের আসল পরিচয় দিতে পারলেন না। কারণ নিছক রহস্যের জন্য বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন জাল দলিল দস্তাবেজের সাহায্যে। বহু পণ্ডিত ধরতে পারেননি সেই ছলনা। কিন্তু যখন বিষয়টির রহস্য উন্মোচিত হল, তখন ব্রিটেনের পাঠকসম্প্রদায় চরম অপমান করেছিলেন উদীয়মান এই কবিকে। দরিদ্র চ্যাটার্টনের পাশ থেকে সরে গিয়েছিলেন প্রকাশকরা। তিনবছর জীবিকা নির্বাহের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন কিশোর কবি। তার উপর সমাজের ব্যঙ্গ তাঁকে আর বাঁচতে দিলো না। মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছিলেন এই কবি।
এই কবির গল্প শুনে প্রায় একই ধরণের কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে। কিন্তু দরিদ্র ছিলেন না তিনি। তাই বিষয়টি নিছক রসিকতার স্তরেই রয়ে গেল। তবে, ব্রজবুলি ভাষার প্রতি আকর্ষণ এবং বৈষ্ণবপদাবলীর প্রতি ভালোবাসাও ভানুসিংহঠাকুরের পদাবলী লেখার অন্যতম কারণ। আর একটা কথা খুব মনে হয়! রবীন্দ্রনাথ তখন খ্যাতির শিখর স্পর্শ করেননি। অনেক সমালোচনার স্তর পার হয়ে চলেছিল তাঁর কবিজীবন। হয়তো ফেলে আসা দিনের এক দুঃখী , পরাজিত কবির বেদনা স্পর্শ করেছিলো তাঁর হৃদয়। তখনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে উঠেছিলেন ভানুসিংহ ঠাকুর! ঠিক যেমন করে টমাস চ্যাটার্টন হয়ে গিয়েছিলেন থম্পসন রাউলি।
সহায়ক গ্রন্থঃ
১. ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, রবীন্দ্ররচনাবলী, প্রথম খণ্ড
২. রবীন্দ্ররচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ষোড়শ খণ্ড
৩. ‘ভানুসিংহ ঠাকুর ও টমাস চ্যাটার্টন ( প্রবন্ধ), রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ , পূর্নানন্দ চট্টোপাধ্যায়
ইন্টারনেট সূত্রঃ
https://www.jugantor.com/m/todays-paper/literature-magazine/64355
