আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই পরস্পর বিপরীত ভাবনার সহাবস্থান সত্যিই হাইলি সাসপিশাস
কলকাতা শহরের বুকে একটি অভিজাত পরিবার। সেখানকার এক সদস্য এক্কেবারে দিনদুপুরে দেখে ফেললেন এক পরিচিত মানুষের আত্মাকে। তারও আগে, সেই বাড়িরই একটি ছেলে গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে ছুটি পেয়ে বাইরের মহল থেকে হেঁটে যেত বাড়ির ভিতরের আব্রু দেওয়া পথে, উপর থেকে ঝুলত মিটমিটে আলো লন্ঠন। সে চলত বটে, কিন্তু মন বলত কী জানি কীসে বুঝি পিছু ধরেছে। পিঠ উঠতো শিউরে। তখন ভূত প্রেত ছিল গল্পে-গুজবে, মানুষের মনের আনাচে কানাচে। সেই গল্প থেকেই উঠে আসত মস্ত হাঁ, কুলোর মতো কান, উল্টো পায়ের কোনো আজব মূর্তি। বাড়ির পশ্চিম কোণের ঘন পাতাওয়ালা বাদাম গাছের ডালে এক পা আর অন্য পা’টা তেতলার কার্নিশের উপর দিয়ে আবির্ভূত হত সে। ওই বাড়ির শিশুদের তোলপাড় করতো বুকের ভিতরটা, পায়ে লাগত তাড়া।
বাড়িটি নিয়ে আর রহস্য করছি না। বাড়িটি পুরোনো কলকাতার ঠাকুরবাড়ি, পরিবারটি ঠাকুরপরিবার। ঊনবিংশ শতকে নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে এই ব্রাহ্ম পরিবার নিজেদের মেধাবী মন এবং রুচিশীল মননের জোরে বাঙালিকে মুগ্ধ করেছে বারবার। আমাদের আলোচনার ফোকাস কিন্তু সম্পূর্ণ অন্যদিকে। আমরা দেখাব, শিক্ষিত মন এবং যুক্তিবাদী ভাবনার সঙ্গেই কীভাবে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছিল ঠাকুরবাড়ির প্রেতচর্চা। সাহিত্যে ভৌতিক প্রসঙ্গের কথা না হয় বাদ রাখলাম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই পরস্পর বিপরীত ভাবনার সহাবস্থান সত্যিই হাইলি সাসপিশাস। তাই না?

থিওসফিক্যাল সোসাইটির আধিভৌতিক চর্চা সেই সময় বাঙালি মনকে রীতিমতো আবিষ্ট করে রেখেছিল। নিউইয়র্কের থিওসফিক্যাল সোসাইটির অনুকরণে ১৮৮০ সালের মে মাসে ‘ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন অফ স্পিরিচুয়ালিস্টস’ প্রতিষ্ঠা করেন প্যারিচাঁদ মিত্র। এরপর মাদাম ব্লাভাটস্কির কলকাতায় পৌঁছনোর পর থিওসফিক্যাল সোসাইটির বঙ্গীয় সভা তৈরি হয়। এই সভার সহ সভাপতি ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সহ সম্পাদক ছিলেন মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়। একজন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ো ছেলে এবং অন্যজন বড়ো জামাই। দেবেন্দ্রনাথের মেয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন থিওসফিক্যাল সোসাইটির মহিলা শাখার প্রেসিডেন্ট। তাঁর স্বামী জানকীনাথ ঘোষালও ছিলেন থিওসফিস্ট সম্প্রদায়ভুক্ত। তাঁদের মেয়ে সরলা দেবীর লেখা ‘জীবনের ঝরাপাতা’ বইটি থেকে এইসব তথ্য জানা যায়।
‘থিওসফির তখন খুব প্রচার, আমাদের বাড়ীতে মহিলা থিওসফিক্যাল সভা বসত।’
পরে এই সভা ভেঙেই তৈরি হয়েছিল ‘সখি সমিতি’। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাই ছিলেন মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়। তিনি শুধু যে এই সভার সভ্য ছিলেন তা নয়, এই সোসাইটির প্রচারক হয়ে তিনি বিদেশেও গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর কাছ থেকেই কবি ও দার্শনিক ইয়েটস জানতে পারেন রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চার কথা। ইয়েটস দৃশ্যমান জগতের ঊর্ধ্বে যে মায়াপুরীর সন্ধান করেছিলেন, তা যে মোহিনী মোহনের সংস্পর্শে এসেই দানা বাঁধে, তা জানা যায় মোহিনীমোহনের ছেলে তপনমোহনের লেখা ‘স্মৃতিতরঙ্গ’ বইটি থেকে।
অবনীন্দ্রনাথের মেয়ে করুণার স্বামী ছিলেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি রবীন্দ্রনাথের খুব ভক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেটের আসরেও তাঁকে দেখা যেত। আবার শোনা যায়, মৃত্যুর পর আত্মা হিসেবেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাড়া পেয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ নিজেও প্ল্যানচেটে বসতেন। দিনদুপুরে পরিচিত মানুষের আত্মাকে তিনিই নাকি দেখেছিলেন।
প্ল্যানচেটের মধ্যে দিয়ে পরলোকচর্চা ছিল ঠাকুরবাড়ির বৈশিষ্ট্য। এমন ঘটনার কথা রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’তেও করেছেন। ঠাকুরবাড়ির খাজাঞ্চি কৈলাস মুখুজ্যের আত্মা নাকি পরলোক সম্পর্কে এক মজাদার মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে কষ্ট করে মারা গিয়ে যা তিনি জেনেছেন, তা প্রশ্নকর্তারা না মরে জেনে নিতে পারেন না। বিশ্বভারতীতে রাখা ‘মালতি পুঁথি’তে ১৮৮০ থেকে ১৮৮১ সালের একটি প্ল্যানচেট লিখনের কথা জানা যায়। সম্বোধনের ভঙ্গি থেকে অনুমান করা যেতে পারে এই লেখাটির উদ্যোক্তা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিলেতে থাকাকালীন স্কট সাহেবের বাড়িতে প্ল্যানচেটের বৈঠকের কথাও পরিণত বয়সে তিনি স্মরণ করেছিলেন।
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ অমিতা ঠাকুরের কথা থেকে জানা যায় মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ নাকি প্ল্যানচেটের সাহায্যে স্ত্রীর সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছিলেন। রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীর বিয়ের সময় স্ত্রীর বিদেহী আত্মার মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত এই মানুষটি। অমলা দাসকে মৃণালিনী দেবী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে মানুষ মারা গেলেই যে একেবারে হারিয়ে যায়, জীবিত প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, একথা তিনি বিশ্বাস করেন না। হয়তো মৃণালিনীর সঙ্গে তাঁর অতিন্দ্রীয় যোগাযোগ এই মন্তব্যের ভিত্তি।
উনিশ শতকের থিওসফিক্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে কিছু জার্নাল বেরতো। রবীন্দ্রনাথ সেইগুলি নিয়মিত পড়তেন। স্বামী অভেদানন্দের লেখা ‘মরণের পারে’ বইটি পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পাশ্চাত্যে যাঁরা তখন পরলোকচর্চা নিয়ে মেতেছিলেন, সেই স্টপফোর্ড ব্রুকস, স্যার অলিভার লজের মতোন মানুষদেরও চিনতেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৬ সালে দিলীপ কুমার রায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে কথাবার্তার সূত্রে প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘আলোচনা’ নামে একটি প্রবন্ধও বেরোয়। ১৯২৯ সালের পর মোহিতচন্দ্র সেনের মেয়ে বুলাকে মিডিয়ম করে রবীন্দ্রনাথ প্ল্যানচেট করেছিলেন। ১৯২৯ সালের ৬ নভেম্বর রানি মহলানবীশকে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন,
‘সেদিন বুলা এসেছিল। হঠাৎ কথায় কথায় প্রকাশ পেল তার হাতে প্রেতাত্মা ভর করে পেন্সিল চালিয়ে কথা কইতে পারে। বলা বাহুল্য শুনে মনে মনে হাসলুম। বললুম— আচ্ছা দেখা যাক। প্রথমে নাম বেরলো মণিলাল গাঙ্গুলি। তার কথাগুলোর ভাষা ও ভঙ্গির বিশেষত্ব আছে। উত্তরগুলো শুনে মনে হয় যেন সেই কথা কইছে। ’
এই সন্দেহ থেকে বিশ্বাসের স্তরে পৌঁছে যাওয়ার আড়ালে ছিল নতুন একটি জগৎ সম্পর্কে জানার আগ্রহ। তারপর ধীরে ধীরে এই পরলোকচর্চা ঘিরে আসবেন নতুন বৌঠান, মৃণালিনী, বেলা, শমী, রানি, বলু, জ্যোতিদাদা, লোকেন, সুকুমার, সত্যেন, অজিত, সতীশ, মণিলালেরা। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে রাখা আটটি খাতায় বেশ এলোমেলোভাবে লেখা আছে রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চার ইতিবৃত্ত। এই খাতাগুলির নাম —‘ভৌতিক প্রসঙ্গ’। আত্মার উত্তরগুলো সব পেন্সিলে লেখা।

জীবনের শুরুতে নেহাত হালকা চালে, মজা করে প্রেতচর্চা করতেন রবীন্দ্রনাথ। স্যার এডমণ্ড হর্ণবির জীবনের একটি অলৌকিক অভিজ্ঞতার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লিখেছিলেন, ‘…অলৌকিক ঘটনার প্রামাণ্য সাক্ষ্য সম্বন্ধে নিঃসংশয় হওয়া দুঃসাধ্য হইয়া ওঠে’। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গিই কেমন করে বদলে যাবে, নির্জন ঘরে মিডিয়ামদের সাহায্যে নিরালায় জমে উঠবে আত্মাদের সঙ্গে কথোপকথন— এই বদলটি সত্যিই রোমাঞ্চকর। মনে হয়, একের পর এক প্রিয়জন হারিয়ে বড়ো নিঃসঙ্গ, নিরুপায় হয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই কারণে বাস্তবজীবনে যাঁদের আর কোনোদিন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, প্রেতচর্চার অলৌকিক উপায়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ভাব বিনিময় করেছেন। উদাসী হাওয়ার স্পর্শ নিয়ে এসেছেন নতুন বৌঠান, বৃক্ষলোকের থেকে এসে শমীন্দ্রনাথ তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া বেলা, রেণুকার সঙ্গে যোগাযোগ করে শান্ত হয়েছে বুভুক্ষু পিতৃহৃদয়। মৃণালিনী দেবীর মতামত ভেসে এসেছে পরলোক থেকে।
ঠাকুরবাড়ির ভৌতিক সাহিত্যে প্রেতচরিত্ররাও মানবিক, জটিল সমস্যার কথা বলেছে। অভিজাত এই পরিবারের শিশু সদস্যদের ছোটোবেলা কাটতো দাসদাসীদের মুখে কল্পলোকের গল্প শুনে। সেই গল্পগুলি ভাবুক মনের মগ্নচেতনে ডালপালা মেলে ছিল। উনিশ শতকের সমাজে প্রেতচর্চার প্রভাব এবং প্রিয়জনেদের মৃত্যুতে ঠাকুরবাড়ির ওই ভাবুক সদস্যরা অন্ধভাবেই বিশ্বাস করেছিলেন এই অলৌকিক পৃথিবীকে। অন্ধকার ঘরে, গোলটেবিলে, মোমবাতির আলোয় নিভৃতে বসেছে প্ল্যানচেটের আসর। পরলোকের ওপার থেকে ডাক পড়েছে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের। তাঁরাও বুঝি এসেছেন। অনুভব করিয়েছেন নিজেদের প্রিয় স্পর্শ। নীরব, বায়বীয় উপস্থিতিতে ভরাট করেছেন পৃথিবীতে রয়ে যাওয়া প্রিয়জনেদের শূন্য হিয়া। কেই বা বলতে পারে, ওই ঘরের অন্ধকার আর মগ্নচেতনের আঁধার এক কীনা! যদি তাই হয়, ‘ভূত’ তো তাহলে অতীত। ঠাকুরবাড়ির প্রেতচর্চাও ফেলে আসা অতীতে ফিরে যেতে চাওয়ার ছলনা মাত্র।
সহায়ক বই
রবীন্দ্ররচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
অমিতাভ চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথের পরলোক চর্চা ইত্যাদি
সরলা দেবী, জীবনের ঝরাপাতা
সমীর সেনগুপ্ত, রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঘরোয়া ইত্যাদি