এক নিঃসঙ্গ পরিবারের কুশারী থেকে ‘ঠাকুর’ হওয়ার গল্প

নামটা হওয়া উচিত ছিল রবীন্দ্রনাথ কুশারী, কিন্তু হয়ে গেলেন বিশ্বের ঠাকুর

নামটা হওয়া উচিত ছিল রবীন্দ্রনাথ কুশারী। কিন্তু বিশ্ববিখ্যাত যে কবি আমাদের গর্ব, তিনি তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই যে কুশারী থেকে ঠাকুর হওয়ার গল্প, আজ তাই বলি। 

রবীন্দ্রনাথের পরিবার ছিলেন পিরালী ব্রাহ্মণ । একরকমভাবে সমাজে পতিত। তাই বিয়ের সময় পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবার খুঁজে, পাত্রী নিয়ে আসা হতো। এই ছিল বাড়ির দস্তুর। এখন, এই পিরালী ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠার গল্প জানতে হলে ঠাকুরবাড়ির আদিপুরুষদের জীবনের কথা জানতে হবে। রঘুনাথ আচার্যের বংশধর ছিলেন জয়কৃষ্ণ। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে একজন ছিলেন দক্ষিণানাথ। যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার জমিদার ছিলেন ঠাকুরবাড়ির পূর্বপুরুষরা। দক্ষিণানাথের চার ছেলে— কামদেব, জয়দেব , রতিদেব ও শুকদেব। সামান্য এক রসিকতার পরিণতি হিসেবে কামদেব আর জয়দেবকে কামাল খাঁ আর জামাল খাঁ নাম নিয়ে বাকি জীবন মুসলিম ধর্মের অংশ হয়ে থাকতে হয়।  তারই ফলাফল হিসাবে রবীন্দ্রনাথের পরিবার সমাজের এক সংকীর্ণ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। 

খান জাহান আলি যশোরের চেঙ্গুটিয়া পরগনার কর্তৃত্ব লাভ করার পর, তাঁর সঙ্গে আসেন তাহের খাঁ নামের এক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলমান । নবদ্বীপের পিরল্যা গ্রামে তাহের খাঁ কিছুদিন বসবাস করেছিলেন বলে তিনি পিরল্যা খাঁ নামে পরিচিত ছিলেন। জনশ্রুতি এই যে তাহের খাঁ রোজা চলাকালীন একটি লেবুর ঘ্রাণ নিয়েছিলেন। তখন কামদেব ঘ্রাণে অর্ধভোজন — এই প্রবাদ ব্যবহার করে তাহের খাঁর সঙ্গে রোজা নষ্ট হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত রসিকতা করেন। এরই সূত্র ধরে জয়দেব আর কামদেবকে গোমাংসের গন্ধ এবং স্বাদ অনুভব করিয়ে তাঁদের সমাজে পতিত করা হয়। ঘোষণা করে দেওয়া হয়, কামদেব আর জয়দেব নাকি এই পদ্ধতিতেই ধর্মান্তরিত হয়েছেন। গোঁড়া হিন্দু সমাজ তাদের গ্রহণ করে নি আর। সুযোগ পেয়ে তখনকার  কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজ শুধু কামদেব জয়দেবকে নয় , তাদের আত্মীয় কুটুম্ব সকলকেই ‘পিরালী থাকের ব্রাহ্মণ’ আখ্যা দিয়ে তৃপ্তি পেয়েছিল। ‘পির’ অর্থাৎ মুসলমান সংসর্গ হয়েছিল বলে ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’! অনেকে আবার মনে করেন পিরল্যা খাঁয়ের কারণেই এই পিরালী থাকে অন্তর্ভুক্তি। শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যে সব পরিবার কূলাচার্যের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হইয়া সমাজে পতিত থাকিয়া গেল, তাঁহাদেরই অন্যতম হইতেছে পীরালী ব্রাহ্মণ গণ।’ কামদেব আর জয়দেবের অন্য দুই ভাই দক্ষিণডিহির বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু সমাজের অত্যাচারে তাঁরাও ঘর ছাড়তে বাধ্য হন। এই ঘটনার জেরে তাঁরা অতিকষ্টে অনেক অর্থব্যয় করে, কখনো ছল চাতুরির আশ্রয় নিয়ে পরিবারের মেয়েদের পাত্রস্থ  করতেন। 

এইভাবেই শুকদেবের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী। অবশ্যম্ভাবী ভাবে তিনি সমাজের রোষদৃষ্টিতে পড়ে পিঠাভোগ ছাড়তে বাধ্য হন এবং দক্ষিণডিহিতে এসে বসবাস শুরু করেন। এই জগন্নাথ কুশারীই ছিলেন ঠাকুরগোষ্ঠীর অন্যতম আদিপুরুষ। জগন্নাথের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল পুরুষোত্তম। তাঁর সম্পর্কে তারিখহীন এক চিঠিতে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর জ্ঞানদানন্দিনীকে জানিয়েছিলেন যে এই পুরুষোত্তম নাকি এক মুসলিম রাজকুমারীকে বিয়ে করে সমাজে আবার  পতিত হয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সত্যটিকে বিশ্বাস করেছিলেন। তবে এই সম্পর্কে আর কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। 

এই পুরুষোত্তমের প্রপৌত্র ছিলেন রামানন্দ। তাঁর দুই সন্তান মহেশ্বর ও শুকদেব জ্ঞাতিদের সঙ্গে অশান্তি এড়াতে কলকাতার দক্ষিণে গোবিন্দপুরে এসে থাকতে শুরু করেন। তখন তাঁদের গৃহদেবতা ছিলেন শিব। গঙ্গাতীরে জমি কেনা এবং বাড়িতে শিব প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে তাঁদের পৌত্তলিক পরিচয়টিই স্পষ্ট ছিল। 

এইসময় ইংরেজদের বাণিজ্যতরী এসে ভিড়ত গোবিন্দপুরের গঙ্গায়। কুশারীদের উত্তরপুরুষ পঞ্চানন কুশারী সেই সময় ইংরেজ কাপ্তেনদের খাদ্যসামগ্রী, জল সরবরাহের কাজ করতেন। ওই শ্রমসাধ্য কাজে পঞ্চাননকে সাহায্য করতেন এলাকার খেটে খাওয়া মানুষজন। আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণসন্তান বলেই, পঞ্চাননকে তারা ‘ঠাকুরমশাই’ বলে ডাকতেন। সেই থেকে ধীরে ধীরে কুশারী পদবী হারিয়ে গেল  ‘ঠাকুর’ সম্বোধনের আড়ালে। 

পঞ্চাননের দুই ছেলের নাম ছিল জয়রাম আর জয়সন্তোষ। জয়রামের চার ছেলে—আনন্দীরাম, নীলমণি, দর্পনারায়ণ এবং গোবিন্দরাম ১৭৬৪ অব্দে কলকাতা গ্রামে পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে জমি কিনে বসতবাড়ি তৈরি করেন এবং বাবার নির্দেশে তেরো হাজার টাকার কোম্পানির  কাগজ কিনে তখনকার  গৃহদেবতা শ্রী রাধাকান্ত জিউর নামে ব্রহ্মত্র করে দেন। ওই টাকার সুদে দেবপুজোর ব্যবস্থা হয়। এরপর পাথুরিয়াঘাটার একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেল নীলমণি আর দর্পনারায়ণের মনোমালিন্যের কারণে। নীলমণি একলক্ষ টাকা আর লক্ষ্মীজনার্দনের ভার নিয়ে পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। জোড়াবাগানে বৈষ্ণবচরণ শেঠের কাছ থেকে বর্তমান জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির একবিঘা জমি ব্রহ্মত্র সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছিলেন। তখন অঞ্চলটি জোড়াসাঁকো নয়, ‘মেছুয়াবাজার’ হিসেবে পরিচিত ছিল। ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণেই নীলমণির পরিবারকে সকলে ‘মেছুয়াবাজারের গোঁড়া’ বলে সম্বোধন করতেন। পিরালী থাকের ব্রাহ্মণ হয়েও রাধাকান্ত জিউ, লক্ষ্মীজনার্দন এবং শালগ্রামশিলার নিষ্ঠাবান উপাসক হিসাবেই হিন্দু সমাজে সদ্য মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিলো ঠাকুর পরিবার। অন্দরমহলে ছিল প্রবল বৈষ্ণবীয় আবহাওয়া। নিরামিষ ছাড়া খেতেন না, ঠাকুরবাড়ির সেই আমলের নারীপুরুষ। মহাসমারোহে পুজো পার্বণ অনুষ্ঠিত হতো। 

কিন্তু সমাজের মূলস্রোত থেকে ভিন্ন হওয়াই এই পরিবারের ভবিতব্য। তাই দ্বারকানাথের আমল থেকে যে ধর্মীয় বাতাবরণের বদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই চিরাচরিত  ধর্মের মূলে কুঠারাঘাত করেন। ব্রাহ্মধর্মের প্রবল প্রতিষ্ঠা হয় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। সমাজের গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে পৃথক হয়ে এক নিঃসঙ্গ যাত্রা করেছে এই পরিবার। বহু প্রজন্ম ধরে। কিন্তু এই নিঃসঙ্গ যাত্রাই বারবার ইতিহাস তৈরি করেছে। সময় তার সাক্ষ্য বহন করবে। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল
রবীন্দ্রজীবনী,প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
জ্ঞানদানন্দিনী রচনা সংকলন, পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়

Developed by DXDasia