নোবেল প্রাপ্তি! জনতার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ বললেন, এসব আবেগ শুধুমাত্র ‘উত্তেজনার মায়া’

রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তি — শান্তিনিকেতনে অভিমানের একটি দিন

একটা কথা আছে জানেন তো? আনলাকি থার্টিন! সেই থার্টিনের গল্প শোনাই আজ। ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর। শীতের চাদর জড়ানো বোলপুর শহর হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠলো রবির কিরণে। কেন? টেলিগ্রাম  এল যে! সেদিন বিকেলবেলা প্রথম রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদে প্রথমেই বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে উঠেছিল শান্তিনিকেতন। প্রত্যক্ষদর্শী  ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনীকার এডওয়ার্ড টমসন। ছাত্ররা আনন্দে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। নোবেল পুরস্কার কী বস্তু, তারা বোঝেনি। শুধু তাদের গুরুদেব কোনো এক স্বপ্নের মতো সম্মান পেয়েছেন! এই উপলব্ধি থেকেই তারা গাইতে শুরু করে —‘ আমাদের শান্তিনিকেতন—’। রবীন্দ্রনাথ তখন বসেছিলেন টমসন সাহেবের সঙ্গে। তিনি বাইরে এসে দাঁড়াতেই সকলে প্রবল আবেগে প্রণত হয় বিশ্বকবির চরণে। আর রবীন্দ্রনাথ? প্রত্যক্ষদর্শী টমসনের বর্ণনা থেকেই বলি— "The saint of a man stood deprecating, with his hands to his face, palms  together, begging pardon." এই বিনীত, দুঃখে আনন্দে অবিচল পুরুষটিই রবীন্দ্রনাথ!

নোবেল পুরস্কার কীভাবে পেলেন, তা আমাদের আলোচ্য নয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথের অভিব্যক্তি আমাদের আজকের আলোচনার নিউক্লিয়াস। রবীন্দ্রনাথ সরস্বতীর সাধক। মগ্ন হয়ে সাধনা করে গিয়েছেন। নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন— এই সম্ভাবনার কথা জেনেই বিলেত থেকে ফিরেছিলেন। তাই সংবাদটি অবশ্যই আকস্মিক ছিল না। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ যে বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, সে বছর নোবেল পাওয়ার কথা ছিল বিখ্যাত ফরাসি লেখক এমিল ফাগের। কিন্তু স্টারজ মূয়র সুয়োডিশ অ্যাকাডেমির কাছে রবীন্দ্রনাথের নাম সুপারিশ করেন। ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য এই সম্মান পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এক বাঙালি কবি!

এই পর্যন্ত বেশ রূপকথার মতোন শোনায় ঘটনাগুলি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অনুভূতির প্রকাশগুলি এইসময়ও বিশিষ্ট। পুরস্কার প্রাপ্তির কয়েকমাস আগে দেশে ফিরেছেন। সুরের নেশা তখন তাঁকে ভর করে আছে।

দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সবসময় কাছে থাকতে বলছেন আর যেমনি মনে আসছে অমনি সুর সংযোজন ও রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। এ এক আশ্চর্য সৃষ্টির নেশা। কারণ দূরদর্শী রবীন্দ্রনাথ জানতেন স্তুতি এবং নিন্দার প্রবল এক ঝড় তাঁর উপর আছড়ে পড়তে চলেছে। তিনি নিজের সৃষ্টির আড়ালে নিজেকে গোপন রেখেছিলেন সেইসময়!

ঠিকই করেছিলেন, কারণ, একদিকে যাঁঁরা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে টেলিগ্রাম করছিলেন, তাঁরাই সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন তাঁর নোবেল প্রাপ্তির যোগ্যতা নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য প্রতিভাও নোবেল প্রাপ্তির আগে বাঙালি মানসে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কিন্তু ১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর যখন কয়েকশো বাঙালি কলকাতা থেকে বোলপুর পৌঁছলেন বিশ্বকবিকে সম্বর্ধনা জানাবেন বলে, ‘রবিঠাকুরের জয়’ এবং ‘ বন্দেমাতরম’ ধ্বনিকে একত্রে ধ্বনিত করেছিলেন যুক্তিহীন তাৎপর্যে—সেদিন রবীন্দ্রনাথ আচরণে অসংযম দেখিয়েছিলেন।তা সঙ্গত কী অসঙ্গত — সে বিচার আমরা করতে পারি না। ঘটনাক্রম বর্ণনা করতে পারি মাত্র।

‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ 

সংবাদপত্রে যা প্রকাশিত হয়েছিল, তার উপর ভিত্তি করেই সেই দিনটির একটি ছবি তৈরি করা যাক। সম্বর্ধনা যাঁরা দিতে এসেছিলেন, তাঁরা মিছিল করে, পায়ে হেঁটে শান্তিনিকেতনে এলেন। তাঁদের অভ্যর্থনা করেছিলেন রথীন্দ্রনাথ, ক্ষিতিমোহন সেন, অজিতকুমার চক্রবর্তী, সি এফ এন্ড্রুজ এবং আরও অনেকে। আমতলায় বৈদিক যজ্ঞভূমির মতো এক নকশাকাটা জায়গায় ধূপধুনো জ্বলছিল। পদ্মপাতা দিয়ে ঢাকা এক মাটির পদ্মাসনে কবি বসেছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন সভাপতির আসনে। তারপর হীরেন্দ্রনাথ দত্ত সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা প্রশস্তি পাঠ করেছিলেন। সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, ফজজুল হক, এক সম্ভ্রান্ত জৈন, ইংরেজ পাদ্রী, এক রাজপুরুষ বক্তৃতা করার পরে রবীন্দ্রনাথ বক্তব্য রাখলেন। প্রথমেই জানিয়ে দিলেন সমগ্র দেশের নামে এই যে সম্মান — তা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করার সাধ্য তাঁর নেই। দেশের দেওয়া অপযশ যে তিনি ভোলেননি, তা তাঁর কথা থেকে স্পষ্ট হল। নিঃশব্দে বহন করে চলা অপমানের পর এই হঠাৎ আদর যে তিনি মেনে নিতে অক্ষম — সেকথাও রবীন্দ্রনাথ জানিয়ে দিলেন অকপটে। দেশের মানুষের কাছে সেদিন যেন এসে দাঁড়ালেন এক অভিমানী কবি। দেশবাসী হয়তো সেদিন তা ঠিক করে বোঝেনি। কবির অভিমান সেদিন শব্দভেদী বাণ হয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল জনতার আবেগ। কবি বলেছিলেন— ‘যাই হোক, যে কারণেই হোক, আজ ইউরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোনো মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে। আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নাই। একথা শুনতে বেশ কটূ লাগলেও কবির জীবনে এ ছিল বাস্তব উপলব্ধি। তিনি জানতেন, এইদিন চিরকাল থাকবে না। আবার ভাঁটার বেলা আসবে, তখন পঙ্কতলের সমস্ত দৈন্য আবার ধাপে ধাপে প্রকাশ হতে থাকবে। তাই তিনি করজোড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, জনতার ওইদিনের আবেগ ‘উত্তেজনার মায়া’ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই সেই আদর ও সম্মানের সুরাপাত্র ওষ্ঠের কাছ পর্যন্ত ঠেকালেও তাকে অন্তরে গ্রহণ করতে পারবেন না। ‘এ মত্ততা থেকে আমি চিত্তকে দূরে রাখতে চাই’—এমনটাই বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উত্তেজিত জনতা সবসময়ই আবেগসর্বস্ব, বুদ্ধিবিবর্জিত হয়। তাই একসময়ের রবীন্দ্রবিদূষণের পর, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিকে জাতীয় আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথকে মুহূর্তে দেবতা বানিয়ে ‘বন্দেমাতরম ’ ধ্বনিতে অস্থির করে দিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অনেক গ্লানির পর যে সম্মান পেয়েছিলেন তাকে রাজনীতি এবং ফাঁপা আবেগের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে চাননি। এইদিনের আগে, নোবেল পাওয়ার পাঁচদিন আগে উইলিয়ম রোটেনস্টাইনকেও নিজের ক্ষোভ জানিয়েছিলেন— "The perfect whirlwind of public excitement has given rise to is frightful .It is almost bad as tying a tin can at a dog's tail ,making it impossible for him to move without creating a noise and collecting crowds all along." আসলে যাঁরা কোনোদিন তাঁর লেখার সম্পর্কে একটি শব্দও লেখেননি, তাঁদের স্তুতি নিতে পারছিলেন না রবীন্দ্রনাথ।

কিন্তু সেদিন রবীন্দ্রনাথের অনেক ভক্তও আহত হয়েছিলেন। কারণ ভিড়ের মধ্যে যেমন সকলের আবেগ খাঁটি ছিল না, তেমনই অনেকেই যথার্থ রবীন্দ্রঅনুরাগী ছিলেন। নীরদচন্দ্র চৌধুরীও প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘সম্বর্ধনা এইভাবে গ্রহণ করাই যদি তাঁহার অভিপ্রেত ছিল তবে তিনি শান্তিনিকেতনে একটা নাটকীয় অভিনয়ের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করতে দিলেন কেন? তিনি যে উত্তর দিলেন, তা ঝোঁকের মাথায় বলা নয়, বিশেষ ভাবিয়া বলা। …তিনি কি দেশবাসীকে একটা নিষ্ঠুর পরিহাস করিবেন স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন?’

আমরা অন্য কথা বলি? রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও অভিমানী মানুষ ছিলেন। তাঁর সমকাল, বাঙালি সাহিত্যবোদ্ধারা তাঁকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। নিজেকে দেশের মানুষের কাছে প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক মৃত্যুশোক সহ্য করে চলেছিলেন। এরপর যখন এই পুরস্কার এল, তিনি অবিচলিত থাকতে চাইলেন। নিজের ভাগ্যের উপরেই বিশ্বাস হারিয়েছেন তখন। আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার প্রিয় মানুষগুলোও তো অনেকেই নেই। তাই সেদিন অভিমানে মুখর হয়েছিলেন যে অভিমানী কবি, তাঁর কষ্টের তরঙ্গ লুকিয়েছিল প্রতিটি শব্দবন্ধে। গড়িয়ে যাওয়া সময়ও কি কবির বেদনা বুঝবে না?

সহায়ক গ্রন্থঃ
১. আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ, নীরদচন্দ্র চৌধুরী
২. জ্যোতির্ময় রবি ও কালো মেঘের দল, সুজিতকুমার সেনগুপ্ত

 

Developed by DXDasia