বৌদ্ধ কুশজাতকের গল্প অবলম্বনেই কি তবে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘রাজা’ নাটক!

১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটক প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল

সাইকি ছিল এক অপূর্ব সুন্দরী মর্ত্যনারী। এতটাই সুন্দর যে রোমানরা তাকে প্রণয়দেবী ভেনাস বলে ভুল করতো। ভেনাসের ঈর্ষায় তৈরি হল নতুন গল্প! ভেনাস তাঁর ছেলে কিউপিডকে বললেন, সাইকি নামের সুন্দরী মেয়েটির উপর এমন পুষ্পশর নিক্ষেপ করতে, যাতে মেয়েটি পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত ও দরিদ্র পুরুষের প্রেমে পড়ে। কিন্তু কিউপিড নিজেই সাইকিকে দেখে তার প্রেমে পড়ে গেলেন। অ্যাপোলোর সাহায্যে সাইকিকে পেয়েও গেলেন কিউপিড। কিন্তু এক গোপনীয়তার প্রাচীর রচনা করলেন তাঁদের দাম্পত্য জীবনকে ঘিরে। অ্যাপোলো ছিলেন দৈববাণীরও দেবতা। তাই, সাইকির বাবাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, মেয়েকে বধূবেশে সাজিয়ে রাতের অন্ধকারে রেখে আসতে হবে নির্জন পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায়। সেখানে সাইকি অপেক্ষা করবে এমন এক পুরুষের জন্য, যার ভয়ে মানুষ তো তুচ্ছ, দেবতারা পর্যন্ত সর্বদা ভীত, বিচলিত। কিউপিড সেই নির্জন স্থানে সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করে রেখেছিলেন। প্রতি রাতে সেই সুবর্ণ প্রাসাদে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো। ভয়ের আঁধারের সঙ্গে নেপথ্যে থাকা স্বামীর পরিচিত স্পর্শে সুখেই দিন কাটতো সাইকির । হঠাৎ একদিন সন্দেহের বশে এক হাতে ছুরি আর অন্য হাতে প্রদীপ নিয়ে কিউপিডকে দেখে ভুল ভাঙলো সাইকির। কিন্তু ততক্ষণে গোপনীয়তার আড়াল চলে গেছে। তাই, বিচ্ছেদ ঘনিয়ে এল। শুরু হল সাইকির তপস্যা। তারপর জুপিটারের আশীর্বাদে সাইকি মানবী থেকে দেবীতে পরিণত হল। বহু যন্ত্রণা আর দুঃখভোগের পর মিলন হল।  

এতক্ষণ বলছিলাম রোমান পুরাণের গল্প। এখন এই গল্পের সূত্রেই আমরা পৌঁছে যাই ১৯১০ সালে, যখন রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটক প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

নাটকের প্লটটিতে বারবার তুলি বুলিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৬ এবং ১৯২১ সালে ‘রাজা’ নাটকের দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে প্রকাশ পায় ‘অরূপরতন’ এবং ১৯৩১-এ ‘শাপমোচন’। প্লট কিন্তু একই। ‘রাজা’ নাটকের অন্তরালে বৌদ্ধ কুশজাতকের গল্পের অনুপ্রেরণার কথা বেশিরভাগ সমালোচকই মেনে নিয়েছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত The Sanskrit Buddhist Literature of Nepal'-এ রাজপুত্র কুশের দুটি গল্প ছিল। একটি 'Kusa Jatak' এবং অপরটি মহাবস্তু অবদানের 'The Story of Kusa'। রবিজীবনী রচয়িতা প্রশান্তকুমার পাল খুব জোরের সঙ্গেই জানিয়েছিলেন 'The Story of Kusa' অবলম্বনে ‘রাজা’ নাটক রচিত হল। এই উপাখ্যানটি রাজেন্দ্রলাল সম্পাদিত গ্রন্থে ১৪২ থেকে ১৪৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রবীন্দ্রনাথের সংগ্রহে যে বইটি ছিল, সেটির ১৪৪ পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরে ‘রাজা’ শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া, ১৯৩১ সালে রচিত ‘শাপমোচন’ প্রসঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘যে বৌদ্ধ আখ্যান অবলম্বন করে রাজা নাটক রচিত তারই আভাসে শাপমোচন কথিকাটি রচনা করা হল।’ 'The Story of Kusa'-তেও কুশরাজার রাণীর নাম সুদর্শনা। তাদের মিলনও অন্ধকারের রহস্যময়তায় আবৃত ছিল। রাজার কদাকার রূপ, সুদর্শনার গৃহত্যাগ, বিপর্যয়, ইন্দ্রের আশীর্বাদে রাজার রূপবান হওয়া এবং রাজা রাণীর মিলন— এই হল কুশজাতকের গল্প। ‘রাজা’ নাটকে অন্ধকার রহস্যময়তার মধ্যে রাজা রানির মিলন, রাজাকে দুর্ভেদ্য অন্ধকারের ওপারে আলোর পৃথিবীতে খুঁজতে গিয়ে সুদর্শনা ভুল করে। তারপর হৃদয়ের অগ্নিদহনে শুদ্ধ হয় সুদর্শনা। রাজা তাকে রূপে নয়, ভালোবাসায় ভুলিয়ে প্রশান্তি দেয়। 

এখন, আমাদের উপজীব্য,শুধু কুশজাতক নয়। ‘রাজা’ নাটকের অন্তরালে রোমান পুরাণের কিউপিড সাইকির উপাখ্যানটিরও মিল আছে। যার উল্লেখ  রবীন্দ্রনাথ করলেন না। ‘রাজা’ নাটকের শুরুতেই ছিল দৈববাণীর প্রসঙ্গ— ‘আমার কবে বিবাহ হয়েছিল মনেও নেই, তখন আমার জ্ঞান ছিল না। মার কাছে শুনেছি তাঁকে এক দৈবজ্ঞ বলেছিল, তাঁর মেয়ে যাকে স্বামীরূপে পাবে পৃথিবীতে তাঁর মতো পুরুষ আর নেই।’ এই দৈবজ্ঞের সঙ্গে রোমান পুরাণের দৈববাণীর দেবতা অ্যাপোলোর মিল আছে। সুদর্শনার নিভৃত ঘরে একদিনও আলো জ্বলতো না। ওই ঘর মাটির আবরণ ভেদ করে পৃথিবীর বুকের মাঝখানে তৈরি। রাজা ওই ঘর সুদর্শনার জন্যই বিশেষভাবে নির্মাণ করিয়েছিলেন, ঠিক কিউপিডের মতোন। মনে হয়, রাজা কিউপিডেরই রাবীন্দ্রিক সংস্করণ। রবীন্দ্রনাথ রোমান প্রেমের দেবতার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় প্রেমের দেবতা মদন এবং গ্রিক ভালোবাসার দেবতা এরসের রূপ। মদনের পুষ্পধনু ভ্রমরে গাঁথা। মদনের ফুলবাণের পাঁচটি ফুল হল—অরবিন্দ ,অশোক, চূত, নবমল্লিকা ও রক্তোৎপল। গ্রিক এরস রাত্রিদেবীর সন্তান। রাজাকে ঘিরে থাকা অন্ধকার চালচিত্র এই কথা ভাবায়। অন্ধকারে আবার রাজার সুগন্ধী উত্তরীয়টা এসে লাগে সুদর্শনার গায়ে । রাণী   রাজাকে কল্পনা করেন বসন্তকালের পটভূমিতে। লক্ষ লোকের মধ্যে যেদিন রাজাকে চিনে নেওয়ার মুহূর্ত আসে, তখন ধার্য হয় বসন্ত পূর্ণিমা অর্থাৎ মদন উৎসবের দিনটি। রাজা নিজেই বলেন, ‘যেখানে পঞ্চমে বাঁশি বাজবে, ফুলের কেশরের ফাগ উড়বে, জ্যোৎস্নায় ছায়ায় গলাগলি হবে — সেই আমাদের দক্ষিণের কুঞ্জবনে।’ এই প্রসঙ্গে বলি, কামদেবতার একটি মন্ত্র — কামগায়ত্রী। কৃষ্ণের বাঁশির পঞ্চম স্বরটিতে রয়েছে ‘কামগায়ত্রী’। রাজারও একটি ধ্বজা আছে মদনের ধ্বজার মতো। মহিষী সুদর্শনা বসন্ত সখার পূজার পুষ্পে মহারাজের অভ্যর্থনা করতে চায়। বসন্তসখা মদন! তাঁর আরেকটি নাম অনঙ্গ, অর্থাৎ তাঁকে দেখা যায় না। রোমান পুরাণে সাইকির মতোই সুদর্শনাও সুন্দরী। তাই সে রাজাকে বলে, ‘আমার এত রূপ! তোমার কাছে যখন শুনি বুক ভরে ওঠে।’ রূপের নেশায় চেতন হারিয়ে ঝড়ের মুখের ছিন্ন মেঘের মতো রাজার প্রাসাদ ছেড়ে চলে গিয়েছিল সুদর্শনা। সাইকির মধ্যেও এই রূপতৃষ্ণা ছিল। স্বামী কদাকার — এই ভাবনাতেই ঘৃণায় কুঁকড়ে গিয়েছিল সে। তাই প্রদীপের সঙ্গে রেখেছিল ছুরি। সাইকি পার্সিফোনে নামের পাতালদেবীর রূপের বাক্স থেকে রূপ চুরি করেছিল— রবীন্দ্রনাথ এই সমস্যাটিকে সুদর্শনার মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসাবে মিলিয়ে দিয়েছেন। তবে, সুদর্শনা এবং সাইকি দুজনেই কৃচ্ছ্রসাধনের পথে প্রেমাস্পদকে পেয়েছেন। তবে, কুশজাতক বা রোমান পুরাণে যেমন নায়কদের সুপুরুষ হতেই হয়, রবীন্দ্রনাথের রাজা সে দায় থেকে মুক্ত হন। তিনি ‘অনুপম’ হয়ে রাবীন্দ্রিক স্বকীয়তা বজায় রাখেন। 

মদন ,কিউপিড, এরসের আনাগোনা রবীন্দ্রসাহিত্যে বেশ অনেকবার হয়েছে। ব্রাহ্ম, অপৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ ইচ্ছেমতো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরাণকে মিলিয়ে দিয়েছেন নিজের সাহিত্যে। আমাদের বিশ্বাস, ‘রাজা’ নাটকেও  কিউপিড মিথটিকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছেন রবীন্দ্রনাথ। কিউপিড ,মদন, এরস প্রসঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্যে এসেছে।তাই কিউপিড সাইকির মিথ নাটকের প্লটে ব্যবহার আকস্মিক নয়। রোমান সাহিত্যিকদের রচনায় বার বার  কিউপিড প্রসঙ্গ উঠে আসছিল। অ্যাপুলিয়াস লুসিয়াস তাঁর ‘মেটামরফসিস’ বা ‘ গোল্ডেন অ্যাস’ গ্রন্থে কিউপিড আর সাইকির প্রেমকাহিনি নতুন করে নির্মাণ করেন এবং কিউপিডকে পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী সাহিত্যের সবচেয়ে আলোড়িত চরিত্র হিসেবে দাঁড় করান। রেনেসাঁ যুগে অনেক চিত্রকর এই প্রেমকাহিনিকে চিত্ররূপ দেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই সচেতন ছিলেন এই মিথটি সম্পর্কে। 

সাইকি কিউপিডের প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরেছিল প্রদীপের মৃদু আলোয় । তখন ভয়ের অবসান হয়ে এক মুগ্ধতা তৈরি হয় সাইকির মনে। ‘রাজা’ নাটকের প্লটের উপর ভিত্তি করে লেখা ‘শাপমোচন’-এর একটি অংশ উল্লেখ করা যাক—

‘বীণা থামল। মহিষী থমকে দাঁড়াল। 

রাজা বললে, ‘‘ভয় কোরো না প্রিয়ে, ভয় কোরো না।’’ গলার স্বর জলে ভরা মেঘের গুরু গুরু ধ্বনির মতো। 

“কিছু ভয় নেই আমার। জয় হল তোমারই।”

এই বলে মহিষী আঁচলের আড়াল থেকে প্রদীপ বের করলো। ধীরে ধীরে তুলে ধরলে  রাজার মুখের কাছে। 

 কন্ঠ দিয়ে কথা বেরোতে চায় না, পলক পড়ে না চোখে। বলে উঠল, “প্রভু আমার, প্রিয় আমার, একি সুন্দর রূপ তোমার।”

‘রাজা’ ,‘অরূপরতন’ এবং ‘ শাপমোচন’-এর প্রত্যক্ষ প্রেরণা বৌদ্ধ জাতক এবং মহাবস্তুঅবদানের গল্প —একথা রবীন্দ্রনাথ বলে গিয়েছেন। কিন্তু রোমান পুরাণের কিউপিড সাইকি উপাখ্যানের সঙ্গে এই রচনাগুলির প্লটের আশ্চর্য মিল এক প্রতীচ্য পুরাণকেও সামনে আনে। এই মিথটি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ভাবনার আলোকে নাটকটির মূল সমস্যাকেও এক শাশ্বত মাত্রা দান করেছিল।  

সহায়ক গ্রন্থঃ
রাজা/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রতীচ্য পুরাণ/ ফরহাদ খান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Developed by DXDasia