রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’— স্মৃতির সরণি বেয়ে
‘সবিনয় নিবেদন,
১৬ ই ফাল্গুন, শনিবার সন্ধ্যা ৭। । ০ ঘটিকার সময় আমাদিগের জোড়াসাঁকোস্থ ভবনে ভারতী উৎসব হইবে, এবং সেই উপলক্ষ্যে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ নামক অভিনয় গীতিনাট্য অভিনীত হইবে। আপনি সময়ে উপস্থিত হইয়া আমাদিগকে সুখী করিবেন।’
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর’
পাঠক! বুঝতেই পারছেন, এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে হলে অবশ্যই টাইম মেশিন লাগবে। কারণ, ১৮৮১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জোড়াসাঁকোতে নাট্যাভিনয় দেখতে তো অন্য কোনোভাবে পৌঁছনো যাবে না। অথচ, যা এক কাণ্ড হয়েছিল সেদিন জোড়াসাঁকোতে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তার সাক্ষী হয়ে আছে।
প্রথমবার বিলেত থেকে ফিরে রবীন্দ্রনাথ লিখে ফেলেছিলেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’! একটি নাট্যকথাকে গানের সূত্র দিয়ে গাঁথা হয়েছিল এই নাটকে। দস্যুর নির্মমতাকে ভেদ করে উচ্ছ্বসিত হল তার অন্তরগূঢ় করুণা। বাল্মীকির স্বাভাবিক মানবত্বের প্রকাশ, ভিতরকার আসল মানুষের বাইরে আসা — এই সূত্রটি প্রচলিত মিথের প্রকাশকে একটু বদলে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘দেশি ও বিদেশি সুরের চর্চার মধ্যে বাল্মীকি প্রতিভার জন্ম হইল।’ বিলেত যাওয়ার আগে জোড়াসাঁকোতে ম্যুরের আইরিশ মেলেডি নিয়ে উৎসাহের শেষ ছিল না রবীন্দ্রনাথের। বিদেশে গিয়ে অপেরা সম্পর্কে ধারণাও তৈরি হয়েছিল তাঁর। এই প্রভাব তো ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় ছিলই। তার সঙ্গে ছিল বাংলার কথকতার সুরের ঐতিহ্য। ‘সংগীতকে নাট্যকার্যে নিযুক্ত করাটা অসংগত বা নিষ্ফল হয় নাই। বাল্মীকি প্রতিভা গীতিনাট্যের ইহাই বৈশিষ্ট্য ।’
যে প্রবল উৎসাহে রবীন্দ্রনাথ এই নাটকটি লিখেছিলেন, ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের স্মৃতিকথায় সেসব আবেগ ধরা আছে। সেইসময় ঠাকুরবাড়িতে বিচিত্র সব সভা সমিতি তৈরি হত। সেগুলিরই একটি হলো ‘বিদ্বজ্জনসমাগম সভা। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল দেশের সমস্ত সাহিত্যিকদের একত্রিত করা। এই সভার উদ্যোগেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন নাটকটি। নাটকটি যতটা পাঠযোগ্য, তার চেয়েও বেশি শ্রুতিমধুর। আসলে, মঞ্চসফল করার জন্যই নাটকটি লেখা হয়েছিল। ঠাকুরবাড়িতে রীতিমতো আলোচনা করে বাল্মীকির পরিবর্তনের কাহিনি প্লট হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বিহারীলাল চক্রবর্তীর ‘সারদামঙ্গল’ এর প্রবল প্রভাবের কথা স্বীকারও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রথমবার ২৬/২/১৮৮১-তে অভিনয়ের সময় দর্শকের আসনে ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, রাজকৃষ্ণ রায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত, কৃষ্ণমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মণীষীরা। সকলেই মুগ্ধ এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।
সেবার নাট্য প্রযোজনার পুরো দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথের উপর ছিল না। ঠাকুরবাড়ির নাট্য প্রযোজনার পুরোনো রীতি অনুসারে মঞ্চ সাজানো হয়েছিলো। ‘মঞ্চ অভিনয় ও নাট্যকলা’ বইতে পুলিন দাস জানিয়েছেন, ছাদের উপর ডাম্বল গড়িয়ে মেঘের আওয়াজ, জল ঢেলে বর্ষণ, আয়নায় আলো ঢেলে বিদ্যুৎ ঝলক, তুলোর বক বসিয়ে ক্রৌঞ্চমিথুন, খড়ভরা মরা হরিণ দিয়ে বন্যবরাহ— এমনি সব প্রবল প্রচেষ্টায় নাটকটিকে ‘রিয়েলিস্টিক’ করে তোলার ‘মারাত্মক’ প্রয়াস করা হয়েছিল।
এরপর বেশ কয়েকবার ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র অভিনয় হয়েছে। নাটকটি সবসময়ই মঞ্চসফল। একবার লাটসাহেব এবং তাঁর মেম ল্যান্সডাউনের কথা মনে করে ডাকাতদের অনাবৃত দেহ ঢাকা হয়েছিল কাবুলি পোশাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজে পড়তেন লম্বা জোব্বা , গলায় রুদ্রাক্ষ, চেনে বাঁধা শঙ্খ বাজিয়ে নাটকীয় আবহ তৈরি করতেন তিনি। স্বরচিত নাটকে সেই প্রথম অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
দ্বিতীয়বার অভিনয় হয়েছিলো ৫/৩/১৮৮১-তে। তারপর ২০/২/১৮৮৬-তে। ইন্দিরা দেবী একটি স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, ১৮৯০ সালেও একটি মঞ্চাভিনয় হয়েছিল। সে যাই হোক না কেন, প্রতি অভিনয় ঘিরেই মজাদার সব অভিজ্ঞতার কথা নস্টালজিয়ার মতো আবছা হয়ে আছে ঠাকুরবাড়ির আনাচে কানাচে। স্মৃতিকথা হয়ে সময়ের সরণি বেয়ে সেসব ঘটনা এখন ইতিহাসের মতোই মূল্যবান ।
অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণায় ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র মঞ্চাভিনয়ের অনেক গল্প জানা যায়। একবার নাকি এই অভিনয় করে কয়েক হাজার টাকা তোলা হয়েছিল। দ্বিতীয় অভিনয়ের সময় টিকিটের দাম ছিল আট টাকা আর চার টাকা। প্রায় ২০০ লোক এসেছিল। প্রথম অভিনয়ের দিনেও আমন্ত্রণপত্র ছাড়া দর্শকের প্রবেশাধিকার ছিল না। সেই আমলের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ থাকতেন বাল্মীকির ভূমিকায়। অক্ষয় চৌধুরী ডাকাত সর্দার, অবনীন্দ্রনাথ, দীনেন্দ্রনাথ ডাকাত দলের অংশ, ইন্দিরা দেবী লক্ষ্মী, প্রতিভাদেবী সরস্বতী এবং অভিজ্ঞাদেবী বালিকা। এছাড়াও অন্যান্যরা তো ছিলেনই। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ সকলের মিলিত উদ্যোগে জমজমাট নাটক।
অক্ষয় চৌধুরী মজার মানুষ। প্রথম দস্যু সেজে খুব ফূর্তির সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ইংরেজ দর্শক ভাষা বোঝেন না, শুধু তাঁর ভঙ্গি দেখেই লেডি এলিয়ট নামের এক বিদেশিনী বলেছিলেন— ‘He is my man.’ এই নিয়ে অক্ষয়বাবুর গর্বের শেষ ছিল না। একবার মঞ্চে ঢুকতে গিয়ে কৃত্রিম লতা-পাতায় পা আটকেছে, কোনোমতে মঞ্চে ঢুকেই পরিস্থিতি সামলাতে গান ধরলেন—
‘আঃ! বেঁচেছি এখন।
শর্মা ওদিকে আর নন।
গোলমালে ফাঁকতালে সটকেছি কেমন
সা-ফ সটকেছি কেমন।’
অমনি হাততালি। এমনিতেই তাঁর ছিল পেল্লায় ভুঁড়ি, তার উপর আরো দুটো বালিশ দিয়ে মঞ্চে আসতেন অক্ষয়বাবু। অবনীন্দ্রনাথদের কাজ ছিলো পার্ট বলতে বলতে সেই ভুঁড়িতে খোঁচা দেওয়া। নাটকে বাল্মীকি যখন চলে গেছেন, তখন প্রথম দস্যু ওরফে অক্ষয়বাবু নিজেকে ‘রাজা’ বলেই কাউকে ‘উজির’ কাউকে ‘কোতোয়াল’ বলতে বলতেই স্টেজ থেকে দর্শকাসনে বসে থাকা সাহেবদের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলতেন— ‘ওই ছোঁড়াগুলো বরকন্দাজ।’ সাহেবরা বাংলা বোঝেন না। এদিকে ওই কথার ভঙ্গি দেখে তাদের সে কী হাততালি।
সত্যিকারের টাট্টু ঘোড়া স্টেজে তুলে তাকে ঘাস খাওয়ানো হতো। খালি ভাঁড় নিয়ে বলার ধুম লেগে যেতো— ‘তবে ঢাল সুরা, ঢাল সুরা, ঢাল ঢাল।’ এক কাপ্তেনের কাছে ডাকাতদল শিখেছিল কাবুল দেশের হাজারি নাচ।
‘কালী কালী বলো রে আজ/ বলো হো হো হো, বলো হো।’ — এই গানের সঙ্গে ওই কাবুলির নাচ খুব জমেছিল। আসলে অবন ঠাকুররাও ঠিক করে নিয়েছিলেন, ডাকাত সেজে দেখিয়ে দেবেন ডাকাত কাকে বলে। নাটক চলাকালীন একবার রবীন্দ্রনাথ ওরফে বাল্মীকি দিব্যি সোনার চশমা পরে মঞ্চে উঠে গিয়েছেন। ভুল ধরা পড়তেই আবার চশমা খুলে অভিনয় শুরু! ইন্দিরাদেবী নাকি লক্ষ্মী সেজে বুকে হাত দিয়ে এমনি করে ‘আমারে শুভক্ষণে হেরো গো চোখে’ গানটি গাইতেন, তখন অভিজ্ঞাদেবীর মনে হতো ইন্দিরাদেবীর পেট কামড়াচ্ছে। গগনেন্দ্রনাথ আর দীনেন্দ্রনাথের অভিনয় আর গান করতে করতে অভিভূত হয়ে একসঙ্গে কান্নাকাটি, পরে মজার স্মৃতি হয়ে গেছে।
তখন তো ইলেকট্রিক বাতি ছিল না,গ্যাসবাতির ব্যবস্থা করা হতো। লাল সবুজ মখমলের পর্দা দিয়ে হতো স্টেজ। গাছপালা বেঁধে রাখা হতো দড়ি দিয়ে। শোলার পদ্মবন, পদ্মপাতা, পাতলা গজের পর্দা বানিয়ে চার পাঁচটা স্তরে ঝুলিয়ে রাখা থাকত। সিন বুঝে সেগুলি নামিয়ে দেওয়া হত। প্রথমে ঝাপসা কুয়াশার মতো আবহ, তারপর আলো ফুটছে, একটু একটু করে পদ্মবনে সরস্বতী ক্রমশ প্রকাশ পেতেন। এমনি কল্পনা! সাদা শোলার পদ্মবনে শুভ্র সাজে যখন বীণা হাতে প্রতিভাদেবী বসে থাকতেন, অনেকেই ভাবতেন, মাটির প্রতিমা বুঝি! অস্ট্রিচের ডিমের খোলা আর রাংতা দিয়ে একটি ছোটো সেতার বানিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। সেইটিই ছিল নাটকে সরস্বতীর বীণা। সেই বীণা বাল্মীকিরূপী রবীন্দ্রনাথের হাতে দিয়ে সরস্বতী সেজে প্রতিভা বলতেন—
‘এই নে আমার বীণা , দিনু তোরে উপহার,
যে গান গাহিতে সাধ, ধ্বনিবে ইহার তার।’
অবনীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা ‘ঘরোয়া’ বইতে এই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘সেকথা সত্যি সত্যিই ফললো ওঁর জীবনে।’
নাটকটি রিয়েলিস্টিক হবে, মঞ্চে সফল হবে— এই সাধ নিয়েই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। প্রবল জনপ্রিয়তা সঙ্গে সঙ্গে এই অভিনয়ের সুখস্মৃতি নাটকটিকে অন্য মাত্রা দেয়। অভিনয় ও আনন্দের এই মেলবন্ধনের স্মৃতি বাঙালির নস্টালজিক মনে কোনো না কোনোভাবে থাকে। অতীতের কোনো মুহূর্তে এক নবীন লেখকের কলম শুধু যে এক অসাধারণ সৃষ্টি করছিল তা নয়, বুঝিয়ে দিয়েছিল মঞ্চসজ্জা, মঞ্চসাফল্য কাকে বলে! শুধু দস্তুরভাঙা গীতবিপ্লবের প্রলয়ানন্দ নয়, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ সেই সময়ের পেশাদার থিয়েটারের একটি বিশিষ্ট প্রকাশও বটে!
সহায়ক গ্রন্থ :
১. বাল্মীকি প্রতিভা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. মঞ্চ অভিনয় নাট্যকলা ও রবীন্দ্রনাথ, পুলিন দাস
৩. রবীন্দ্র-রচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ষোড়শ খণ্ড
৪. ঘরোয়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর