
সুন্দরবনের পাথরপ্রতিমা ব্লকের জৈব-চাষি ও গো-প্রতিপালক পূর্ণিমা মণ্ডল
বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি গ্রামীণ অর্থনীতি। সেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে পাচ্ছেন প্রান্তিক মানুষেরা। হস্তশিল্প, কৃষ্টি, কৃষিকাজ, খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, পশু প্রতিপালন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে স্বনির্ভর গোষ্ঠী। গ্রামের মহিলারাও এইসব গোষ্ঠীর সদস্য হয়ে পাচ্ছেন আত্মনির্ভরতার স্বাদ। এর মাধ্যমে গ্রাম্য সংস্কৃতি যেমন নতুন করে পরিচিতি পাচ্ছে, তেমনই নিজস্ব সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়েই উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন বাংলার প্রান্তিক মানুষ। আবার দৈনন্দিন জীবনের এতদিনের অপ্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার স্বাদ পাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা। যেমন- সাম্প্রতিক সময়ে, মানুষ ও বাঘের সুপ্রাচীন দ্বন্দ্ব রুখতে এবার সুন্দরবনের পাঁচ গ্রামে জ্বলে উঠলো সৌরবিদ্যুৎ চালিত স্ট্রিট লাইট।

পূর্ণিমা জানিয়েছেন, তাঁর জমিতে চাষ করেন শুধুমাত্র জৈব সার ব্যবহার করেন। এমনকি, গাভীদের খাওয়ানোর জন্য যা চাষ করা হয়, তাতেও ব্যবহৃত হয় শুধুমাত্র জৈব সার। সেই সারও তৈরি করেন নিজেই। ময়দা, সরিষা, গুড়, গোবর এবং পাঁচ ধরনের পাতা দিয়ে এইসব সার তৈরি করা হয়। শুধু তিনিই নন, জানা গেছে, সোসাইটির সব চাষিরাই জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেন। চাষিরা জানান, সোসাইটির তরফে এ বিষয়ে তাঁদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু সংসার সামলানো ও জীবিকা নির্বাহই নয়, পূর্ণিমাকে লড়তে হয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গেও। ২০০৯ সালে আয়লাতে তাঁর জমিতে লোনা জল ঢুকে গিয়েছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জমির উর্বরতা। এরপর আমফান আর বুলবুলের সময়ও তাঁদের বাড়ি ও চাষজমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষদের জীবন যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু নয়। জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ নিয়ে তাঁদের বাস। জীবিকা বলতে কাঁকড়া শিকার, মধু সংগ্রহ। সেই জীবিকাতে আছে কুমির, সাপ, বাঘের হাতে প্রাণ যাওয়ার ভয়। সঙ্গে আছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে গ্রামের মহিলারা শুরু করেছেন স্বনির্ভর হওয়ার লড়াই। তাঁদের হাত ধরেছে সুন্দরবন কো-অপারেটিভ মিল্ক অ্যান্ড লাইভস্টক প্রোডিউসার্স ইউনিয়ন লিমিটেড (Sundarban Co-operative Milk and Livestock Producers Union Limited)। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাণীসম্পদ বিকাশ বিভাগের অধীনস্থ এই কো-অপারেটিভ সোসাইটি। রাজ্য সরকার, পশ্চিমবঙ্গ মিল্ক ফেডারেশন লিমিটেড (West Bengal Milk Federation Ltd)-এর উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (National Dairy Development Board) সহায়তায় সুন্দরবনের প্রান্তিক মহিলারা তৈরি করেছেন এই কো-অপারেটিভ সোসাইটি, যার মাধ্যমে তাঁরা পাচ্ছেন স্বনির্ভরতার স্বাদ। ২০১৫ সালে, মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে এই সোসাইটির ব্র্যান্ড সুন্দরিনী (Sundarini) তৈরি হয়। বর্তমানে প্রায় ৫০০০ মহিলা এই সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা পাচ্ছেন জীবনের আঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস।
তেমনই একজন হলেন পূর্ণিমা মণ্ডল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার পাথরপ্রতিমা ব্লকের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম রামনগর আবাদ। কলকাতা থেকে সড়কপথে দূরত্ব প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। মৃদঙ্গভঙ্গ এবং গোবোধিয়া নামক দুটি লোনা জলের নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এই গ্রাম। এখানকারই বাসিন্দা পূর্ণিমা মণ্ডল। তিনি রামনগর আবাদ উইমেন প্রাইমারি কো-অপারেটিভ সোসাইটির সদস্য। এটি সুন্দরবন কো-অপারেটিভ মিল্ক অ্যান্ড লাইভস্টক প্রোডিউসার্স ইউনিয়ন লিমিটেডের অন্তর্ভুক্ত। সুন্দরবনের স্বনির্ভর গোষ্ঠী-র মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে পূর্ণিমা জয় করে চলেছেন হাজার বাধা-বিপত্তিকে। জৈব পদ্ধতিতে দুগ্ধচাষ ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করেন এবং সেগুলি কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে বিক্রি করেন। তাঁর সম্পদ এবং সম্বল বলতে দুটি সাধারণ গাভী, অন্যান্য গুটিকয়েক প্রাণীসম্পদ, একটি ছোটো পুকুর, একটি অ্যাজোলা পিট, একটি গো-খাদ্য জমি এবং প্রায় এক একর চাষের জমি। তিনি পশু প্রতিপালন এবং চাষাবাদ সামলান একার হাতে। তার সঙ্গেই চলে সন্তান সামলানোর কাজ। তাঁর স্বামী কর্মসূত্রে থাকেন কলকাতায়। তাই তাঁকেই কাজ ও সংসার দুই-ই সামলাতে হয়। তাতেও তাঁর উদ্যমে ভাঁটা পড়েনি।

পূর্ণিমা জানিয়েছেন, তাঁর জমিতে চাষ করেন শুধুমাত্র জৈব সার ব্যবহার করেন। এমনকি, গাভীদের খাওয়ানোর জন্য যা চাষ করা হয়, তাতেও ব্যবহৃত হয় শুধুমাত্র জৈব সার। সেই সারও তৈরি করেন নিজেই। ময়দা, সরিষা, গুড়, গোবর এবং পাঁচ ধরনের পাতা দিয়ে এইসব সার তৈরি করা হয়। শুধু তিনিই নন, জানা গেছে, সোসাইটির সব চাষিরাই জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেন। চাষিরা জানান, সোসাইটির তরফে এ বিষয়ে তাঁদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু সংসার সামলানো ও জীবিকা নির্বাহই নয়, পূর্ণিমাকে লড়তে হয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গেও। ২০০৯ সালে আয়লাতে তাঁর জমিতে লোনা জল ঢুকে গিয়েছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জমির উর্বরতা। এরপর আমফান আর বুলবুলের সময়ও তাঁদের বাড়ি ও চাষজমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু পূর্ণিমা বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নিজের দক্ষতা আর জেদকে সম্বল করে। ২০১৭ সাল থেকে তিনি এই কো-অপারেটিভ সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে চাল, ডাল, সবজি, দুগ্ধ বিক্রি করে দেখছেন স্বচ্ছলতার মুখ। এই সোসাইটিতে থাকা, সম্পূর্ণরূপে কম্পিউটার-চালিত ব্যবস্থার মাধ্যমে দুগ্ধ বিক্রয় করে তিনি এবং তাঁর মতো আরও অনেকে খুবই খুশি। জানা গেলো, দুধের গুণমান অনুযায়ী প্রাপ্য টাকা নিয়মিত চলে যায় তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। সেই টাকা পূর্ণিমারা খরচ করতে পারেন সংসারের বিভিন্ন কাজে। এর মাধ্যমে সরবরাহকৃত দুধের পরিমাণ এবং চাষিদের প্রাপ্য টাকার পরিমাণ সহজেই জানা যায়। তাঁর কথায় বোঝা গেলো, এর ফলে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত উপার্জনের নিশ্চয়তা পেয়েছেন পূর্ণিমারা।
পূর্ণিমা মণ্ডল গ্রামের বাকি মহিলাদের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁকে দেখে এই কাজে এগিয়ে আসছেন আরও বেশি মহিলা। বাংলা থেকে কাজের খোঁজে ভিটে ছেড়ে বাইরে চলে যাওয়ার পরম্পরা বহু বছরের। সুন্দরবনও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানকার অনেক পুরুষ কাজের সূত্রে পরিবার ছেড়ে বাইরে দিন কাটান। কিন্তু পূর্ণিমা জানান, তিনি আশাবাদী আর আত্মবিশ্বাসী। পূর্ণিমা এবং তাঁর মতো অনেকের বিশ্বাস, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে পাওয়া আর্থিক স্বচ্ছলতা একদিন বাইরে কাজ খুঁজতে যাওয়ার বাধ্যতা থেকে মুক্তি দেবে তাঁদের প্রিয়জনকে। তাঁরা একসঙ্গে স্বচ্ছলভাবে জীবন কাটাতে পারবেন নিজের ভিটেতেই।
