নিজেদের উদ্যোগে জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষ, পথ দেখাচ্ছেন উত্তরবঙ্গের এই মহিলা বাহিনী

আজ আন্তর্জাতিক গ্রামীণ মহিলা দিবস

একদল মহিলা পুরোপুরি জৈব পদ্ধতিতে (Organic farming) ধান চাষ করছেন। পুরুষদের সেই চাষের কাজে প্রবেশের কোনো অধিকার নেই। ধানের বীজ সংগ্রহের পর তা শোধন করা, জমিতে রোপণ, অনু খাদ্য স্প্রে সবই করছেন মহিলারা নিজেই। শিলিগুড়ি মহকুমার শিবমন্দির লাগোয়া আঠারখাই গ্রাম পঞ্চায়েতের রঙ্গিয়া-বাতলাবাড়ি এলাকায় একদল মহিলা, সাথি এবং বিজয়া স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠনের মাধ্যমে অন্যরকম চাষবাসের এক পরিবেশ তৈরি করছেন। রাজ্যের কৃষিদপ্তরও মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ওই জৈব পদ্ধতির চাষবাসকে উৎসাহিত করে চলেছে দীর্ঘদিন।

১৮ বিঘা জমিতে ছয়রকম ধান চাষ শুরু করেছেন

একটি গোষ্ঠী প্রথমে কালো মুরগি চাষ শুরু করে। অনেকে সেই মুরগিকে কড়ক মুরগি বলেন। সেই মুরগির মাংসও কালো। কলকাতার বাজারে ৭০০/৮০০ প্রতি কেজি দরে বিক্রি হয়। সেই মুরগির চাষে লাভের মুখ দেখেই তাঁরা শুরু করেন ধান চাষ। সাথি গোষ্ঠীর মুক্তি বর্মন জানালেন, ছয় বছর ধরে তাঁরা চাষবাস শুরু করেছেন। এই জমিতে পুরুষদের প্রবেশ নেই। ১৮ বিঘা জমিতে বহুরুপী, কালো ধান, ছোটো নুনিয়া বা খিচুড়িধান, বাহুবলী-সহ মোট ছয়রকম ধান চাষ শুরু করেছেন। কৃষিদপ্তর তাদেরকে বীজ দিয়ে সহায়তা করে। বালাসন ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প থেকেও তাঁরা সহযোগিতা পেয়েছেন। জমিতে ট্রাক্টর চালানো, নিড়ানি দেওয়া সবই তাঁরা করেন। সকাল দশটা থেকে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত চলে গোষ্ঠীর সব মহিলার পরিশ্রম। মুক্তি বর্মন ছাড়া এই গোষ্ঠীর অন্য মহিলা সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সাবিত্রী, রঞ্জিতা, তুলসী, রেনুকা, দীপিকা, যশোমতি-সহ আরও অনেকে। সাথি গোষ্ঠীর সদস্য এখন ১১ জন। তাঁদের স্বামীরা কেউ রিকশা চালান, কেউ টোটো; কেউবা রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। অন্যের জমিতে চাষবাসের জন্য তাঁদের বিঘা পিছু তিন মন ধান জমির মালিককে প্রদান করতে হয়। তবে মূলত এই ধানের চাল থেকেই তাঁদের খাওয়া-দাওয়া চলে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে কৃষিদপ্তরের সহায়তায় এই কাজে তাঁরা বেশ খুশি বলে জানান মুক্তি বর্মন। একটু একটু করে তাঁরা লাভের মুখও দেখছেন।

রাজ্যের কৃষিদপ্তর তাঁদের বীজ দিয়ে সহায়তা করে

অপরদিকে বিজয়া গোষ্ঠীর টিম লিডার বিজয়া সিংহ জানান, প্রথমে তাঁরা মাশরুম চাষ দিয়ে শুরু করেন। তার সঙ্গে কালো মুরগি এবং হাঁস প্রতিপালন। এরপর লাভ হতে থাকলে ১৫ বিঘা জমিতে শুরু হয় ধান চাষ। কেরালা সুন্দরী ধান চাষ করেন তাঁরা। সব জৈব পদ্ধতির চাষবাস। রেখা বর্মনসিংহ, স্বপ্না সিংহ-সহ আরও অনেকে আছেন এই গোষ্ঠীতে। আগামীতে মাশরুমের সঙ্গে তাঁরা বেশি করে জৈব সার তৈরি করতে চান বলে বিজয়া জানান। তাঁদের গ্রুপে দশ জন মহিলা সদস্য। এখান থেকে যা লাভ হয় তা দিয়ে তাঁরা আরও ব্যবসা বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছেন।   

জমিতে ট্রাক্টর চালানো, নিড়ানি দেওয়া সব নিজেরাই করেন

শিলিগুড়িতে কৃষি দপ্তরের অফিসার সোমনাথ শীল জানিয়েছেন, মহিলারা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে আঠারখাইয়ে যে জৈব কৃষির চাষবাস করছেন তার জন্য সম্পূর্ণ উৎসাহ দিচ্ছেন। পুরুষ চাষীদের ক্ষেত্রে অনেকসময় দেখা যায়, তাঁরা কৃষি আধিকারিকদের বিভিন্ন বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশের পরও নিজস্ব বুদ্ধি প্রয়োগ করতে চান। তাতে অনেক সময় ভুল হয়। সে ভুলের জেরে চাষবাসের সমস্যা হয়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। মহিলারা কৃষি বিভাগের বিজ্ঞানসম্মত সমস্ত নির্দেশ ভালোভাবে মেনে চলেন। 

যা লাভ হয় তা দিয়ে অন্যান্য ব্যবসার দিকেও নজর দিয়েছেন মহিলা বাহিনী

বাংলায় পথ দেখাচ্ছে এরকম হাজার হাজার মহিলা। মহিলাদের এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর চাষবাস রাজ্যের  কৃষিদপ্তর থেকে শুরু করে অন্যত্রও বেশ সাড়া ফেলেছে। বঙ্গদর্শন তাঁদের স্যালুট জানায়।

Developed by DXDasia