
প্লাস্টিক বর্জন করে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে চৌরঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয়
ঠিক যেন প্রাচীন ভারতের এক তপোবন আশ্রম। সেখানে পড়ুয়ারা লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রমের অন্যান্য কাজেও অংশ নিত। কেউ গো-সম্পদের দেখাশোনা করত তো কেউ করত চাষবাস। আবার কেউ কেউ গভীর বনে গিয়ে ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে আনত। পুরোটাই ছিল বিদ্যাচর্চার অঙ্গ। গুরুর তত্ত্বাবধানে পুঁথিগত লেখাপড়ার পাশাপাশি মিলত ব্যবহারিক জীবনের পাঠও। স্বাধীনতার আগে মহাত্মা গান্ধি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার নকশা তৈরি করেছিলেন, যেখানে পড়ুয়ারা বইপত্রের সঙ্গে কায়িক শ্রমেরও স্বাদ পাবে। আর রবীন্দ্রনাথ তো শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির মধ্যে একাত্ম হওয়ার শিক্ষাই দিয়ে এসেছেন। একুশ শতকে এসে ইঁদুরদৌড়ের চাপে হয়তো হারিয়ে যেতে বসেছে সেই সব আদর্শ। তবে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর ব্লকে চৌরঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেকলমে পরিবেশের সঙ্গে পড়ুয়াদের যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো।
অন্য সব সরকারি স্কুলের মতোই এখানে প্রতিদিন মিড ডে মিল রান্না হয়। কিন্তু, এখানে খাওয়াদাওয়ার পর খাবারের অবশিষ্টাংশ কিংবা অন্যান্য বর্জ্য ফেলে না দিয়ে লাগানো হয় অন্য কাছে। তার জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। গত দেড় মাস ধরে স্কুল চত্বরে রাখা আছে তিনটে আলাদা রঙের ওয়েস্ট বিন। সৌজন্যে প্রধান শিক্ষক তাপস মণ্ডল। লাল ওয়েস্ট বিনে ফেলা হচ্ছে কাগজ, পেনসিলের টুকরের মতো শুকনো বর্জ্য। মিড ডে মিলের খাবারের উচ্ছিষ্ট, সবজির খোসা, ভাতের ফ্যান এবং অন্যান্য এঁটো রাখা হচ্ছে হলুদ বিনে। আর সবুজ ওয়েস্ট বিনে থাকছে প্লাস্টিক বর্জ্য। হলুদ বিনের জিনিসগুলো একখানা পিটের মধ্যে রেখে দেওয়া হয় মাসখানেক। আর মিড ডে মিলের যে ভাতের ফ্যান, সেটার বিনিময়ে কাছেরই গোয়াল থেকে পাওয়া যায় গোবর। তার সঙ্গে অন্যন্য পচে যাওয়া বর্জ্য মিশিয়ে তার মধ্যে কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুরো জিনিসটা উৎকৃষ্ট জৈব সারে পরিণত হয় কয়েকমাস পর। তারপর সেই সারে লাগানো হয় কালমেঘ, তুলসী, বাসক, ঘৃতকুমারী, পাথরকুচির মতো নানা ধরনের ভেষজ গাছের চারা। একটু বেড়ে উঠলে সেইসব চারা স্কুলের বাগানে বসিয়ে দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, স্কুল ক্যাম্পাসেই নলকূপের বেরিয়ে আসা জল আর অন্যান্য বর্জ্য জলকে বাঁধ দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে একটা জলাধার। ওই জলের মধ্যে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পড়ুয়ারা শুরু করেছে ৭ রকমের দুর্লভ জৈব ধানের চাষ। তালাদি, হ্যাংরা, গোসবা, কেলরা সুন্দরী, চাঁপাকুশি, মুগাই, ক্যারি ওয়ান – এইসব ধানের বীজ রোপন করা হয়েছে সেখানে। তবে এই ধান বা ভেষজ উদ্ভিদ কোনোটাই কিন্তু বিক্রির জন্য নয়। বরং স্থানীয় মানুষদের উৎসাহিত করতে এগুলো কাজে লাগবে। আর লাল এবং সবুজ ওয়েস্ট বিনের জিনিসগুলো? ফেলা যায় না সেটাও। ওগুলো দিয়ে তৈরি হয় গ্রিটিংস কার্ড।

ইতিমধ্যেই গোটা এলাকাতে প্লাস্টিক বিরোধী প্রচার চালিয়ে দৃষ্টান্ত গড়েছে এই স্কুল। ২০১৭ সালে গঙ্গাসাগর ভ্রমণে গিয়ে স্কুলের পড়ুয়া আর শিক্ষকরা খেয়াল করেছিলেন, সমুদ্রের তীরে জমা হচ্ছে অসংখ্য প্লাস্টিক। গোটা এলাকার পরিবেশ তাতে বিষিয়ে উঠছে। তারপর থেকেই প্লাস্টিক বিরোধী প্রচার শুরু হয় এই স্কুলের পক্ষ থেকে। ব্যানার, পোস্টার নিয়ে এলাকায় মিছিল বের করে পড়ুয়ারা। বাজার অঞ্চলে গিয়ে প্লাস্টিকের কুফল বোঝানো হয়। স্কুলের মধ্যেও বন্ধ হয়েছিল প্লাস্টিকের ব্যবহার। তারও আগে ২০১৬ সালে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে পড়ুয়াদের দেওয়া হত গাছের চারা। এর বাইরেও পড়ুয়াদের চারা বিলি করা হত। সব মিলিয়ে, পড়ুয়া এবং শিক্ষকদের যৌথ প্রয়াসে পরিবেশচর্চার ঐতিহ্য চৌরঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে উঠেছে অনেকদিন ধরেই।
