বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুখোমুখি হলেন বাবা আর ছেলে

সরযূ নদীর তীরে মুখোমুখি দিল্লি আর বাংলার সুলতান

আমির খসরু। ভারতীয় সংগীতে একাই বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন এই মানুষটি। ইরানি, আরবি আর প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের এক আশ্চর্য সংমিশ্রনে তিনিই সৃষ্টি করেছিলেন উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত। আবিষ্কার করেছিলেন সেতার আর তবলা। উপমহাদেশের রসজ্ঞ মানুষরা গজলের স্বাদ পেয়েছেন তাঁর হাত ধরেই। দিল্লির ১১ জন শাসকের তিনি ছিলেন সমসাময়িক আর ৭ জন সুলতানের দরবারে স্থান করে নিয়েছিলেন কবি এবং সংগীতজ্ঞ হিসেবে। হ্যাঁ, কবিতার জগতেও আমির খসরু অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে এখানেই শেষ নয়। আমির খসরু একজন ইতিহাসবেত্তাও বটে। কাব্যের আকারেই তিনি সমকালের রাজনৈতিক ঘটনাগুলো লিখে গেছেন, যেগুলোর থেকে এখনকার পণ্ডিতরা খুঁজে নিচ্ছেন ইতিহাসের তথ্য। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ার চালাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন এই গুণী শিল্পী। তাঁর আসল নাম ছিল আবুল হাসান ইয়ামিনউদ্দিন খুসরভ। ‘আমির খসরু’ ছিল তাঁর উপাধি। সুলতান জালালউদ্দিন খিলজি তাঁকে এই উপাধি দিয়েছিলেন।

আশ্চর্য এই মানুষটি বেশ কয়েকদিন বাংলায় কাটিয়ে গেছেন। তখন বাংলা ছিল দিল্লির অধীনে। বিদ্রোহী মুঘিসউদ্দিন তুঘরলকে পরাজিত করার পর দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন ১২৮১ সালে বাংলার প্রাদেশিক শাসকের পদে বসিয়ে রেখে গেছিলেন নিজের ছোটো ছেলে বুঘরা খাঁকে। দিল্লির রাজনৈতিক জটিলতা বুঘরা খাঁ পছন্দ করতেন না খুব একটা। বাংলায় তিনি বেশ আরামে আয়েসে দিন কাটাতে লাগলেন। দিল্লি ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না তাঁর। এমনকি তাঁর বাবা গিয়াসউদ্দিন বলবন যখন দিল্লির পরবর্তী সুলতান হিসেবে তাঁকেই মনোনীত করেছিলেন, সেটাও ছিল বুঘরা খাঁর না-পছন্দ। অগত্যা বলবন সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর মৃত্যু হলে দিল্লির সিংহাসনে বসবেন তাঁর বড়ো ছেলে মুহম্মদের ছেলে কাইখসরু। বুঘরা রয়ে গেলেন বাংলার প্রাদেশিক শাসক হয়েই। তবে মুঘিসউদ্দিন তুঘরলের মতো তাঁর মনেও ছিল দিল্লির সুলতানি থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার স্বপ্ন। ১২৮৭ সালে গিয়াসউদ্দিন বলবন মারা গেলে তিনি মাহমুদ শাহ উপাধি নিয়ে বাংলায় স্বাধীন রাজত্ব শুরু করলেন। বাংলায় আসার আগেই তাঁর সঙ্গে আমির খসরুর এক দারুণ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই আমির খসরু বাংলায় এলেন ১২৮৯ সালে, বুঘরা খাঁ-রই অনুরোধে। বাংলার রাজধানী লখনৌতিতে কাটিয়ে গেলেন বুঘরা খাঁর অতিথি হয়ে।    এদিকে দিল্লির সুলতানি দরবারে তখন চলছিল অন্য নাটক। গিয়াসউদ্দিন বলবন তো পরবর্তী সুলতানের পদে বেছে রেখে গিয়েছিলেন কাইখসরুকে। বলবন মারা গেলে দিল্লির কোতোয়াল ফকুউদ্দিন আর একদল অভিজাত মিলে বুঘরা খাঁর বড়ো ছেলে কাইকোবাদকে বসিয়ে দেন দিল্লির সিংহাসনে। কাইকোবাদের তখন মাত্র ১৭ বছর বয়স। কোতোয়ালের জামাই নিজামউদ্দিন বা নিজামউলমুলক সেই বাচ্চা সুলতানকে কবজা করে দিল্লির সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন। উজির বা প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনিই শাসন করতে থাকেন গোটা সাম্রাজ্য। আর সুলতান মেতে থাকেন তাঁর উদ্দাম বিলাস আর আড়ম্বর নিয়ে। এই সুযোগে ক্ষমতালোভী তুর্কি মালিকদের মধ্যে শুরু হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সুদূর বাংলায় সেই খবর এসে পৌঁছয় বুঘরা খাঁর কাছে। ১২৮৮ সালে অপদার্থ ছেলেকে সবক শেখাতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বুঘরা খাঁ রওনা হল দিল্লি। এদিকে উজির নিজামউদ্দিনও কাইকোবাদকে বোঝান, তাঁর দিল্লি দখল বাবা আসছেন। উজিরের কথায় দিল্লির সুলতানও এক বিরাট বাহিনী নিয়ে বেড়িয়ে পরেন বাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে। 

বাবা আর ছেলের দেখা হয় সরযূ নদীর তীরে। নদীর এক দিকে বাংলার স্বাধীন সুলতানের শিবির তো আরেক দিকে দিল্লির পুতুল সুলতানের ছাউনি। তবে শেষ পর্যন্ত বাবা আর ছেলের যুদ্ধ হয়নি। বাবা ঢুকলেন ছেলের শিবিরে। তখন ছেলে সুলতান কাইকোবাদ বসে আছেন তখতে। বাবাকে দেখেই তখত থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েন ছেলে। জড়িয়ে ধরেন বাবাকে। প্রচুর লোকজনের সামনেই ফেটে পড়েন উচ্ছ্বাসে। তারপর তিন দিন ধরে চলে উৎসব। বাবা ছেলেকে তাগিদ দেন নামাজ পড়তে ও রোজা রাখতে, উপদেশ দেন রাজ্য শাসনের নিয়মরীতি নিয়ে। মদের নেশায় ডুবে না থাকা আর রাজকার্যে অবহেলা না করার জন্য সাবধান করেন। তিরস্কার করেন কাইখসরু আর গিয়াসউদ্দিন বলবনের আমির ও মালিকদের হত্যা করার জন্য। তার সঙ্গে নিজামউদ্দিনকেও উজিরের পদ থেকে সরানোর পরামর্শ দেন। কাইকোবাদ বাংলায় বুঘরা খাঁর স্বাধীন রাজ্যকে স্বীকৃতি দেন আর দিল্লি ফিরে গিয়ে বাবার কথা মতো নিজামউদ্দিনের থেকে কেড়ে নেন উজিদের পদ। বাবা বুঘরা খাঁও বাংলায় ফিরে এসে নিশ্চিন্তে রাজত্ব করতে থাকেন। সুলতানি যুগের ইতিহাসে সিংহাসনের জন্য বাবা আর ছেলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যার নজির অনেক রয়েছে। কিন্তু, সরযূর তীরে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার তুলনা হয়তো সারা বিশ্বে আর কোথাও নেই। বাবা-ছেলের সেই কাহিনি নিয়ে ওই বছরই আমির খসরু লিখে ফেলেন একটা মসনভি। ‘কিরান-উস-সাদাইন’। যে নামের বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘দুই নক্ষত্রের মিলন’। 

তথ্যসূত্র – Biographical Encyclopaedia of Islam, Volume 3; M. Th. Houtsma and T.W. Arnold  A Brief History of Bengal for Diaspora Bangladeshis, S. M. Deen.

Developed by DXDasia