৭ এপ্রিল থেকে মধু সংগ্রহে নামবেন সুন্দরবনের মৌলেদের দল
সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীদের কাছে বসন্তকালের অর্থ আমাদের থেকে বেশ খানিকটা আলাদা। বসন্তকালে দল বেঁধে তাঁরা প্রবেশ করেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের গভীরে। হাতে থাকে কুঠার, টাঙ্গি, বল্লম, কিংবা তীর-ধনুক। নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা সংগ্রহ করে আনেন টাটকা মধু, যা পরবর্তীতে প্যাকেটজাত হয়ে আমাদের কাছে আসে। মৌলে নামে পরিচিত এই মধু সংগ্রহকারীরা কখনও প্রাণ হারান বাঘের হাতে, কখনও কুমির অথবা সুন্দরবনের গহন অরণ্যের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা বিষধর সাপের কামড়ে। নিজেদের মধ্যে থেকে তাঁরা বেছে নেন এক অভিজ্ঞ মৌলেকে, যিনি বাকিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেন সুন্দরবনের গোলকধাঁধা সদৃশ বনভূমির মধ্যে দিয়ে। মৌলেদের পাশে থাকা ছাড়াও সুন্দরবন-সহ আশপাশের গ্রামে নেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব পদক্ষেপ। যেমন কিছু মাস আগেই সৌরবিদ্যুৎ চালিত আলো পেয়েছে সুন্দরবনের পাঁচটি প্রত্যন্ত গ্রাম।
গত দু-তিন বছরে এক ধাক্কায় অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে সুন্দরবনের খাঁটি বিশুদ্ধ মধুর চাহিদা। সেই সঙ্গে বেড়েছে বাজারদর। আর সে কথা মাথায় রেখেই এইবার এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তর। সম্প্রতি বনদপ্তরের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে, কেজি প্রতি মধুর দাম এবার ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করে দেওয়া হবে। মধুতে মেশানো জলের পরিমাণ অনুযায়ী এই দাম নির্ধারণ করা হবে।

বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্যান্য বছরের মতো এবারেও আগামী ৭ এপ্রিল থেকে মধু সংগ্রহে নামবেন সুন্দরবনের মৌলেদের দল। প্রায় ৯০টি দলকে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প সংলগ্ন এলাকায় মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে, যার প্রতিটি দলে থাকবেন ৬-১০ জন মৌলে। পরবর্তী পনেরো দিন ধরে সুন্দরবনের অন্তর্গত বিভিন্ন জঙ্গলে তাঁরা মধু সংগ্রহ করে বেড়াবেন; সেই মধু বিক্রি হবে সজনেখালি বনদপ্তরের কাছে। ‘ম্যানগ্রোভ বিপ্লব’ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল ঝড়খালি, রায়দিঘিতেও; সেভাবেই মৌলেদের পাশে থাকছে সুন্দরবনের জনসাধারণ।
বিগত বছরের তুলনায় বেড়েছে মৌলেদের সংখ্যা। প্রায় ৩৫০ জন মৌলের অংশগ্রহণে এবারেও অনুরূপ ফল পাওয়ার আশা রাখছে বনদপ্তর। সমীক্ষা অনুযায়ী, আমফান ও ইয়াশ ঘূর্ণিঝড়ের পর গত দু-বছরে তেমন কোনো বড়োরকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটার ফলে সুন্দরবনের জঙ্গল জুড়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য মৌচাক। এ বছরেও ইতিমধ্যেই মৌমাছিদের আনাগোনা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো হয়ে উঠেছে।

বনদপ্তরের পক্ষ থেকে এই মৌলেদের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (Boat License Certificate) দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে মাস্ক, কালেকশান জার, টি-শার্ট প্রভৃতি বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী। বিভিন্ন আকৃতির রংচঙে এই মাস্কগুলো মৌলেরা সাধারণত মাথার পিছন দিকে লাগিয়ে রাখেন, যাতে কোনো বন্যপ্রাণী আচমকা আক্রমণ করতে ভয় পায়। এর পাশাপাশি মৌলেদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ‘অপারেশন গোল্ডেন হানি’ নামে এক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী, যে এলাকায় মৌলের দল কাজে নামবেন, সেখানেই থাকবে একটি টহলদারি দল। তাঁরা জলপথে নৌকা নিয়ে এগোলে, এই দলটিও নৌকা নিয়ে তাঁদের আশেপাশেই থাকবেন। কোনোরকম সমস্যায় পড়লে তৎক্ষণাৎ মৌলেদের সাহায্যে নামবে দলটি। এছাড়াও জনতা ইনশিওরেন্স (BLC)-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রত্যেক মৌলের জন্য, যার দরুন জনপ্রতি বরাদ্দ হয়েছে ৫ লক্ষ টাকা।
আশা করা যায়, ৯০টি দল মিলে যদি পনেরো দিনের মধ্যে অন্ততপক্ষে ১০ মেট্রিকটন মধু সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে চলতি বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা উপার্জন করতে পারবেন তাঁরা। এতে একদিকে যেমন আর্থিক সুরাহার মুখ দেখবেন মৌলেরা, তেমনই অন্যদিকে তাঁদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি পাবে যোগ্য সম্মান।