বাংলা থিয়েটারে ক্রিয়েটিভ নির্মাণের উড়ান ক্রমশ কমে আসছে : দেবেশ চট্টোপাধ্যায়

নাট্যব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

র্তমান বাংলা থিয়েটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাট্যব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায় (Debesh Chattopadhyay)। একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যশিক্ষক। থিয়েটার সংসৃতি-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর থিয়েটার যাপন, আগামীকে দেখা, জীবনবোধ, জীবনচর্চা, সবকিছু নিয়েই বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে কথা বললেন তিনি।

_________________________

থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয় কী করে হয়? কবে ঠিক করেন থিয়েটার করবেন?

দেবেশ : আমার থিয়েটারের হাতেখড়ি শৈশবে, মায়ের স্কুলে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকের সম্পাদিত রূপ ‘রাজর্ষি’ নাটকের মাধ্যমে। মফস্বল ও গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠায় যাত্রা ও লোকনাট্যের প্রভাব অবচেতনেই মনে গেঁথে গিয়েছিল। কৈশোরে গান, ছবি আঁকা, নাচ আর ফুটবল— সব নিয়েই মেতে থাকতাম। কিন্তু গোবরডাঙার একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতাগুলো দেখতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম, থিয়েটার এমন এক মাধ্যম যেখানে আমি যা যা করি বা করতে ভালোবাসি তা সবই একইসঙ্গে মিশে আছে।

১৪ বছর আগে দেবী সর্পমস্তার টিকিট

এরপর থিয়েটারকে সিরিয়াসলি নিয়ে যুক্ত হলাম গোবরডাঙার নাট্যদল ‘শিল্পায়ন’-এর সঙ্গে। সেখান থেকে প্রকাশিত ‘শিল্পায়ন নাট্যপত্রিকা’ সম্পাদনার সুবাদে পরিচয় হলো তাপস সেন, সলিল বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিষ্ণু বসু-র মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে। আমাদের অভিনয় দেখতে তাঁরা গোবরডাঙায় এসেছিলেন। সেই রাতে আমার বাড়িতেই তাঁদের মধ্যে থিয়েটার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে; তাতে আমি ছিলাম এক মুগ্ধ নির্বাক শ্রোতা। ওই আড্ডাই আমার চিন্তার জগৎ বদলে দেয় এবং থিয়েটারকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিতে সাহায্য করে। পরবর্তীতে যদিও আমি কলকাতায় চলে আসি।

বাংলা থিয়েটারে নিজের মতো একটা স্ট্রাকচার তৈরি হলেও তার মধ্যে ক্রিয়েটিভ নির্মাণের যে কল্পনার দৌড় বা উড়ান, সেই উড়ানটা আমার কাছে মনে হচ্ছে ক্রমশ কমে আসছে। স্প্যানিশ কবি হিমেনেথের কবিতার একটা লাইন আছে : ‘ডানার শিকড় হোক শিকড়ের ডানা’।

‘সিনোগ্রাফি’ শব্দবন্ধটি বাংলা থিয়েটারে আপনিই সম্ভবত প্রথম ব্যবহার করেন। ‘সিনোগ্রাফি’বিষয়টি কী, কেন, এর প্রয়োগ কীভাবে হয় যদি আমাদের পাঠকদের জন্য একটু বিশদে বলেন।

দেবেশ : সিনোগ্রাফি মূলত একটি বিদেশি শব্দ, এর ইতিহাস বা ইটিমোলজি’তে না গিয়ে বলছি, সিনোগ্রাফি হল সামগ্রিকতা দিয়ে থিয়েটারটাকে দেখা, প্রযোজনাগতভাবে। সিনোগ্রাফারের কাজ নির্মাণ পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত। অনেক সময় নির্দেশক নিজেই সিনোগ্রাফার হন, কিন্তু যদি আলাদা হন তাহলে তার কাজটা একটু পৃথক, তার কারণ সেক্ষেত্রে আলাদাভাবে কোনো ডিজাইনার থাকছেন না, বা থাকলেও কোলাবোরেট করছেন সিনোগ্রাফারের সঙ্গে। মঞ্চ, আলো, আবহ, পোশাক, মেকআপ, টেক্সট এবং অভিনেতার কী সম্পর্ক তৈরি হবে, তার যে সিনার্জিটা, সেটা কীভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছাবে তার দায়িত্বটা সিনোগ্রাফারের থাকে।

কারুবাসনা

প্রয়োগগতভাবে এটা প্রথম আমি করেছিলাম পঞ্চম বৈদিক-এর ‘কারুবাসনা’য়। জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস থেকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন অর্পিতা ঘোষ ও নির্দেশনাও ওঁর। কিন্তু এর আগে থেকেই আমার নিজস্ব প্রযোজনাগুলোতে সিনোগ্রাফার হিসেবে আমার সলতে পাকানোর পর্ব চলছিল। তার চূড়ান্ত রূপ বলা যেতে পারে ‘দেবী সর্পমস্তা’ বা ‘বিকেলে ভোরের সর্ষে ফুল’ এই নাটকগুলোতে। এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্দেশকরাই সিনোগ্রাফারের কাজ করেন, কিন্তু যে নির্দেশকরা সিনোগ্রাফারের কাজ করেন, তাদের সামগ্রিকতা দিয়ে সমস্ত এলিমেন্টগুলোকে অভিনেতার বায়োলজিক্যাল বডির সঙ্গে মেশাতে হয়। যে নির্দেশকরা সবটা নিয়ে করেন তারা মূলত সিনোগ্রাফিই করেন, কিন্তু যারা আলাদাভাবে সেট, লাইট, কস্টিউম ডিজাইনার নিচ্ছেন এবং তাদের কাছে পুরোটা ছেড়ে দিচ্ছেন, তারা ডিরেক্টর এবং বাকিরা ডিজাইনার।

আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন, সেখানকার থিয়েটার দেখেছেন, থিয়েটারকর্মীদের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। আপনার কী মনে হয়, বিশ্ব থিয়েটারের নিরিখে বাংলা থিয়েটার এই মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে?

দেবেশ : বিশ্ব থিয়েটার খুব একটা স্থানু কোনো একক নয়, তারও বিভিন্ন রকমের ধরন আছে। অর্থবহুল ব্যয়বহুল প্রযোজনাও যেমন রয়েছে, আবার প্রচণ্ড এক্সপেরিমেন্টাল জায়গাও রয়েছে। আবার ভারতবর্ষের থিয়েটারেরও একটা বিভিন্নতা আছে। ভারতবর্ষের বা বাংলা থিয়েটারও কোনও একক স্থানু নয়। বাংলা থিয়েটার বলতে যদি বৃহত্তর জায়গাতে আমরা দেখি ,সেটা শুধুমাত্র প্রসিনিয়াম থিয়েটার নয়, সেখানে অসংখ্য লোকনাট্য রয়েছে বা অঙ্গনমঞ্চ, অন্তরঙ্গ নাটক রয়েছে, বাংলা থিয়েটারের বিভিন্ন রূপ ছড়িয়ে আছে। তার ফলে ওইভাবে এটাকে ধরা যায় না। আর একটা বিষয়, এই দুটো নাট্যভাষার তুলনা হয়না। তবে একটা কথা বলা যেতে পারে, আমরা যদি পাশ্চাত্যের নাট্যে ইভোলিউশনটা দেখি তাহলে দেখবো, পাশ্চাত্যের নাটক ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আরও বেশি উন্মুক্ত হয়েছে, বিশেষ করে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারগুলো। অন্যদিকে বাংলা থিয়েটার বরঞ্চ উন্মুক্তই ছিল, কিন্তু সেটা বদ্ধ হতে হতে কোথাও একটা ঘেরাটোপের মধ্যে চলে এসেছে, আবার যেন একটু পিছনে হাঁটছি আমরা। এটা দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। সাম্প্রতিক বাংলা থিয়েটারে কোথাও একটা ডিজাইন সর্বস্বতা তৈরি হচ্ছে বা একদম উল্টোটাও; কোথাও এমন এমন খুব এলিমেন্টারি থিয়েটার হচ্ছে যা আমরা বহু আগে বর্জন করেছি। নাট্যের প্রয়োজনে ডিজাইন নির্মিত হচ্ছে না, ডিজাইন ডিজাইনের মত রয়েছে, কন্টেন্ট কন্টেন্টের মত রয়েছে, কোনো সংযুক্তি তৈরি হচ্ছে না। দেখানোর একটা ব্যাপার যেমন রয়েছে আবার নাট্য নির্মাণের দৃশ্যকাব্যের বিজ্ঞান নিয়ে সামগ্রিক অজ্ঞানতাও রয়েছে, এই বিষয়টি চিন্তার। যদিও এর বাইরে অনেক এক্সপেরিমেন্টাল কাজও হচ্ছে, এটাই আশার। এই ডাইভার্স স্পেসের মধ্যে কেউ অর্থ পাচ্ছে, কেউ অর্থ পাচ্ছে না, কেউ অর্থ পেয়ে অপচয় করছে। ‘অর্থ’ মানে আমি কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত অর্থের কথা বলছি।

বাংলা থিয়েটারে নিজের মতো একটা স্ট্রাকচার তৈরি হলেও তার মধ্যে ক্রিয়েটিভ নির্মাণের যে কল্পনার দৌড় বা উড়ান, সেই উড়ানটা আমার কাছে মনে হচ্ছে ক্রমশ কমে আসছে। স্প্যানিশ কবি হিমেনেথের কবিতার একটা লাইন আছে : ‘ডানার শিকড় হোক শিকড়ের ডানা’। এই ডানা আর শিকড়ের যে সম্পর্ক সেইটা বোধহয় আমরা ক্রমশ ভুলছি। বাংলা থিয়েটারের শিকড়কে নিয়ে আমাদের যে উড়ান দেওয়ার কথা ছিল তার মধ্যে একটা বিস্তর ফারাক থেকে যাচ্ছে।

দেবী সর্পমস্তা

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’, ‘দেবী সর্পমস্তা’, ‘ফ্যাতাড়ু’, আপনার নির্মাণে বহু নাটকের মধ্যে এই তিনটি নাটকের নির্মাণ বিষয়ে যদি পৃথকভাবে আমাদের কিছু জানান।

দেবেশ : উইঙ্কল টুইঙ্কল, দেবী সর্পমস্তা, ফ্যাতাড়ু’র মধ্যে উইঙ্কল টুইঙ্কল আর ফ্যাতাড়ু পরপর দুটি প্রযোজনা। এর প্রায় এক দশক পরে আমি ‘দেবী সর্পমস্তা’ নির্মাণ করি ২০১১ সালে। উইঙ্কল টুইঙ্কল কলকাতাতে আমার প্রথম বড়ো প্রযোজনা। বাংলা থিয়েটারের গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাদের একটা অনসম্বল ছিল এটা। দেবশঙ্কর হালদার, রজতাভ দত্ত, মায়া ঘোষ, প্রদীপ ভট্টাচার্য, অসিত বসু, শ্যামল চক্রবর্তী, আশিষ দাস প্রমুখ অভিনেতারা এই নাট্যে অভিনয় করেছিলেন, বিভিন্ন ঘরানা থেকে তাঁরা এসেছিলেন, বলা যেতে পারে সারা বাংলা থেকে বিভিন্ন অভিনেতারা একজোট হয়েছিলেন। তাঁদের অভিনয়ের স্টাইলটার মধ্যেও একটা বিভিন্নতা আছে। আমার প্রাথমিক কাজ ছিল এই বিভিন্নতাকে ভেঙ্গে ফেলে একটা চরিত্র তৈরি করা। উইঙ্কল টুইঙ্কল থেকে আমার ভাবনা ছিল যে আমরা আলাদাভাবে শিফটিং করি অর্থাৎ আলো কমিয়ে বা নিভিয়ে, সেই দৃশ্যান্তরটাকে কি করে ‘পার্ট অফ দ্য প্রোডাকশন’ করে তোলা যায়! এটার সেট ডিজাইন করেছিল সঞ্চয়ন ঘোষ। এবং এর সঙ্গে একটা বড়ো জায়গা ছিল ব্রাত্য বসুর লেখা টেক্সটটা, সেই সময়ের খুবই প্রাসঙ্গিক টেক্সট। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা অবস্থা হয়তো আমরা একটু আগে থেকেই প্রফেটের মতো বলতে আরম্ভ করেছিলাম। মঞ্চ, আলো, অভিনয় সব মিলেমিশে কিভাবে নাটকের বিষয়কে দর্শকের কাছে শিল্পসম্মত ভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় তার চেষ্টাই এ নাট্য নির্মাণে করেছিলাম।

খালেদদা একটা খুব ইন্টারেস্টিং কথা বলেছিলেন যেটা আজকের থিয়েটারের ক্ষেত্রে খুব প্রযোজ্য। আমরা দেখছি যে কিছুদিন চর্চা করার পর তারা ‘ফ্রি-ল্যান্সার অ্যাক্টর’ হয়ে যাচ্ছে, এ-দলে ঐ-দলে বিভিন্ন দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু শেখাটা অসম্পূর্ণ।

ফ্যাতাড়ু

ফ্যাতাড়ু-র চ্যালেঞ্জটা আরও অনেক বেশি ছিল। নবারুণদা-র ‘ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’-এর ছোটো -ছো্টো গল্প মিলিয়ে মিশিয়ে আমাদের দলের রাজর্ষি দে একটা টেক্সট তৈরি করেছিল। সেইটাকে ডিকনস্ট্রাক্ট করে প্রযোজনাটি তৈরি হয়। এখানে গল্প আছেও আবার নেই। এইখান থেকে প্রথম আমি আমার থিয়েটারের আরও একটা পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। তোমার কাছে যদি কিছু না থাকে, তাহলে তুমি কী করে থিয়েটার করবে? এটা অনেকটা গ্রোটস্কির পুয়োর থিয়েটারের মতো। খুবই মিনিম্যালিস্টিক জায়গা থেকে আমরা ফ্যাতাড়ু তৈরি করেছিলাম। সামান্য সেট দিয়ে গোটা একটা নাটক হয় এবং নাটকের মধ্যে অজস্র লোকেশন বিল্ড হতে হতে যায়। দর্শকের কল্পনাকেই আমি এখানে গুরুত্ব দিয়েছিলাম। ফ্যাতাড়ু আমার কাছে একটা লার্নিং প্রসেস। মেটাফর কত রকমভাবে থিয়েটারে ব্যবহার করা যায় তার একটা চেষ্টা করেছিলাম। এই নাটকে ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রথম আমাদের সঙ্গে নাটকের মিউজিক করেছিল। ফলে চন্দ্রবিন্দুর গান, তার আবহ, টেক্সটের নন-লিনিয়ার নেচার, সব মিলেমিশে পুরো বিষয়টার মধ্যে একটা কার্নিভালিস্টিক অ্যাপ্রোচ ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে ওই স্পেসটাকে ডিসকভার করতে করতে গেছিলাম। যে তোমার মাথায় প্রথম যে ছবিটা আসছে সেটাকে বর্জন করো, চেষ্টা করো একটা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ছবি খোঁজার, যে ছবিটা তোমাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। প্রথম ছবিটা খুব সহজ আসে, কিন্তু তখন মনে হয় না, এই পিক্টোরিয়াল থেকে তো আরও একটা পিক্টোরিয়াল হতে পারে। যে পিক্টোরিয়ালটা দর্শকের মগজে তৈরি হয়। তাহলে সেই পিক্টোরিয়ালটা কী হতে পারে? তখন ওই প্রথম পিক্টোরিয়ালটাকে আমি যখন ছুঁড়ে ফেলে দিই, তাহলে বিকল্প কী হতে পারে? তার ফলে যখন অনেক পরে, এক দশক পরে ‘দেবী সর্পমস্তা’ করতে যাই, তখন টের পাই ফ্যাতাড়ু-র সঙ্গে দেবী সর্পমস্তা-র একটা মিল আছে। মিলটা হচ্ছে না-পাওয়ার মিল। দেবী সর্পমস্তার সময়ে তখন মিনার্ভা রেপার্টারির ফিনান্সিয়াল কন্ডিশন খুব খারাপ, সরকার প্রায় বদলাতে যাচ্ছে এমন একটা সময়, সরকারের টাকা নেই, ঠিক ভোটের আগে আগে। মিনার্ভায় পড়ে থাকা, আগের প্রযোজনায় ব্যবহার করা কানহাইয়ালালের নাটকের একটা বেদী, একটা গাছ, লিয়ারের কিছু বেঞ্চ, মিনার্ভার একটা ঘরাঞ্চি, এইগুলো দিয়ে মঞ্চ তৈরি হল। অর্থাৎ আমাদের কাছে কিছু নেই, ওইটাই আমাদের সম্পদ, সেটা কী করে দর্শকের কল্পনার সঙ্গে অ্যাসোসিয়েট করা যায়। দেবী সর্পমস্তা আমরা দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ করেছি, লোকনাট্যের ধরনটা বোঝার জন্য আমি বাঁকুড়া থেকে কিছু লোকনাট্যের শিল্পীকে নিয়ে এসে তাদের সঙ্গে নাটকটির সংগীতের গতি, লয়, ছন্দের একটা অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছিলাম ই.জেড.সি.সি-তে। করতে করতে আমি একটা ধরন পেলাম যে এটার মিউজিক্যাল চলন কী হতে পারে। মিনার্ভাতে ফিরে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে আমরা কাজটা করি। এটাতে আমি অভিনেতাদেরকে আমি প্রথাগত ভাবে কোনো স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে দিইনি, ফ্যাতাড়ুতেও দিইনি। আমরা প্রসেসটা করতে করতে গেছিলাম, সেখানে কথা সংলাপ হয়ে উঠেছিল। আমরা মূল টেক্সট থেকে ডেভিয়েট করেছি, অজস্র নতুন গান জুড়েছে। আমরা মনোজ মিত্রের লেখা দেবী সর্পমস্তা টেক্সটটাকে প্রায় একটা মেটা-টেক্সট হিসাবে ধরে একটা ফাইনাল পারফরম্যান্সে নিয়ে চলে গেছিলাম। পারফরম্যান্স টেক্সটটার সঙ্গে মূল লিখিত টেক্সটের একটা বড়ো ফারাক ছিল। ফলে এই তিনটি নাটক তিনরকমভাবে আমাকে শিখিয়েছে। আজও যখন আমি ফিরে তাকাই পেছন দিকে, যখন নাটক থেকে নাট্য নির্মাণের কথা ভাবি, তখন এই তিনটে নাটকের নির্মাণ পদ্ধতি সবসময় আমাকে উজ্জীবিত করে।

ব্রেন

থিয়েটারের ডিজিটাল আর্কাইভ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাংলা থিয়েটার কি এটা নিয়ে সেভাবে ভাবছে?

দেবেশ : থিয়েটার ডিজিটাল আর্কাইভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা থিয়েটারে অবশ্যই একসময় ‘নাট্যশোধ’ এটা নিয়ে ভেবেছিলেন এবং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্কাইভ বিশেষ করে অডিও আর্কাইভ তাদের কাছে রয়েছে। সে আর্কাইভের কিছুটা অংশ আমার কাছেও রয়েছে, আমি সেগুলো শুনে উপকৃত হই। কিন্তু আমি বলতে চাই যে যখন থেকে ভিডিও তৈরি হল, অবভিয়াসলি একটা ভিডিওর মাধ্যমে থিয়েটারের ডকুমেন্টেশন যখন হয় সেটা কখনোই থিয়েটার হয়ে ওঠে না, সেটা অন্য একটা মাধ্যম তৈরি করে। তা হলেও নির্মাণটা কী হয়েছিল তার একটা অন্তত বেসিক ধরতাই পাওয়া যায়। সেইটাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে করা হয়নি। আমরা কিছু কিছু নাটক দেখতে পাই, উৎপল দত্তের কিছু নাটক রয়েছে। কিন্তু শম্ভু মিত্রের কোনও নাটক নেই। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও নাটক নেই। এগুলো আমরা পাইনি। বাদল সরকারের কিছু অংশ আমরা পেয়েছি ডিজিটাল আর্কাইভে। আমরা এই সময়েও সচেতন নই। এখন যে তিনটে ক্যামেরা দিয়ে শুট করা হচ্ছে, একটা ঝাঁ চকচকে জায়গা তৈরি করা হচ্ছে সেটা কিন্তু থিয়েটারের একটা বেসিক ডকুমেন্টেশন বলা যেতে পারে। এটা অন্যভাবেও করা যায়। কিন্তু সবথেকে যেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত থিয়েটারের ক্ষেত্রে সেটা নাট্য নির্মাণ প্রক্রিয়ার ডিজিটাল আর্কাইভ, অর্থাৎ একটা নাটক থেকে যখন নাট্য তৈরি হচ্ছে তখন কীভাবে ধীরে ধীরে এই নাটকটা থেকে নাট্যটা তৈরি হচ্ছিল, ডে ওয়ান টু ফাইনাল কালমিনেশন, তার যদি একটা ডকুমেন্টেশন হতো; সেই ডকুমেন্টেশনটা বাংলা থিয়েটারে দুর্লভ এবং সেই ব্যাপারে অপ্রাপ্তি রয়েছে। নিজের ক্ষেত্রেও দেখেছি যে সেইটা অনেক সময় করা হয়ে ওঠে না। অনেক সময় কেউ এসে করেছেন কিছুটা রয়ে গেছে কোনো কোনো নাটকের ক্ষেত্রে, কিন্তু সব নাটকের ক্ষেত্রে হয়নি। এটা সত্যি আমরা খুব একটা সচেতন নই। নির্মাণ প্রক্রিয়াটা ডকুমেন্টেড হলে বোঝা যায় যে থিয়েটারটা কীভাবে নির্মিত হয়েছে,সেটার প্রসেসটা কী? নির্মাণের পদ্ধতিটা কী? সেইটা হয়তো ভবিষ্যতে ১০ বছর কি ১৫ বছর কি ২০ বছর পর কাজে লেগে যায়।

উইঙ্কেল টুইঙ্কেল

বাংলা থিয়েটার এখনও  কলকাতাকেন্দ্রিক, অন্যান্য জেলার নাটক নিয়ে প্রায় কোনো চর্চাই হয়না, কেন? এটা কি কলকাতার সমস্যা?

দেবেশ : এই প্রশ্নটা কলকাতারই প্রশ্ন, বিষয়টা কিন্তু এরকম নয়। এখন যদি আমরা দেখি, মফস্সলের কিছু থিয়েটার দলের কাছে কলকাতা-র তুলনায় অনেক বেশি স্পেস এবং অর্থ আছে। সেটা বীরভূম হোক বা গোবরডাঙ্গা হোক বা নৈহাটিতে হোক। সেই অর্থ ক্ষমতার অর্থ হতে পারে, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় ক্ষমতা। তবে যেভাবেই হোক, কিছু অর্থ মফস্সলের থিয়েটারের কাছেও রয়েছে। তবে কলকাতার খবর কাগজের চর্চাটা হয়তো তাদের নিয়ে ততটা হয় না, এর জন্য নাটকের গূণগত মানও নিশ্চিত একটা কারণ। তবে হ্যাঁ, ইদানিং কিছু মফস্বলের দল খবরের কাগজের চর্চা হয়ে উঠছে ক্রমশ, ‘অর্থ’ বা অন্য কোনো ক্ষমতার দৌলতে।

প্রকৃত অর্থে মফস্সলে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে থিয়েটার করে যারা কোনো আপোষ না করে, তাদের ক্ষেত্রে সেটা খুবই অসুবিধাজনক ব্যাপার। মফস্সলের ক্ষেত্রেও আমরা দু-রকম ভাবে ভাগ করে ফেলতে পারি—একটা প্রিভিলেজড মফস্সল, আর একটা প্রিভিলেজড মফস্সল নয়, যারা এক্সপেরিমেন্টালি কাজ করছে। প্রিভিলেজড মফস্সল কিন্তু কলকাতায় পৌঁছে যায়, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের টাকা পায়। কিন্তু যে প্রিভিলেজড নয় সেই মফস্সলের থিয়েটারের ক্ষেত্রে সত্যিই তারা ক্ষমতার মধ্যে না থাকার কারণে তাদের নিয়ে চর্চা হয় না।

এটা কলকাতার সমস্যা নয়, এটা সামগ্রিকভাবে একটি সমস্যা। ভালো প্রযোজনা হলেও সেটাকে তো বহন করতে হবে। ধরা যাক যে কলকাতার কোনো একটি দল, তারা একটা হল চালায়, মানে হলটা তার হাতে আছে। এবার সে নিয়মিত নিজের হলে তার নাটকটা অভিনয় করছে, বিভিন্ন লোককে দিয়ে একটা প্রচারের জায়গা তৈরি করছে। নিয়মিত লোকের চোখের সামনে থাকলে তার একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আর চোখের বাইরে চলে গেলে বহুদিন পরে যদি একটা নাটক হয় তখন তারা সেই স্পেসটার মধ্যে ঢুকতে পারে না। সেটা আরও একটা প্রতিবন্ধকতা।

আর কলকাতার দর্শকরা সবসময় নাম চায়। তারা জিজ্ঞেস করেন, কে আছেন অভিনয়ে। এটা আমরা দর্শকদের ক্ষেত্রেও দেখেছি এবং মিডিয়ার ক্ষেত্রেও। আমি কয়েকদিন আগে যখন টাকি-তে একটা থিয়েটার দলের সঙ্গে একটা প্রযোজনা করলাম, রেজিনাল্ড রোজের ‘টুয়েলভ অ্যাংরি মেন’ বিষ্ণু বসুর অনুবাদে ‘মান্যবর ভুল করছেন’, তখন আমাকে প্রথম যে প্রশ্নটা করেছিলেন মিডিয়া থেকে—কে আছেন? মফস্সলের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নাম থাকে না। এখন দর্শক যেহেতু একটা ‘কে আছেন’-এর জায়গায় চলে গেছে, ‘কী আছে’, কনটেন্ট কী সেই দিকে তাদের খুব একটা নজর থাকে না। সেই তুলনায় হ্যাঁ, সেখানে পিছিয়ে তারা একটু আছেন। কিন্তু বাকিটুকু খুব গোলমেলে, মানে ডাইভার্স এবং অনেকগুলো স্তরে বিভক্ত বলে মনে করি।

থিয়েটার স্কলারদের ভবিষ্যৎ কী? আদৌ কি তাদের কোনো ভবিষ্যৎ আছে?

দেবেশ : আমার সাম্প্রতিক বই ‘অভিনেতার অধীতি’-তে আমি লিখেছিলাম – যারা করে তারা পড়ে না, আর যারা পড়ে তারা করে না। আসলে থিয়েটার তো পারফর্মিং আর্টস, হয়ে ওঠার জায়গা। সেই ক্ষেত্রে যারা থিয়েটারের স্কলার তারা থিয়েটারটাকে যে পেডাগজিক্যালি দেখার চেষ্টা করেন, তাদের মগজের জায়গা থেকে দেখেন, তার বাইরে গিয়ে আমাদের চর্চার জায়গাটা অনেক সময় বুঝতে চান না।

কিন্তু যদি থিয়েটার স্কলাররা চর্চাটাকেও সমানভাবে আত্মস্থ করতে পারেন তাহলে তার একটা ভবিষ্যৎ আছে। যা ইতিহাস বা তথ্য, সেটারই পুনর্লিখন করা থিয়েটার স্কলারদের কাজ নয়। থিয়েটার স্কলাররা বরং নিজেদের মতো করে একটা ভাষ্য তৈরি করবেন। ফলে ধরণী ঘোষ, পবিত্র সরকার, বিষ্ণু বসু বা শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে যারা সাম্প্রতিক সময়ে নাটক নিয়ে লেখালেখি করেন, তাঁরা মূলত তথ্য নিয়ে কথা বলেন। আমার পড়তে পড়তে বারবারই মনে হয় ‘আপনি কী বলছেন? আপনার নিজস্ব ভাষ্যটা কী?’ এই নিজস্ব ভাষ্য তাঁরা বলতে পারেন না। তার কারণ নিজস্ব ভাষ্য বলতে গেলে নাট্যের যে গভীরে তাদেরকে ঢুকতে হবে, সেই গভীরতা তাঁদের নেই। ফলে যদি সত্যিই স্কলাররা নাট্যের ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষ্য তৈরি করতে পারেন, বোধের জায়গা থেকে কথা বলতে পারেন, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ আছে। না হলে ওগুলো শুধুমাত্র কথার কথা হয়ে যাবে।

কোথাকার চরিত্র কোথায় রেখেছ

নতুন যারা থিয়েটার করতে আসছে, তাদেরকে কী কী বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে আসার পরামর্শ দেবেন?

দেবেশ : নতুন যারা থিয়েটার করতে আসছে তাদেরকে বলব, যে একজন অভিনেতার তো তিনটে অস্ত্র আছে—একটা শরীর, একটা গলা, একটা মগজ। এই তিনটে অস্ত্রকেই শান দিতে হয়, সজ্জিত করতে হয়। আমি আলাদা আলাদা ভাবে চর্চা করলাম, তাতে কিচ্ছু হবে না, সেই চর্চার সামগ্রিকতাটাকে বুঝতে হবে। আমি শুধু আলাদাভাবে চর্চাই করে গেলাম,রিহার্সালই করে গেলাম, ওয়ার্কশপ করে গেলাম তাতে করে কিচ্ছু হবে না।

খালেদদা একটা খুব ইন্টারেস্টিং কথা বলেছিলেন যেটা আজকের থিয়েটারের ক্ষেত্রে খুব প্রযোজ্য। আমরা দেখছি যে কিছুদিন চর্চা করার পর তারা ‘ফ্রি-ল্যান্সার অ্যাক্টর’ হয়ে যাচ্ছে, এ-দলে ঐ-দলে বিভিন্ন দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু শেখাটা অসম্পূর্ণ। একজন অভিনেতার কাছে অভিনয় শেখাটা গুরু ভিত্তিক। যদিও গুরু পাওয়া দুর্লভ, শুধুমাত্র এখন ভারত সরকারের গ্রান্টের খাতায় গুরু পাওয়া যায়, তবুও বলা যেতে পারে, খালেদ চৌধুরী যে কথা বলেছিলেন যে—কচুরিপানার ফুল দেখতে খুবই সুন্দর, কিন্তু কচুরিপানার ফুল দিয়ে আমরা ঘর সাজাই না। তার কারণ কচুরিপানার ফুল ভেসে বেড়ায়। তার কোনো জমি নেই, মাটি নেই, সে শিকড়ে প্রোথিত হয় না এবং সেখান থেকে কোনো গাছের জন্ম দেয় ন। আমাদের বাংলা থিয়েটারের অভিনেতাদের এটাই বলব যে কচুরিপানার ফুল হয়ে লাভ নেই। ছটফট করলে হবে না, এসেই ছ-মাসে অভিনেতা হয়ে যাব, এটা হয়না। এখন যে অ্যাকাডেমি-ট্যাকাদেমি শুরু হয়েছে, তারা ছ-মাসের কোর্স, এক বছরের কোর্স করে অভিনয় শিখিয়ে দিচ্ছে, সেগুলো বিপজ্জনক। এগুলো হাফ কুকড একটা স্পেস তৈরি হচ্ছে এবং এই অর্ধসিদ্ধ জিনিস তো আমরা খেতে পারি না। ফলে আমি বারবার বলব যে স্থিতধী হও, নির্দিষ্ট গুরুর অধীনে চর্চা করো এবং ছটফট করো না। যেকোনো জিনিস শিখতে হয়, অভিনয়টাও শিখতে গেলে সময় লাগে। সময় দিতে হবে। তুমি যদি সময় দাও তাহলে সময় তোমাকে সেই মূল্যটা ফেরত দেবে। এটুকুই বলার।

Developed by DXDasia