যতই প্রতিবাদ থাকুক, থিয়েটার এখন মূলত বিনোদনমূলক : সাক্ষাৎকারে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়

বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়

র্তমান বাংলা থিয়েটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাট্যব্যক্তিত্ব বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় (Biplab Bandyopadhyay)। একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যশিক্ষক ও নাট্যসংগঠক। থিয়েটার গ্রুপ প্রাচ্য-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর থিয়েটার যাপন, আগামীকে দেখা, জীবনবোধ, জীবনচর্চা, সবকিছু নিয়েই বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে কথা বললেন তিনি।
___________________________

   প্রশ্ন: আপনার থিয়েটারে আসার গল্পটা কেমন ছিল? 

বিপ্লব: আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বাঙালি যাপনে কতগুলো বিষয় থাকে। পড়াশোনাটা বাধ্যতামূলক, তারপরে যদি এক্সট্রা কারিকুলার কিছুতে ঝোঁক থাকে, বাড়ি থেকে অনেক সময় উৎসাহ দেয় বা দেয় না। আমাদের বাড়িতে অবশ্য কোনোটার ক্ষেত্রেই বাধা-নিষেধ ছিল না। যৌথ পরিবারে আমরা চার ভাই যে যার মতো বেড়ে উঠতে পেরেছি, একটা স্বতন্ত্রতা থেকেছে। আশির দশকে বেলঘড়িয়া অঞ্চলে আমাদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনেক অপশন ছিল; সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে, খেলাধুলার জগতে, সমাজবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রেও। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এমন দু’জন মানুষকে পেয়ে গেলাম, যাঁরা ওই সময়ে আমার কাছে ব্যক্তিত্ব হিসাবে খুব জোরালো হয়ে উঠলো। তাই, তাঁদের নৌকোতেই ভিড়ে গেলাম। একজন নিশ্চিতভাবে অভি সেনগুপ্ত, যাঁর সাহচর্যে, নেতৃত্বে আমি কাজ করেছি, আমাদের ‘অঙ্গন বেলঘড়িয়া’র স্থপতি। অন্যজন সদ্য প্রয়াত কবি রাহুল পুরকায়স্থ। রাহুল আমাকে স্থায়ীভাবে থিয়েটারে থেকে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছেন, আর থিয়েটারের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার যে কসরত বা লড়াই, সেইটা অভি সেনগুপ্ত করেছেন।

বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ – প্রাচ্য

   প্রশ্ন: অশোক মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাটানো সময় এবং ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ যাপন কেমন ছিল? 

বিপ্লব: ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ আমার কাছে জীবন দর্শন, জীবন বোধ, জীবন চর্চা এবং জীবনকে দেখার পদ্ধতি—সবকিছুই  নতুন করে তৈরি করে দেয়। এই প্রস্তুতিতে যেমন ছিলেন অশোক মুখোপাধ্যায়, সেভাবেই ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’কে কেন্দ্র করে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা, পরিচয়; তথাকথিত কলকাতার আধুনিক পরিকাঠামো-যুক্ত থিয়েটার, যেটা আমি মফস্সলে  পাইনি, তার সঙ্গে আত্মস্থ হতে থাকলাম। এখন যা কিছু করছি, তা থিয়েটার ওয়ার্কশপের অর্জিত সঞ্চয় থেকেই করছি, তার বাইরে কিছু করে উঠতে পেরেছি বলে মনে করি না। অশোকবাবুকে সবাই স্যার বলতেন, আমিও বলতাম। কিন্তু পরে যখন আমার মধ্যে অন্যান্য বোধ তৈরি হতে শুরু করল, তখন থেকে অশোকবাবুকে ‘মাস্টারমশাই’ ডাকতেই আমার আমার ভালো লাগে, আরাম পাই। ঠিক যেভাবে কলাভবনে নন্দলাল তাঁর অনেক ছাত্রের মধ্যে বিনোদবিহারী এবং রামকিঙ্করকে গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের স্বকীয়তা বজায় রেখেই। সংঘাত হয়েছে, দ্বিমত হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কথা বন্ধ থেকেছে, কিন্তু এই কলাভবনকে কেন্দ্র করে দু’জনের গড়ে ওঠার যে প্রসারতা সেইটা কলাভবন এবং তাঁদের অধ্যক্ষ তাঁদেরকে দিয়েছেন। অশোকবাবুর ক্ষেত্রেও তাই। থিয়েটারের ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব ভাবনার পরিমণ্ডল যে অশোকবাবুর দেখানো পথের সঙ্গে মিলেছে তা নয়, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে, মানুষ হিসেবে সেই উদারতা ও প্রসারতা আমি তাঁর থেকেই পেয়েছি। আমার থিয়েটারে যদি কোনো নিজস্বতা থেকে থাকে, তা আমার মাস্টারমশাই অশোকবাবুর সাহচর্য, ঔদার্য এবং শিক্ষা।

আশির দশকে বেলঘড়িয়া অঞ্চলে আমাদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনেক অপশন ছিল; সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে, খেলাধুলার জগতে, সমাজবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রেও। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এমন দু’জন মানুষকে পেয়ে গেলাম, যাঁরা ওই সময়ে আমার কাছে ব্যক্তিত্ব হিসাবে খুব জোরালো হয়ে উঠলো।

 প্রশ্ন: ‘প্রাচ্য’ তৈরি হলো কীভাবে?

বিপ্লব: আমি ততদিনে আমার অভিনেতা সত্তাকে অতিক্রম করে পরিচালক সত্তার দিকে এগিয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অভিনেতা পর্যায়ের একটা সময়ের পর আমার মধ্যে পরিচালক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হলো। আমাদের যে পরিকাঠামো সেখানে একটা সংগঠন লাগে, যেটাকে কেন্দ্র করে আমি আমার পরিচালক সত্তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। প্রথমে আমার বন্ধু বিলু দত্তের আমন্ত্রণে, তাঁর সাহচর্যে, আমার নির্দেশনায় ‘নীল মাটি লাল কাঁকর’ নাটক নির্মাণ করেছিলাম আমরা। তবে, প্রত্যেক ব্যক্তি এবং তাঁর দ্বারা পরিচালিত সংগঠনের নিজস্ব মেজাজ, ধরন বা উদ্দেশ্য থাকে। এক্ষেত্রে আমারও সেই সুযোগ ছিল, যেরকমভাবে ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-এও সুযোগ ছিল। কিন্তু আমি মনে করেছিলাম থিয়েটার ওয়ার্কশপ-এর যে পরিকাঠামো এবং যেভাবে তারা থিয়েটারটাকে দেখেন, আমি সেইভাবে দেখছি না। আমার মনে হয়েছে ওই ইনফ্রাস্ট্রাকচারে আমি খাপ খাওয়াতে পারবো না। তারপরে তপন থিয়েটারেও সমর মিত্র আমায় দিয়ে দু-তিনটে কাজ করিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটা কাজ ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা-র ভারত রং মহোৎসবে নির্বাচিত হয়। কিন্তু ওখানেও আমি থিয়েটার যেভাবে করতে চাইছি, সেটা পাচ্ছিলাম না। ফলে আমার নিজস্ব সংগঠনের প্রয়োজন ছিল, যেখানে আমার বন্ধু-বান্ধব, আমার সমমনস্ক মানুষেরা একসঙ্গে মিলে নিজেদের মতো করে একটা থিয়েটার যাপন করতে পারবো। সেই জায়গা থেকেই ‘প্রাচ্য’ তৈরি। ‘প্রাচ্য’ নামটা আমারা পাই স্বপ্নসন্ধানীর প্রযোজনা থেকে। প্রাচ্য নাটকটির প্রযোজনা দেখার পরে সেলিক-অল-দীনের মূল টেক্সটি পড়ি। সেখানে আমাদের এই সাবকন্টিনেন্টের শিল্পচর্চার নতুন একটা ভাষ্য আছে। আমি যেহেতু এই বঙ্গে, এই দেশে, এই ভূমিতে নাট্যচর্চা করি, সেখান থেকে ওই ‘প্রাচ্য’ নামটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।

খেলাঘর – প্রাচ্য

   প্রশ্ন: অভিনেতা না কি নির্দেশক, কোন সত্তাকে এগিয়ে রাখবেন? 

বিপ্লব: অভিনয় ও নির্দেশনা দু’টো পর্যায়ে ঘটেছে। আমি ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ জয়েন করি একজন নাট্য-শিশিক্ষু হিসাবেই। সেখানে অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত হই। আমার নিজস্ব তাগিদ বা প্রক্রিয়া থেকেও দলগত প্রক্রিয়ার একটা অংশ হিসেবে হঠাৎ অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাই। আমার খুব সচেতন চেষ্টা ছিল বলবো না। নাটক হয়েছে আর আমি কতগুলো মূল চরিত্র পেয়েছি। সেখানে হয়তো এক ধরনের মান্যতা পেয়েছে আমার চরিত্রগুলো, ফলে আমি অভিনেতা হয়ে উঠেছি। সেটা সম্পূর্ণরূপে ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’, অশোক মুখোপাধ্যায়, পরবর্তীকালে অরুণ মুখোপাধ্যায় বা সুমন মুখোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব। কিন্তু খুব সচেতনভাবে আমি অভিনেতা সত্তাকে নাড়াচাড়া করিনি। তবে থিয়েটারের সার্বিক গঠনের জায়গা বা দর্শনগত, শিল্পগত জায়গা থেকে নিজের যে অবস্থান, সেইখানে নির্দেশকই একমাত্র সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ফলে নির্দেশক হিসেবে আমার অনেক বেশি আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছি অন্যদের নির্দেশনায়। কিন্তু ২০০৭-০৮-এর পর থেকে, মানে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ হওয়ার পর থেকে আমি পরিচালক সত্তাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। তারপর থেকে অভিনেতা হিসেবে আমি খুব একটা মঞ্চে দাঁড়াতেও চাইনি। অনেকগুলো কাজ করেছি বটে অন্যদের নির্দেশনায় বা কখনও দলের প্রয়োজনে, কিন্তু অভিনয় আমার নিজের কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং কিছু নয়। অনেক চরিত্রই আমার খুব পছন্দের, অভিনয় যে আমার খারাপ লাগে তা নয়। কিন্তু আমার তখনই মনে হয়েছে যে – অমুক তো আরও বেটার অভিনয় করে এবং ওকে আমি আরও সাহায্য করতে পারি। সে যখন অভিনেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে, সেখানে ওর সঙ্গে আমার ভাবনাচিন্তাগুলো একত্রিত হয়ে একটা সম্পূর্ণতা পেতে পারে, যেটা হয়তো খন্ডিতভাবে আমি একা করলে ঘটবে না। সেই কারণেই অভিনেতা হিসেবে নিজেকে মান্যতা দিলেও নির্দেশক সত্তাটাই আমার কাছে অনেক বড়ো। এটা আমি উপভোগ করি শুধু না, এটার মধ্যেই আমি থাকতে চাই।

   প্রশ্ন: ‘প্রাচ্য’ সবসময় নতুনদের জায়গা দিয়ে এসেছে, রোব্বিকেলের ফরাস’এর মতো কর্মকান্ড চালাচ্ছে বেশ কিছুদিন। এই সময়ে যখন নতুনদের জায়গা দেওয়ার প্রবণতা কমে আসছে, তখন প্রাচ্যর এই উদ্যোগ সম্পর্কে কী বলবেন?

বিপ্লব: নতুনদের জায়গা দেওয়ায় কোনো কৃতিত্ব নেই। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমাদের যে প্রবহমানতা, থিয়েটার চর্চায়  তার একটা ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। ফলে আমরা বা আমি যে বিক্ষিপ্ত কোনো কাজ করে ফেলছি, এমনটা নয়। আমি যেরকমভাবে বেড়ে উঠেছি, আমাকে যেমন হাতে ধরে আমার মাস্টারমশাই, ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ বা ‘চেতনা’র যাঁরা আমাকে এগিয়ে দিয়েছেন বা সাহায্য করেছেন এগিয়ে চলার, সেই পরম্পরা মেনেই আমরা ‘প্রাচ্য’ তৈরি করেছি। আমাদেরও মনে হয়েছে যে যে পরবর্তী প্রজন্মে যারা ভিন্নভাবে, ভিন্ন ধারায় কাজ করছে, ভাবছে তাদের সামনে নিয়ে আসা দরকার। তাদের থেকে আমাদেরও শেখার অনেক কিছু আছে। এই সময়কালের শিল্পভাবনা, রাজনীতিগত জায়গা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুর মধ্যে যে এই প্রজন্ম বেঁচে আছে প্রত্যেকদিন, যেটা আমাদের প্রজন্মের মতো নয়। তাদের থেকে এই সময়কে জানার একটা আগ্রহ থেকেই মূলত এই ভাবনা। যারা নতুন, অপেক্ষাকৃত নবীন বা এখনও পরিচয়টা অতটা প্রসারিত হয়নি, সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে কোনো কারণে, তাদেরকে আর একটু পরিচিত করা আমাদের মধ্যে, যাতে তাদের কাজগুলো আরও মানুষের কাছে পৌঁছায়। অনেক নতুন নাট্যকাররা এসে নাটক পড়েন, তেমনি অভিনয়ের ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব দাস-কে আমরা পেয়েছি। যখন রেপার্টরিতে তার সময়সীমা শেষ হলো, সে যখন পেশাদার অভিনেতা হিসেবে নিজেকে এই থিয়েটারের মধ্যে প্রেজেন্ট করলো, তখন তার নিজস্ব ক্ষমতা, যোগ্যতা, ডেডিকেশনকে সম্মান না দিলে আমাদের থিয়েটার চর্চার ক্ষেত্রে অন্যায় শুধু হতো না, অপরাধ হতো। তাতে শুধু যে বুদ্ধ’র লাভ হয়েছে বলবো না, সামগ্রিকভাবে বাংলা থিয়েটার একজন অসাধারণ অভিনেতাকে পেয়েছে। আমরা পেয়েছি, প্রাচ্য পেয়েছে। ফলে এই প্রক্রিয়াটা বাংলা থিয়েটার বা সংস্কৃতিচর্চাকে সজীব রাখার জন্য আবহমানকাল ধরে হয়ে এসেছে; আমরা তারই একটা অংশ। হ্যাঁ, ভিন্ন কিছুও হয়েছে সেটা হয়ই সবসময় সবক্ষেত্রে হয়। কিন্তু আমার মনে হয় সেটা ব্যতিক্রম।

ক্যালিগুলা – প্রাচ্য

   প্রশ্ন: নির্দেশক হিসাবে অভিনেতাকে কতটা জায়গা দেন, ডিজাইনকে কতটা জায়গা দেন? সত্যিই কি মনে করেন থিয়েটার ‘অ্যাক্টরস মিডিয়াম’?

বিপ্লব: এটা একটা যৌথ প্রক্রিয়া। অনেকগুলো মাধ্যমের যৌথতার মধ্যে দিয়ে একটা প্রযোজনার চূড়ান্ত বয়ান দর্শকের কাছে পৌঁছয়। সেখানে কে কতটা জায়গা পায় বা পেতে পারে, তা নির্দিষ্ট হয়ে যায় সেই থিয়েটারের বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করে। আমি মূলত প্রসেনিয়ামের কথাই বলছি। এখানে মঞ্চকে যদি আকাশের সঙ্গে তুলনা করি, আকাশে ধ্রুবতারা আছে, তার সঙ্গে আরও অসংখ্য তারা, বৃষ্টি, সূর্য, শরতের মেঘ, পূর্ণিমার চাঁদ আছে। কত বৈচিত্র্য আকাশে অবিরত ঘোরাফেরা করে। এই প্রত্যেকটা অবজেক্টকেই যদি আমি অভিনেতা হিসেবে ধরি, চরিত্র হিসেবে ধরি, তাহলে এই সম্পূর্ণ বিষয়টা নিয়েই তো আকাশ।

সমস্তটাই এক ধরনের সুপরিকল্পিত মধ্যবিত্ত বয়ানের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। থিয়েটারের ভাবনা থেকে যদি কোনো বিস্ফোরণ না ঘটে, তাহলে তার স্পেসের আলাদা বিস্ফোরণ কীভাবে হবে? আলাদা খোঁজ কী করে হবে?

এবার আমি কখন কোনটাকে গুরুত্ব দেবো, সেটা নির্ভর করে আমার মানসিক অবস্থা, আমার প্রাত্যহিক যাপন, আমার শিল্পচর্চা, নান্দনিক বোধ, আরও অনেক কিছুর উপর। চাষি, মহাকাশ গবেষক, রোমান্টিক মানুষ, সকলেই আকাশের দিকে তাকায়, তবে পৃথকভাবে। এই সব দেখাগুলো মিলিয়েই তো একটা আকাশ। থিয়েটারের ক্ষেত্রেও তাই। বিষয়বস্তু অনুযায়ী তার ডিজাইন তৈরি হবে, যদি ‘ডিজাইন’ নামক কোনো শব্দতে আমরা জোর দিই, মানে ডিজাইন যদি আলাদাভাবে কোনো একটা অস্তিত্ব হয় কোনো শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে। আকাশকে যেমন ঢেকে রাখা যায় না, দেখার প্রেক্ষিত আলাদা আলাদা হয়, সেরকম ডিজাইনের ক্ষেত্রেও ওই প্রেক্ষিতগুলো আলাদা আলাদা হয় আর কি। কিন্তু মূল বিষয়টা তো থিয়েটারই। ফলে আলাদা করে ডিজাইনকে কতটা গুরুত্ব দেবো, কতটা অভিনেতাকে ছেড়ে দেবো, এই প্রশ্ন তখনই আসে যখন একজন শিল্পী বা একজন পরিচালক বা একজন অভিনেতা প্রিঅকুপাইড থাকে তার নিজস্ব অস্তিত্বের সংকটের জায়গা থেকে। না হলে এগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয়, এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যেকোনো শিল্পচর্চার, অন্তত থিয়েটারের ক্ষেত্রে।

দায় আমাদেরও – প্রাচ্য

মলয় রক্ষিত একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের। মলয়ের একটি বিশেষ নাটক ভালো না লাগা সম্পর্কে হরিমাধববাবু বলেন এই নাটকে অভিনয়ের সুর, তাল বা টোন নষ্ট হয়ে গেছে। নাটকটিকে তিনি যে সুরে বাঁধতে চেয়েছিলেন, সেটা শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেছে। নাটকটির মঞ্চ, আবহজুড়ে বেজে চলা সুর, অসুস্থ-বন্দি চরিত্রের শরীরী-কিন্তু প্রায় নীরব মৃদুটোনে অভিনয় এবং সেইমতো সংলাপের মৃদু উচ্চারণ- সমস্তই যেন এক অনুচ্চ করুণ সুরে বাঁধা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কিছু বিশেষ অভিনেতার চড়া-সুরে বাঁধা অভিনয় (যা হয়তো রিহার্সালে তারা করেননি) ওই করুণ মৃদু সুরটি বিপর্যস্ত হয়ে যায়। সেই কারণেই এটাকে ‘অ্যাক্টর্স মিডিয়াম’ বলা হয়। অভিনেতার যদি নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পর্কে ভয়ঙ্কর ক্রাইসিস না থাকে, যদি পরিচালকের নিজের ডিজাইনে নিজেকে দেখাবার প্রবণতা না থাকে, যদি আলো, মঞ্চসজ্জা, আরও অন্যান্য যে বিষয়গুলো আছে, প্রত্যেকেই যদি নিজস্ব স্বার্থের বা আইডেন্টিটি-র জায়গা থেকে থিয়েটারকে দেখতে চায় বিষয়টাকে বাদ দিয়ে, তাহলেই এই বিপর্যয়গুলো ঘটে। আর না হলে এগুলো কোনো প্রশ্নই নয়। বাংলার প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা ও নাট্যশিল্পীদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন ওঠেই না। একটা যৌথ শিল্পের ক্ষেত্রে এগুলো তখনই ঘটে যখন মধ্যবিত্তের স্বার্থবাদী যাপন, তার প্রভাব ঐ শিল্পচর্চায় গিয়ে আক্রমণ করে।

প্রশ্ন: বাংলা থিয়েটারে অভিনয়ের মঞ্চ বা অ্যাক্টিং স্পেস নিয়ে সমস্যা আজকের নয়। থিয়েটার বলতে এখনো মানুষ সেই প্রসেনিয়াম স্টেজকেই বোঝে, অল্টারনেটিভ স্পেসের কথা এখনও সেভাবে প্রচলিত হয়নি। যে কটা প্রসেনিয়াম মঞ্চ টিকে আছে সেগুলোর অবস্থাও খুবই খারাপ। এই ক্রাইসিস থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ আছে বলে মনে করেন?

বিপ্লব: ২৫০০ বছর ধরে চলা একটা শিল্পচর্চা, সেটা নিয়ে হঠাৎ করে মন্তুব্য করবো কীভাবে, আমি জানি না। অনেকে বলতেই পারেন, তাঁরা ত্রিকালদর্শী। আধুনিক পৃথিবীতে কলকাতা একটা গ্রামই প্রায়, সেই গ্রামে আমি দিনাতিপাত করে সামান্য থিয়েটার চর্চা করি। অনেক থিয়েটার দেখিনি, জানি না, অনেক স্পেসে কত কাজ হয়, তার সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই। এই সবটা না জেনে অল্প কিছু জেনে এত বড়ো কথা বলা আমার পক্ষে অন্তত সম্ভব নয়। তবুও আমি যেটা বলবো, সেটা হচ্ছে, যে সচল ধারা আমাদের ছিল—পথনাটক, অন্য ধারার—বাদলবাবুর তৃতীয় থিয়েটার, আমাদের প্রসেনিয়াম গ্ৰুপ থিয়েটার এবং উত্তর কলকাতার থিয়েটার। এতগুলো ধারা ৯০-এর দশকেও যে ছিল, সেটা ক্রমশ পাল্টাতে থাকলো। সেগুলোর ক্ষেত্রে শিল্পগত নানারকম অক্ষমতা আছে। যেমন বাদলবাবুর মতো আর একজন স্ট্রং পার্সোনালিটি তৈরি হলো না যে ওই ধারাটাকে বজায় রেখে যাবে এবং একইসঙ্গে বাদলবাবুর সময়কার যে সামাজিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক  অবস্থা, তার পরিপ্রেক্ষিতে যে থিয়েটারটা গড়ে উঠেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই থিয়েটারের বলার ধরন বা বিষয় বিবর্তনে হয়তো কোথাও খামতি থেকেছে। হয়তো অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে সেই অর্থনীতি ভিত্তিক জীবনযাপন এবং শিল্পচর্চা। সেরকমভাবে প্রসেনিয়ামে উত্তর কলকাতার যে বাণিজ্যিক থিয়েটার, সেই থিয়েটারটারও তাদের নিজস্ব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অযোগ্যতা, অক্ষমতা, শিল্পগত দৈন্যতা। এছাড়া বাজার যেহেতু পাল্টাচ্ছে, সেখানে বিনিয়োগ করলে কী হয় না হয়, সেটা জেনে প্রযোজকও কমে গেল, হলগুলো জরাজীর্ণ হলো, মানুষ কনজিউমারিজমের আদলে নিজেকে গড়ে তুললো, আরামপ্রদ হয়ে গেল।

এখন আমাদের মধ্যবিত্ত থিয়েটারের যে মূলধারা, সেটা একটা আরামদায়ক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। একটা হাউজফুল থিয়েটার হলেই, একাডেমি ছেড়ে জি ডি বিড়লায় গিয়ে করে। ফলে যতই প্রতিবাদ থাকুক, থিয়েটার এখন মূলত বিনোদনমূলক। যতই অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট থাকুক, শেষ পর্যন্ত এটা তো বিনোদন। এবার এই বিনোদনের মধ্যে কেউ সিরিয়াস শিল্পচর্চা হয়তো করে, থিয়েটারকে আরেকভাবে দেখার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাজারে যেতে হচ্ছে। সেই বাজারটা একটু সম্ভ্রম নিয়ে থাকে আর কি! মানে সরকারি চাকরি করলে একটা সম্ভ্রম থাকে, কর্পোরেটে চাকরি করলে অর্থ বেশি পাওয়া যায় কিন্তু ভেতরের নৈতিক সম্মানটা অনেক বেশি লাঞ্ছিত হয়। সেরকমই, আমাদের থিয়েটারটা সরকারি চাকরির মতো, একটা সম্মান আছে, একটা সামাজিক মূল্য আছে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমাদের খুব নাম আছে, সম্মান দেয় এখনো। সিরিয়াল বা সিনেমার লোকেরাও এখন থিয়েটার করতে আসছে, যদিও সেটা আগেও ছিল। আগে যেটা স্বাভাবিক ছিল এখন সেটা অস্বাভাবিক, কিন্তু হচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্তের জীবনে একটা সামাজিক মূল্য তো আছেই। যেমন প্রতিবাদেরও একটা বাজার আছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধীতারও একটা বাজার আছে। তেমনই আমাদের থিয়েটারে বিনোদনও একটা বড়ো অংশ, সেটার সঙ্গে আমরা সবাই নানারকমভাবে জুড়ে আছি। তাই অল্টারনেটিভ স্পেস, অল্টারনেটিভ শিল্পচর্চার সমস্ত ক্ষেত্রগুলো যখন রুদ্ধ, তার থেকে থিয়েটার কী করে বাঁচবে? নবারুণদার মতো সাহিত্যিক বা সন্দীপনের মতো সাহিত্যিক এখন আর নেই। আমি কবিদের কথা বাদই দিলাম। তারা তো নেই। যারা আছেন, তারা অত্যন্ত জ্ঞানীগুণী মানুষ, কিন্তু ওই স্পর্ধার জায়গাটা, নতুন কোনো কবিতার ভাষা বা নতুনভাবে কবিতাকে দেখার যে সাহস, সেটা নেই। সুবিমল মিশ্রর মতো মানুষ নেই, দেবেশ রায় নেই। এই যে সাধারণ আত্মসুখী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের শিল্পচর্চার সঙ্গে সঙ্গে এই জোরালো প্রান্তিক প্রায় বিদ্রোহী শিল্পচর্চার কতগুলো ধারাও যে অব্যাহত ছিল, সেইটা থিয়েটারের ক্ষেত্রেও ছিল, বাদলবাবু তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়

ফলে সমস্তটাই এক ধরনের সুপরিকল্পিত মধ্যবিত্ত বয়ানের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। থিয়েটারের ভাবনা থেকে যদি কোনো বিস্ফোরণ না ঘটে, তাহলে তার স্পেসের আলাদা বিস্ফোরণ কীভাবে হবে? আলাদা খোঁজ কী করে হবে? ইন্টিমেট স্পেস, স্পেস স্পেসিফিক থিয়েটার নানারকম হয়, অ্যাডভেঞ্চারের মতো আর কি! মানে শান্তিনিকেতনে গিয়ে বউকে বা মাকে বা বোনকে বা দিদিকে বা প্রেমিকাকে সাঁওতালদের সঙ্গে একটু নাচিয়ে ছবি তোলার মতো বা হঠাৎ করে একদিন অ্যাডভেঞ্চার প্ৰিয় হয়ে কে-টু বেসক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাওয়া বা সান্দাকফু চলে যাওয়ার মতো। যদি প্রথাগত শিল্পচর্চার বাইরে ওটাকে অ্যাটাক করা বা ওটার সঙ্গে সংঘর্ষের জায়গায় না যাওয়া যায়, তাহলে স্পেসের ক্ষেত্রেও কোনো অল্টারনেটিভ ভাবনা আমাদের তৈরি হতে পারে না। যেগুলো আছে সেগুলো সবই প্রথাগত, অর্থনৈতিক ভিন্নতা বা ঝুঁকি না নেওয়া বা অন্যরকম অক্ষমতা থেকে ছোটো খোপে ঢুকে পড়া বা বড়ো খোপে চলে যাওয়া। কিন্তু যে গভীর দর্শন থেকে বাদল সরকার বা শম্ভু মিত্ররা এই থিয়েটার চর্চার ধারাগুলো তৈরি করেছিলেন, সেটার এখন খুব অভাব। তাই থিয়েটার নতুন করে ভাবতে গেলে তার দার্শনিক জায়গা ঠিক হলে তখন স্পেসের ক্ষেত্রে বা দেখানোর ক্ষেত্রে একটা প্রক্রিয়া চালু হতে পারে, নাহলে নয়।

Written by