অর্পিতা ঘোষের সাক্ষাৎকার
বর্তমান বাংলা থিয়েটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাট্যব্যক্তিত্ব অর্পিতা ঘোষ (Arpita Ghosh)। একাধারে নির্দেশক, অনুবাদক, নাট্যশিক্ষক এবং অভিনেতা। তাঁর থিয়েটার যাপন, আগামীকে দেখা, সমাজ-রাজনীতি নিয়ে অবস্থান, সবকিছু নিয়েই বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে কথা বললেন অর্পিতা।
_____________________
প্রশ্ন: থিয়েটারের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে হল? কবে থেকে ঠিক করলেন যে থিয়েটারটাই করবেন?
অর্পিতা: থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয় কীভাবে বলতে গেলে আমার জন্য একটু গণ্ডগোলই হবে। আমি একটা মফস্সল শহরে বড়ো হয়েছি। সেখানে থিয়েটার কোনোদিন দেখিনি, ছোটবেলা থেকে যাত্রাই দেখেছি মূলত। প্রথম যখন কলকাতায় এলাম পড়াশোনা করতে, ক্লাস ইলেভেনে স্কটিশ চার্চ কলেজে, হস্টেলে থাকতাম। হস্টেলে প্রথম আমার এক সিনিয়র দিদি একদিন বললো যে, ‘থিয়েটার দেখতে যাবি?’ আমি থিয়েটার বিষয়টা কী তখন খুব ভালো বুঝতাম না। আমি বললাম ‘কীরকম?’ সেই দিদি বললো যে, ‘শাঁওলি মিত্র আছে, নাথবতী অনাথবৎ।’ শাঁওলি মিত্র নামটার সঙ্গে আমি খুবই পরিচিত ছিলাম রেডিওতে নিয়মিত নাটক শোনার সুবাদে। ওঁর নামটা অসম্ভব পরিচিত ছিল এবং বিশাল ফ্যান ছিলাম শাঁওলি মিত্রের। শাঁওলি মিত্র শুনেই আমি একেবারে নেচে উঠেছিলাম, বলেছিলাম হ্যাঁ, দেখতে যাব। সেই প্রথম আমার থিয়েটার দেখতে যাওয়া। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে (সম্ভবত, শিশির মঞ্চও হতে পারে) সকাল দশটার শো, হস্টেলে থাকতাম বলে বিকেলের শোয়ে যাওয়া যেত না। সেই আমার প্রথম থিয়েটার দেখা, তারপরে নাথবতী আরও একাধিকবার দেখেছি।
শাঁওলি মিত্র আমাদের প্রথম ক্লাসটা নিয়েছিলেন এবং প্রথম ক্লাসে শাঁওলিদি এক ঘণ্টা কথা বলেছিলেন থিয়েটার নিয়ে। ওই এক ঘণ্টার কথা আমার জীবন বদলে দিয়েছে। সেদিন ঠিক করেছিলাম আমি থিয়েটারটাই করব।
চণ্ডালী (বাঁদিকে) নাথবতী অনাথবৎ (ডানদিকে)
এর কিছু পরে আমি চাকরিসূত্রে কলকাতার বাইরে চলে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে নব্বই সাল থেকে নিয়মিত থিয়েটার দেখা শুরু করি। সেটা প্রায় অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তখন প্রচুর থিয়েটার দেখেছি, কিন্তু থিয়েটার করবো সেভাবে কখনও ভাবিনি। আমাদের এক কবি বন্ধু আছেন সংযুক্তা, তার শাশুড়ি ছিলেন স্বপ্নাদি, স্বপ্নাদি ‘অন্য থিয়েটার’এ ছিলেন। ‘অন্য থিয়েটার’ থেকে একঝাঁক মানুষজন, প্রায় সাত-আটজন বেরিয়ে এসে একটা দল তৈরি করেছিলেন। তখন আমাকে একদিন স্বপ্নাদি বললেন, ‘তুই থিয়েটার করবি?’ আমি তখন একটা ব্যবসা করি, প্রিন্টিংয়ের। তো বললাম যে, ‘হ্যাঁ, এখন আমার একটু সময় আছে।’ আমার ধারণা ছিল যে থিয়েটার করতে নিশ্চয়ই সময় প্রচুর লাগে। তারপরে ওখানে যুক্ত হলাম। ওখানে টুকটাক করে কাজ হতে থাকে, বাদশা, মনীষা ওরাও ছিল এই গ্রুপে। তারপরে একটা সময়ে কমলেশ্বর একদিন এলো আমাদের ওই গ্রুপটাতে, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়দের একটা দল ছিল তখন, ‘ফোর্থ ওয়াল’। ওরা একটা থিয়েটার করবে ঠিক করে এবং আমাদের এখানে এসে দু-তিনজনের সঙ্গে কথা বলে। আমরা তিনজন ফোর্থ ওয়ালে থিয়েটার করতে গিয়েছিলাম। আমি, মনীষা, বাদশা—তিনজনে।
সেই থেকে ফোর্থ ওয়ালে থেকে যাওয়া এবং থিয়েটারকে চিনতে শেখা। থিয়েটারে অভিনয় করছি তখন কমলেশ্বর ডিরেকশন দিচ্ছে। এরপর নিরানব্বইয়ের শেষের দিকে, ‘পঞ্চম বৈদিক’ একটা বিজ্ঞাপন দেয়— ‘পঞ্চমবেদ চর্যাশ্রম’। তখন মনীষা আমাকে বলে যে, ‘অর্পিতা, তুই তো থিয়েটারটা করতে চাইছিস? এখানে গিয়ে থিয়েটারটা শেখ। এইটা না শিখলে থিয়েটার করতে পারবি না।’ আমি মনীষার কথা শুনে অ্যাপ্লাই করি, সুযোগ পাই। পঞ্চমবেদ চর্যাশ্রমে এক বছর পূর্ণ হয়, কোর্সটা কমপ্লিট করি। তখন আমাদের এই ফোর্থ ওয়াল দলটায় রেগুলার কাজ হচ্ছিল না, তো আমি পঞ্চম বৈদিকে থেকে যাই।
একটা কথা বলতে পারি যে, পঞ্চম বৈদিকে প্রথম যেদিন ক্লাস করতে গিয়েছিলাম, ফার্স্ট জানুয়ারি, দু-হাজার সাল, শাঁওলি মিত্র আমাদের প্রথম ক্লাসটা নিয়েছিলেন এবং প্রথম ক্লাসে শাঁওলিদি এক ঘণ্টা কথা বলেছিলেন থিয়েটার নিয়ে। ওই এক ঘণ্টার কথা আমার জীবন বদলে দিয়েছে। সেদিন ঠিক করেছিলাম আমি থিয়েটারটাই করব। সেটাই বলা যেতে পারে আমার থিয়েটারে আসার এবং থিয়েটারে থেকে যাওয়ার একটা মূল প্রেরণা।
মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে শাসক দলের বিরুদ্ধে চারটি গরম গরম আওয়াজ দিলেই বা কথা বললেই সেটা রাজনৈতিক নাটক হয়—এটা আমার আগেও বিশ্বাস ছিল না, এখনও বিশ্বাস নেই।
আমোদিত রোদ্দুর
প্রশ্ন: শাঁওলি মিত্র না থাকলে কি আপনার থিয়েটার যাপনটা এরকম হতে পারত? গুরু হিসাবে শাঁওলি মিত্রকে কেমনভাবে পেয়েছেন?
অর্পিতা: শাঁওলি মিত্র না থাকলে আমি শেষ পর্যন্ত থিয়েটার করতাম কিনা, তা আমি নিশ্চিত নই। প্রথমত, অন্যদের জীবনে গুরু কতটা ভূমিকা নেন, গুরু বলতে তারা কী বোঝেন বা সত্যি গুরু এতটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা, অন্যরা কীভাবে ভাবেন আমি জানি না, কিন্তু আমার কাছে গুরু একটা সাংঘাতিক ব্যাপার। শাঁওলি মিত্রের মত একজন গুরু পেয়েছিলাম বলেই আমি থিয়েটারটা করতে পেরেছিলাম, থিয়েটারে থেকে যেতে পেরেছিলাম। আগে ছিল, ব্রহ্মচর্য, গুরুগৃহে বাস করে কাজ শেখা, আমি ঠিক সেভাবেই দু-হাজার সালের শেষ থেকে গুরুগৃহে থেকে কাজ শিখেছি। যাপনে থিয়েটার কীভাবে থাকে, সেটা গুরুকে দেখে শিখেছি। সকাল থেকেই বলা যেতে পারে, চা খেতে খেতেই আমার কাজ শুরু হয়ে যেত। শাঁওলিদি অদ্ভুতভাবে শিখিয়েছেন আমাকে। আমি একদম ক্লাসিক্যাল মিউজিক শুনতে ভালোবাসতাম না। সকালবেলা দুজনে মিলে চা খাচ্ছি, শাঁওলিদি ক্লাসিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট বা ক্লাসিক্যাল ভোকাল চালিয়ে দিতেন। কোনোদিন যশরাজ বাজছে, কোনোদিন রবিশঙ্করের সেতার বাজছে, কোনোদিন সরোদ বাজছে, কোনোদিন ভীমসেন জোশী। আমি খুব মন দিয়ে শুনছি এমন নয়, কিন্তু কান তৈরি হচ্ছিল। কিছুদিন বাদে দেখা গেল, মাস ছয়-আটেক বাদে, আমি একদিন শাঁওলিদিকে সকালবেলা বললাম ‘আজকে ভীমসেন জোশী চালাই?’ শাঁওলিদি বুঝলেন যে এই আমি শুনতে পাচ্ছি, অর্থাৎ আস্তে আস্তে আমার কান তৈরি হচ্ছে। এছাড়া কবিতা নিয়মিত পাঠ করে উনি শোনাতেন। আমার কাজকর্ম সেরে যখন ফিরতাম বা রিহার্সাল করে ফিরতাম (তখন নিয়মিত রানিকুঠিতে অরবিন্দ আশ্রমের ছোট্ট মঞ্চটাতে কাজ শুরু হয়েছে আমাদের) বা হয়তো সেদিন আমাদের রিহার্সাল নেই, শাঁওলিদি রিহার্সাল করছেন, বাড়িতে ‘নাথবতী অনাথবৎ’ বা ‘কথা অমৃত সমান’, আমি সেটা শুনছি, উপস্থিত থাকছি। এই করে করে আমার কান তৈরি হচ্ছে।
অদ্ভুতভাবে উনি আমায় প্রতিটি জিনিস প্রায় হাতে ধরে শিখিয়েছেন। যখন আমি ‘পশু খামার’ করছি, প্রথম বড়োদের নিয়ে নাটক। শাঁওলিদি প্রতিটি পদে পদে আমাকে সাহায্য করছেন। তখনও মিউজিক সম্পর্কে আমার তত ধারণা নেই। শাঁওলিদি সেই মিউজিকের রেকর্ডিংয়ে থাকছেন, থেকে পুরোটা গাইড করছেন। দু-হাজার ছয় সাল থেকে আমি কাজ শুরু করলাম। উনি দু-হাজার ছয়, সাত, আট, নয় – চার বছর পরপর চারটে নাটকে আমাকে গাইড করলেন এবং বললেন যে, ‘আমি আর ডিরেকশনের কাজ করব না, এবার থেকে অর্পিতা করবে’। দু-হাজার দশ সালে যখন আমি প্রথম ঘরে বাইরে করছি, তখন শাঁওলিদি আর রিহার্সালে এলেন না। একদম শো দেখতে এলেন। অদ্ভুত ব্যাপার। উনি ওই রেকর্ডিং-গাইড-টাইড কোনোটাতেই রইলেন না। মানে এই প্রথম উনি আমাকে ছাড়লেন, কাজটা আমি একা করলাম। এগারো সাল গেল, বারো সালে আমি ‘অচলায়তন’ যখন করলাম, শাঁওলিদি শো দেখতে এলেন এবং মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, ‘পঞ্চম বৈদিককে পরবর্তীকালে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা আমি অর্পিতার হাতে তুলে দিলাম’। একজন গুরু হাত ধরে তাঁর শিষ্যকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন শুধু না, এগিয়ে দিলেন এবং একটা সময়ের পরে তাঁকে পৌঁছে দিলেন দর্শকদের কাছে। সত্যি কথা বলতে শাঁওলি মিত্র না থাকলে আমি অন্তত ভাবতেই পারি না, কীভাবে থিয়েটারটা করতাম।
যখন জীবনানন্দ পড়ি, তখন সেই ব্যক্তি অর্পিতা আশপাশের অনেক কিছু থেকে নিজেকে কোথাও একটা সরিয়ে নিতে পারে। এটা খানিকটা আমার গুরুরও শিক্ষা বলা যায়—যে শাঁওলিদি বলতেন, ‘পদ্মপাতার জলের মতো থাকবি, যা কিছু আসবে সবকিছুকে ভিতরে গ্রহণ করবি না। গ্রহণ সেইটুকুই করবি যেটুকু জীবনচর্যায় তোর প্রয়োজনীয় হবে।’
কারুবাসনা
প্রশ্ন: রাজনৈতিক নাটক সম্পর্কে এখন আপনার চিন্তাভাবনা কীরকম? আপনি যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তার বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে যদি কোনো রাজনৈতিক নাটক তৈরি হয়, তখন সেটিকে আপনি কীভাবে দেখবেন?
অর্পিতা: রাজনৈতিক নাটক সম্পর্কে চিন্তাভাবনা কীরকম— এই প্রশ্নটা আমার অদ্ভুত লাগল। রাজনৈতিক নাটক রাজনৈতিক নাটকই এবং রাজনৈতিক নাটক অত্যন্ত দরকারি। রাজনৈতিক নাটক মানে কিন্তু কোনো একটা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মঞ্চে কথা বলা নয়। যদি আপনারা পরপর দেখেন, আমি সবসময়ই রাজনৈতিক নাটকই করে এসেছি। ‘ঘরে বাইরে’ একটা আদ্যন্ত রাজনৈতিক নাটক। ‘অচলায়তন’ও একটা রাজনৈতিক নাটকই বটে, বা দু-হাজার তেরো সালে ‘অস্তমিত মধ্যাহ্ন’ করেছিলাম, প্রত্যেকটিই প্রায় রাজনৈতিক নাটক। শেষ কয়েক বছর, ‘দ্য রেজিস্টেবল রাইজ অফ আর্তুরো উই’ থেকে ‘ভিট্টন’ বা ‘পুলিশ’—প্রত্যেকটা রাজনৈতিক নাটক।
আমার মনে হয় যে রাজনীতিটাকে কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে, এই এখন যেভাবে রাজনীতিকে ভাবা হয়, কতগুলো রাজনৈতিক দলকে ঘিরে রাজনীতি, তা নয়। রাজনীতি তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো কোনো বিষয়। সমাজ, পারিপার্শ্ব, দেশ, সমগ্র পৃথিবী—এই সবটা মিলে কিন্তু একটা রাজনীতি বিচরণ করে। সেই রাজনীতিটা এত ছোটো প্রেক্ষাপট নয়। পৃথিবীতেও যে রাজনীতিটা এই মুহূর্তে চলছে, সেটা একটা খুব গভীর রাজনীতি, যেটাকে আমরা তেমন করে ঠিক এক্সপ্লোর করছি না, বা ধরতে পারছি না বলা যেতে পারে। আমরা রাজনীতিটাকে ছোটো ছোটো রাজনৈতিক দলের মধ্যে ফেলে দিচ্ছি—অমুক দল, তমুক দল, এই দল, সেই দল এবং রাজনীতিটা অ্যাজ় ইফ ভোট বা সেই দলটার বিরুদ্ধে কিছু বলা হলো কিনা… সেটাকে ঠিক রাজনৈতিক নাটক বলে আমি মনে করি না। তার প্রেক্ষাপটটা আরও অনেক বড়ো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবীতে যে রাজনৈতিক বদল ঘটে গেছে, যে সামগ্রিকভাবে বদল ঘটে গেছে এবং ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে পোস্ট-গ্লোবালাইজেশন যে রাজনীতিটা ভারতবর্ষে শুরু হয়েছে—এই পোস্ট-গ্লোবালাইজেশন পিরিয়ডটাকে যদি ধরা হয়, তাহলে বোঝা যাবে রাজনীতিটা কীভাবে বদলাতে বদলাতে আসলে কতিপয় ব্যবসায়ীদের হাতে চলে এসেছে। ওরিয়েন্টেশনটা ওইভাবে হয়ে গেছে রাজনীতির। তাই আমার বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান বা আমার রাজনৈতিক অবস্থান, রাজনীতিতে বিশ্বাস করা—এ বিষয়গুলোকে আমি না এভাবে ঠিক ধরি না। আমার মনে হয় যে এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কোন রাজনীতিটা আমরা করছি বা কোন রাজনীতিটা পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বা আমরা প্রত্যেকে সত্যি কীভাবে পৃথিবীটাকে, আমার দেশটাকে, আমার রাজ্যটাকে, কীভাবে দেখি, কীভাবে দেখতে চাইছি—সবটাই আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে শাসক দলের বিরুদ্ধে চারটি গরম গরম আওয়াজ দিলেই বা কথা বললেই সেটা রাজনৈতিক নাটক হয়—এটা আমার আগেও বিশ্বাস ছিল না, এখনও বিশ্বাস নেই।
আমি কেন থিয়েটার করি এটা যদি আমার কাছে খুব পরিষ্কার থাকে, তাহলে প্রত্যেকে তাদের নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেবেন। এবার এই ‘কেন থিয়েটার করি’টাই আসলে ভীষণ গুলিয়ে গেছে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে।
পশু খামার
‘পশু খামার’ যখন করেছিলাম, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে করেছিলাম। আমি এখনও সেই কথাটাই বলে যাই থিয়েটারে। মানুষ কীভাবে বোঝেন, কীভাবে নেন জানি না। যেহেতু একটা রাজনৈতিক দলে আছি, তারা সেটাকে একটা ঘুরিয়ে ভাবার চেষ্টা করেন। আসলে বিষয়গুলো খুব ছোটো করে ধরা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি যে রাজনীতিটা ওইখান থেকে ধরতে হবে, যেখান থেকে আমাদের অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়। রাজনীতিটা সেই জায়গা থেকে আমি ধরবার চেষ্টা করি। তাই রাজনৈতিক নাটকে আমার সেদিনও বিশ্বাস ছিল, আজও বিশ্বাস আছে। কেউ যদি সত্যিই রাজনৈতিক নাটক করেন, আমি সেটাকে বরাবর অ্যাপ্রিশিয়েট করেছি, এখনও করি।
প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথকে কীভাবে দেখেন এখন? জীবনানন্দকেই বা কীভাবে দেখেন?
অর্পিতা: রবীন্দ্রনাথ তো রবীন্দ্রনাথই। তিনি কোনো ভগবান নন। আমরা তাঁর গান, কবিতা, এগুলোকে যতটা যাপন করেছি বা খানিক উপন্যাস, নাটক, আমরা ততটা তাঁর প্রবন্ধকে নিয়ে যাপন করিনি। আমরা তাঁর লেখাগুলোকে ততটা খুঁটিয়ে পড়িনি। আমরা তো অতীত-বিস্মৃত জাতি, ওইজন্য রবীন্দ্রনাথকে আমরা মালা পরিয়ে রাখতে ভালোবাসি, তাঁকে ধূপ-ধুনো দিয়ে, তাঁরই রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে তাঁকে পুজো করতে ভালোবাসি। কিন্তু তাঁকে আমরা ফলো করি না। আমরা তাঁকে গ্রহণ করেছি বাইরে দিয়ে, অন্তরঙ্গ দিয়ে গ্রহণ করতে পারিনি। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
আর জীবনানন্দ আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন কবি, মানে সবচেয়ে প্রিয় বলা উচিত। ওঁর লেখার মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত চলন আছে, যেটা আমাকে বিষাদগ্রস্ত করে, আমাকে জীবনকে চেনাতে সাহায্য করে, বলা যেতে পারে আমাকে হাত ধরে আরেকটা কোনো পথে নিয়ে যেতে চায়। আমি খুব কম বয়স থেকে জীবনানন্দ পড়ি এবং জীবনানন্দ আমার খুব কম বয়স থেকেই প্রিয়। সেখানটাতে দাঁড়িয়ে ‘কীভাবে দেখেন’ বললে খুব মুশকিল, কারণ এঁদের মাপটা এত বড়ো… আমি নিজে ‘কারুবাসনা’ করেছি বা ধরুন নিরুপম যাত্রা পড়েছি, এর মধ্যে কি কোনো রাজনীতি নেই? এগুলোকে অস্বীকার করার খুব একটা জায়গা নেই। অদ্ভুতভাবে জীবনানন্দ আমাকে একটা অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে যায়। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে যখন জীবনানন্দ পড়ি, তখন সেই ব্যক্তি অর্পিতা আশপাশের অনেক কিছু থেকে নিজেকে কোথাও একটা সরিয়ে নিতে পারে। এটা খানিকটা আমার গুরুরও শিক্ষা বলা যায়—যে শাঁওলিদি বলতেন, ‘পদ্মপাতার জলের মতো থাকবি, যা কিছু আসবে সবকিছুকে ভিতরে গ্রহণ করবি না। গ্রহণ সেইটুকুই করবি যেটুকু জীবনচর্যায় তোর প্রয়োজনীয় হবে।’ সবটা পেরেছি এমন বলব না, তবে চেষ্টা করি। এই চেষ্টাটুকুই হয়তো থেকে যাবে। আমি জীবনে কতটা সফল হলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি আমার জীবনটাকে সত্যিই চালনা করতে পারলাম কিনা ঠিকমতো, বা সত্যিই যে পথে যেতে চেয়েছিলাম সেটাই আমি শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলাম কিনা, হয়তো এটাই আমার ভাবনা থাকবে। চলে যাওয়ার পরে তো মানুষ চলেই গেল, আমার তো আর কিছু থাকবে না।
ভিট্টন
প্রশ্ন: কেন বাংলা থিয়েটার ঘিরে এখনও একটা ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করা গেল না? এখনও কেন থিয়েটারকে সরকারি অনুদানে বাঁচতে হবে?
অর্পিতা: দেখুন, থিয়েটারকে ইন্ডাস্ট্রি করা অত সোজা নয়। তার কারণ হচ্ছে যে আমাদের তো কোনো সে অর্থে প্রযোজক নেই। এবং সারা পৃথিবীতেই যদি দেখেন, সবসময় কিন্তু থিয়েটারকে সাপোর্ট করেছে স্টেট। এর বড়ো কারণ হচ্ছে থিয়েটার সমাজের আয়না। থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে সমাজ নিজেদের চেনে বা রাষ্ট্র নিজেকে চিনতে পারে, রাষ্ট্র নিজেকে দেখতে পায়। তার ভুল-ত্রুটি বা যা কিছু, এটা থিয়েটারের মাধ্যমেই চিহ্নিত হয়। থিয়েটারকে ইন্ডাস্ট্রি ওরকম দুম করে বানিয়ে ফেলা যাবে না। এটা এরকম নয় যে আমি প্রচুর পয়সা খরচ করে একটা থিয়েটার বানালেই সেই থিয়েটারটা বিরাট সাকসেসফুল হয়ে যাবে বা খুব বড়ো বড়ো স্টার এনে চালালেই সাকসেসফুল হবে, এটা কিছুদিন চলতে পারে কিন্তু বেশিদিন চলবে না।
থিয়েটার আসলে বাঁচে নিজের জোরে। এখানে যদি বলা হয় যে থিয়েটার কেন ইন্ডাস্ট্রি হলো না, থিয়েটার থেকে পয়সা কামিয়ে ছেলেমেয়েরা সংসার চালাতে পারে না কেন? আপনাদের বুঝতে হবে, পোস্ট-গ্লোবালাইজেশন পিরিয়ডে কিন্তু সময় অনেক বদলে গেছে। আমরা আমাদের কম বয়সে যে টাকার কথা ভাবতাম, যেটুকু হলে আমাদের চলে যেত, প্রি-গ্লোবালাইজেশন পিরিয়ডে আমাদের যা প্রয়োজন ছিল, এখন মানুষের প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি। যেগুলোকে আমরা লাক্সারি মনে করতাম, সেগুলো এখন আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস হয়ে গেছে। অতএব, সময় পাল্টে গেছে। আর স্টেটের এটা দায়িত্ব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখা, থিয়েটারকে তাদের আয়নার মতো করে ব্যবহার করা। যে রাষ্ট্র কাজে ব্রতী হয় না, সে রাষ্ট্র সম্পর্কে আমি কীই বা বলতে পারি!
প্রশ্ন: এক সময় বাংলা থিয়েটার ভারতকে নতুন ভাবে জাত চিনিয়েছিল। বর্তমান থিয়েটার তার ক্রাফট, গল্প বলার ধরন, অভিনয়, মঞ্চ, আবহে কতখানি ব্যতিক্রম দেশের নিরিখে?
অর্পিতা: বাংলা থিয়েটার, থিয়েটারে বিপ্লব এনেছিল একসময় এবং এখন বিষয়টা একটু বদলে গেছে। এখন হয়তো ক্রাফটের দিকে বেশি নজর আসছে, বলবার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। সময়, সবটাই সময়। কোনটা টিকবে আমরা এখন বলতে পারবো না আজকে দাঁড়িয়ে। যখন ‘নবান্ন’ হয়েছিল বা ‘রক্তকরবী’ হয়েছিল, তখন কেউ জানতো না যে এত বছর পরে ওই থিয়েটারগুলো থেকে যাবে বা এই থিয়েটারগুলো লোকের মুখে মুখে ঘুরবে। যে শিল্প তার সময়কে ছাড়িয়ে যেতে পারে, সেই শিল্পই একমাত্র টিকে থাকতে পারে। অতএব আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আজকের কাজকে চিহ্নিতকরণ করার চেষ্টা করলে ভুল হবে। আমরা হয়তো পরবর্তী সময়ে বুঝতে পারবো। আমাদের বিভিন্ন ধরনের কাজ হচ্ছে এখানে, অনেক রকমের কাজ হচ্ছে। কী থাকবে কী থাকবে না ইতিহাস বলবে। আমরা থাকবো না, কিন্তু পরবর্তী সময়ে, পরবর্তী প্রজন্ম, পঞ্চাশ-একশো বছর পরেও হয়তো যারা পড়াশোনা করবে, রিসার্চ করবে, তারা বলবে যে কী টিকল, কী থাকলো, কী হয়েছিল থিয়েটারে, কোন সময় দাঁড়িয়ে থিয়েটারে কী কাজ হয়েছিল, বা আমরা আমাদের সময় কাজটা করে যেতে পারলাম কি না, বা আমরা আমাদের সময় দাঁড়িয়ে আমাদের সময়টাকে কোথাও চিহ্নিত করে গেলাম কিনা—এগুলো ইতিহাস বলবে। আজকে দাঁড়িয়ে এটার বিচার করা বোধহয় সম্ভব নয়।
অচলায়তন
প্রশ্ন: নতুন যারা থিয়েটার করতে আসছে, তাদেরকে কী কী বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে আসার পরামর্শ দেবেন?
অর্পিতা: নতুন যারা থিয়েটার করতে আসছেন তাদেরকে আমি পরামর্শ দেওয়ার বা জ্ঞান বিতরণ করার কেউ নই। আমার শুধু মনে হয় যে— আমি কেন থিয়েটার করি এটা যদি আমার কাছে খুব পরিষ্কার থাকে, তাহলে প্রত্যেকে তাদের নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেবেন। এবার এই ‘কেন থিয়েটার করি’টাই আসলে ভীষণ গুলিয়ে গেছে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। অনেকে বলেন, অভিনয় নেশার মতো। এ বাদ দিয়েও থিয়েটারের আরও অনেক অনেক বড়ো একটা কাজ আছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় যে থিয়েটার আরও অনেক বড়ো কাজ সমাধান করতে পারে। ‘আমি কেন থিয়েটার করি’—এইটা প্রত্যেকটি মানুষ যারা থিয়েটার করেন, তারা যদি নিজেকে প্রশ্ন করেন এবং তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন, তাহলেই থিয়েটারে আমাদের যাপন টিকে থাকবে। তা না হলে আর পাঁচটা জিনিসের মতন এটাও একটা গয়ংগচ্ছ, এরকম কিছু হয়ে যেতে পারে। আমি আশা করবো যে এরপরেও যারা আসবেন থিয়েটার করতে, তারাও নিশ্চয়ই খুঁজবেন যে তারা কেন থিয়েটার করতে এলেন, অন্য কিছু না করে।