শুধু বিনোদন নয়, পথনাটক চায় সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে যেতে

ছবি : সংগৃহীত

রে নিন ভোটের সময়। সন্ধের মুখে বাড়ি ফেরার সময় দেখলেন পাড়ার মোড়ে কিছু কালো পোশাক পরা অভিনেতারা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে তাদের ইশতেহার অভিনয় করে পৌঁছে দিচ্ছেন ভোটারদের কাছে। অথবা শহরে ঘটে গেছে কোনো নারকীয় ঘটনা। আপনি মিছিলে হাঁটবেন বলে জড়ো হয়েছেন নির্দিষ্ট স্থানে। মিছিল শুরুর আগে কিছুজন প্রায় হাওয়ার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে কিছু বলতে শুরু করে, সেই বলা কথাগুলো এসে বিঁধে যায় বাকিদের মনে, চলতে থাকে অভিনয়। এখন, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বাঙালির কাছে পথনাটক বলতে এই ছবিগুলিই ফুটে ওঠে। কেমন ছিল পথনাটকের পথ চলা? আজ এই ইন্সটাগ্রাম রিল বা ইউটিউব শর্টসের যুগে কোথায়ই বা দাঁড়িয়ে আছে পথনাটক (Street Play)?

পথনাটকের ক্ষেত্রে একটা বিষয় আমাদের প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে, আপাতভাবে পথনাটকের যতটা না বিনোদন মূল্য আছে তার চেয়েও বেশি আছে কোনো বিশেষ বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার দায়। অনেক ক্ষেত্রেই যা রাজনৈতিক। পথনাটক খুবই কম সময়ে তুলনামূলকভাবে অসচেতন দর্শককেও নিজের কাছে টেনে আনতে পারে এবং নাটকের বক্তব্যকে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু পথনাটক অনেকক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে ইস্যুভিত্তিক। এই কারণেই কি পথনাটকের পিছনের দিকে এগিয়ে চলা শুরু?

নয়ের দশকে কলকাতার পথনাটক

পথনাটক খুবই কম সময়ে তুলনামূলকভাবে অসচেতন দর্শককেও নিজের কাছে টেনে আনতে পারে এবং নাটকের বক্তব্যকে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু পথনাটক অনেকক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে ইস্যুভিত্তিক। এই কারণেই কি পথনাটকের পিছনের দিকে এগিয়ে চলা শুরু?

এ-বিষয়ে আমরা কথা বলি নাট্যকর্মী-নির্দেশক সৈকত ঘোষ-এর সঙ্গে। সৈকত বাংলার প্রেক্ষিতে পথনাটকের একটি সার্বিক রূপ আমাদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, “প্রথমত পথনাটকের উৎপত্তি এবং তার বিস্তার কেবলমাত্র বিনোদনের কারণে ঘটেনি। পথনাটক সবসময়েই সামাজিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বহু বছর আগে পথনাটক সম্পর্কে আমরা জেনেছিলাম পানু পাল, উৎপল দত্ত, সাফদার হাসমিদের কাছে থেকে। তার পরবর্তীতে পথনাটক নিজের রাস্তা ধরেই এগিয়ে গেছে। আইপিটিএ-র সময়েও পথনাটক ছিল, আইপিটিএ-র হাত ধরে পথনাটকের একটি উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু পথনাটকের স্টাইলাইজেশন, ডিরেক্টোরিয়ার কনসেপ্ট এবং তার প্রেজেন্টেশন নব্বইয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে পিছনের দিকে যেতে শুরু করে। পথনাটক মানে শুধুমাত্র রাস্তায় দাঁড়িয়ে কালো জামাকাপড় পরে নাটক করা নয়। তার মধ্যে সৃষ্টিশীলতা, ক্রাফট, ডিজাইনেরও সম্পর্ক রয়েছে, কারণ পথনাটকের জন্য কোনো ইলিউশন থাকে না। পথনাটক অনেক বেশি শারীরিক পরিশ্রমের, অনেক বেশি বুদ্ধিমত্তার।”

সৈকত ঘোষের পথনাটক

এ-কথা ঠিক যে, পথনাটকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় অন্যান্য নাটকের তুলনায়, কারণ সেখানে সবটাই প্রকাশ্যে লোকজনের সামনে ঘটে। যার ফলে আলোর সুবিধা, কস্টিউম, মেকআপের সুবিধা এবং সেট-প্রপস খুব বেশি পাওয়া যায় না। এর ফলে যা করতে হয়, অভিনেতার শারীরিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া এবং অভিনেতার কণ্ঠস্বর দিয়েই করতে হয়, চলমান দর্শকদের আটকে রাখতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত শারীরিক ও গলার চর্চা।

নব্বইয়ের পর থেকে যখন নিও-লিবারেল পলিসি আসতে শুরু করে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, বামপন্থা ধাক্কা খেতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে পথনাটকের কনটেন্ট বদল হতে শুরু করে। বলে দিতে হবে না, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রোপাগান্ডা হিসেবে পথনাটক ব্যবহৃত হতে শুরু করে। সৈকত বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী, নব্বইয়ের আশপাশ থেকে ২০১১ পর্যন্ত পথনাটকের ক্ষেত্রে একটি বিরাট বড়ো সমস্যা এসে দাঁড়ায়। তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় ওই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের গুণগান করা। এর ফলে যেটা হয়, নাটকের ডিজাইন, কনটেন্ট, নির্দেশনা কোনো কিছুর দিকেই ঠিকভাবে নজর দেওয়া হয় না। অন্যরা কতটা খারাপ আর আমরা কতটা ভালো, এই বক্তব্য এবং শেষে একটি পতাকা তুলে দেওয়া, এটুকুর মধ্যেই নাটকের কনটেন্ট ঘোরাফেরা করতে শুরু করে।” আগের মতো নিয়মিত নতুন ধরনের পথনাটকের চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এই সময়ে। যদিও এর মাঝে বাংলা তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বহু পথনাটকের দল নিজেদের মতো করে ভালো ভালো কাজ করে গেছে। রক্তকরবীর মতো নাটক পথে হয়েছে। তবে বাংলা তথা কলকাতাকেন্দ্রিক পথনাটকের সমস্যা সেই সময় থেকেই শুরু হয়। যদিও ২০১১ পরবর্তীকালে কিছু পথনাটকের দল আবার নতুনভাবে উঠে আসে।

সৈকত ঘোষের পথনাটক

এখনও কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে গেলে দেখা যায় পথনাটকের একটি নিয়মিত চর্চা তাদের মধ্যে আছে। প্রচুর দল আছে যারা পথনাটকের নতুন ভাষা খোঁজার চেষ্টা করছে। একথা ঠিক, সমাজ এবং নাট্যকর্মী দুই তরফ থেকেই পথনাটকের প্রতি একটা অবজ্ঞা আছে। ‘আমি রাস্তায় থিয়েটার করছি না’-র নাকউঁচুপনা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় থিয়েটার কেন করছি এই ধারণাটা পরিষ্কার থাকলে পথনাটকের আগামী পথ আরও মসৃণ হবে বলে মনে করেন নাট্যকর্মী সৈকত ঘোষ। সারা পৃথিবীর যেকোনো আন্দোলনের, প্রতিবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে পথনাটক আগেও ছিল, আগামীতেও থাকবে। কেবল ইস্যুভিত্তিক না হয়ে গিয়ে যদি একটু ক্রাফটের দিকেও মন দেওয়া যায়, তাহলে আরও ভালোভাবে পথনাটক করা সম্ভব। সৈকত বলেন, “পথনাটক করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মানুষ ভালো নাটক দেখতে চায়।”

বাংলা তথা ভারতীয় পথনাটকের সার্বিক রূপরেখা, শক্তির দিক এবং অক্ষমতার দিক – মোটামুটি একটা আন্দাজ পাওয়া গেল। বোঝা যায় পথনাটকের ক্ষেত্রে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের বিষয়টি সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গত বছর কলকাতা-সহ সারা বাংলায় বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনেও নতুন আঙ্গিকে উঠে এসেছে পথনাটক। তার মধ্যেই একটি উপস্থাপনা ‘আমাদের চিৎকার’। শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য-সহ অনেকে মিলে এটির উপস্থাপনা করে থাকেন। তাঁদেরই মধ্যে একজন দেবপ্রিয়া। দেবপ্রিয়া ঠিক কীভাবে পথনাটক বিষয়টি দেখেন? তাঁর কথায়, “যখন কোনো নাটক প্রসেনিয়াম মঞ্চে অভিনীত হয়, তখন একটি নির্দিষ্ট বা লিমিটেড সংখ্যক দর্শকদের মধ্যে, যারা টিকিট কেটে এসেছেন বা আমন্ত্রণে এসেছেন, কেবলমাত্র তাদের মধ্যেই নিজেদের কথা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পথনাটকের এই জোর আছে, যে মানুষটি কোনোদিনও থিয়েটার দেখেননি বা দেখতে যাবেনও না, যিনি থিয়েটার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সচেতন নন, তাঁর কাছেও আমাদের কথাটা পৌঁছে দেওয়া যায়। পথনাটক কেবলমাত্র আর্ট ফর আর্টসেক নয়, সেটি (বৃহৎ অর্থে) রাজনৈতিক হতে বাধ্য।”

সারা পৃথিবীর যেকোনো আন্দোলনের, প্রতিবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে পথনাটক আগেও ছিল, আগামীতেও থাকবে। কেবল ইস্যুভিত্তিক না হয়ে গিয়ে যদি একটু ক্রাফটের দিকেও মন দেওয়া যায়, তাহলে আরও ভালোভাবে পথনাটক করা সম্ভব।

‘আমাদের চিৎকার’ অভিনীত হয়েছে শহরের নানান প্রান্তিক অঞ্চলে; যেমন বস্তি কিংবা সোনাগাছি। দেবপ্রিয়া বলেন, “উপস্থাপনা শেষ করার পর একজন ভদ্রমহিলা, যিনি হয়তো দীর্ঘদিন দেহব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, এখন বিগতযৌবনা, সেভাবে আর ‘খদ্দের’ আসে না তাঁর কাছে, তিনি আমার হাতটা ধরে কাঁদতে কাঁদতে শুরু করেন ও আমাকে জড়িয়ে ধরেন। এছাড়া এমনও হয়েছে, যৌনকর্মীরা নিজেদের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে রেখে আমাদের নাটক দেখেছেন, আমাদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন। এই মানুষগুলিকে আমরা কখনওই মঞ্চনাটকে পাবো না, এই ইমোশনটা পাবো না।”

আমাদের চিৎকার

সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা হল প্রাচ্য দলের ‘ইনকিলাব’। এই নাটকটির সূত্র দারিও ফো এবং ফ্রাঙ্কা রামে। তৈরি হয় গত বছরই। সময়টা নারী, প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌনতার মানুষদের জন্য সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই চিন্তা থেকেই গড়ে ওঠে ‘ইনকিলাব’। আমরা এই প্রসঙ্গে কথা বলি এই প্রযোজনার, তথা প্রাচ্যের নাট্যকর্মী সোমদত্তার সঙ্গে। সোমদত্তা জানান, “এই প্রযোজনাটিতে কোনো পুরুষ সরাসরিভাবে যুক্ত ছিলেন না। প্রযোজনা তৈরি, ডিজাইন, অভিনয়, সবটাই গঠিত এবং পরিচালিত হয়েছে মেয়েদের মাধ্যমে। মূল লেখার মতো, আমাদের নাটকেও কোনো ‘সুগার কোটিং’ নেই। আমরা নাটকটির মধ্যে দিয়ে সমাজকে একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চেয়েছিলাম।”

“তবুও তো পেঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে”

অনেক পাওয়া না-পাওয়ার এক্কাদোক্কা খেলার মধ্যেও থেকে যায় থিয়েটার, থেকে যায় পথনাটক। থিয়েটার যে কেবল শহুরে বড়ো মানুষদের সন্ধ্যার ক্লান্ত-বিনোদন নয়, সেটি যে একটি ধারালো অস্ত্র, তা প্রমাণ করে পথনাটকই। কিছু বছর আগেও উজ্জ্বয়ন, উড়োতার ইত্যাদি বেশ কয়েকটি দল উল্লেখযোগ্য বেশ কয়েকটি প্রযোজনা রাস্তায় অভিনয় করত। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি যে নাট্যমেলায় আয়োজন করে, সেখানেও পথনাটক স্থান পায়। প্রসেনিয়ামের বাইরে এত রকম ভাবে থিয়েটার হচ্ছে, তাহলে পথনাটক নিয়ে ভাবতে সমস্যা কোথায়!

Written by