তাপস সেন : শতবর্ষে অন্তরঙ্গ আলোর রাজা

আলোর মাধ্যমে মঞ্চে ট্রেন ছোটানো থেকে আইফেল টাওয়ার, তাপস সেন একাই একশো

আলোকচিত্রী- সন্দীপ কুমার

রণ্যের প্রাচীন প্রবাদের মতো কলকাতার বাস-ট্রেনেও একটি প্রবাদ চালু ছিল একটা সময়। ধরুন, হঠাৎ কোনো কারণে বাস বা ট্রামের লাইট যদি জ্বলতে নিভতে থাকে, তাহলে যাত্রীরা অবলীলায় বলে উঠতেন, ‘একি তাপস সেনের আলোক প্রক্ষেপ হচ্ছে না কি?’ সমগ্র ভূ-ভারতের কোনো আলোক প্রক্ষেপণ শিল্পী এতটা প্রবাদপ্রতিম হয়ে ওঠেননি, যতটা তাপস সেন (Tapas Sen) পেরেছিলেন। এই বছর তাপস সেনের জন্ম-শতবর্ষ (Centenary Year of Tapas Sen) পালিত হচ্ছে। একটু খুঁজে দেখা যাক বাংলা থিয়েটার তথা সামগ্রিকভাবে শিল্প জগতের আলোর জাদুকরের জীবনটি কেমন ছিল।

১৯২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অসমের ধুবড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তাপস সেন। বাবা মতিলাল সেনকে কর্মসূত্রে অসম ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল দিল্লিতে, ১১ নম্বর সিকন্দর প্লেসে। ১৯৪১ সালে দিল্লি থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন তাপস। স্কুল জীবন থেকেই থিয়েটারের আলোর প্রতি ঝোঁক ছিল তাপস সেনের, স্কুল পাস করার পরবর্তীতে দিল্লিতে আলোকযন্ত্রী হিসাবে কিছুটা পরিচিতিও তৈরি হয় তাঁর। ১৯৪৪ সালে যখন দিল্লিতে ভারতের গণনাট্য সংঘের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের হয়েই মাস্টারমশাই প্রতাপ সেনের সঙ্গে কাজ করলেন নাটক ভূষণ্ডির মাঠে-তে।

তাপস সেনের যুববেলা

এর পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে কিছু চাকরি করলেও ১৯৪৬ সালে তাপস চাকরি ছেড়ে বোম্বে ও তারপর ১৯৪৭ (মতান্তর ’৪৮)-এ কলকাতায় চলে আসেন। অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন তাপস। না ছিল হাতে পয়সা, না ছিল পাকাপোক্ত বাসস্থান। দিনের পর দিন থেকেছেন টালিগঞ্জের বস্তি, পার্ক সার্কাসের কবরখানার পাশের এসইউসি-র কমিউন, হাজরা রোডের মেসবাড়িতে। রুমমেট হিসেবে পেয়েছেন বংশীচন্দ্র গুপ্তের মতো ব্যক্তিত্বকে, আবার পেয়েছেন মৃণাল সেনকেও।

১৯৪৯-৫০ সালে ঋত্বিক ঘটকের জ্বালা নাটকে প্রথম এককভাবে আলোকপরিকল্পনা করলেন তাপস। প্রায় সেই সময় থেকেই, অর্থাৎ ১৯৪৯-এ বহুরূপীর প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই শম্ভু মিত্রের সঙ্গে ছিলেন তাপস সেন। রক্তকরবী, চার অধ্যায়-সহ পরপর প্রযোজনায় শম্ভুর সঙ্গে কাজ করতে থাকলেন। রক্তকরবীর সময়েই মঞ্চপরিকল্পনার ভার পেলেন খালেদ চৌধুরী। এর পরবর্তীতে বহুরূপীতে একের পর এক প্রযোজনায় চলতে লাগলো তাপস-খালেদ যুগলবন্দি।

উৎপল দত্তের ‘সাংবাদিক’ নাটকে অভিনেতার মানসিক অবস্থার সঙ্গে রেডিওর সিগন্যাল লাইটের কমা-বাড়া দেখিয়ে চমক লাগিয়ে দেন তাপস সেন। আবার ‘সেতু’ নাটকে মঞ্চে ট্রেন ছুটিয়ে দেওয়াই হোক বা ‘অঙ্গার’ নাটকে কয়লা খনিতে জল ঢুকে শ্রমিকদের মৃত্যুর দৃশ্যই হোক, সবকিছুই সফল হয়ে উঠেছে একমাত্র তাপস সেনের জন্যই।

শম্ভু মিত্রের সঙ্গে কাজ করার পরবর্তীতে তাপস সেনের সঙ্গে আলাপ হয় উৎপল দত্তের। তাপস যুক্ত হয়ে পড়েন উৎপল দত্তের লিটল থিয়েটার গ্রুপের (এলটিজি) সঙ্গে। উৎপল দত্তের ‘সাংবাদিক’ নাটকে অভিনেতার মানসিক অবস্থার সঙ্গে রেডিওর সিগন্যাল লাইটের কমা-বাড়া দেখিয়ে চমক লাগিয়ে দেন তাপস। তবে কেবলমাত্র এটুকুতেই থেমে থাকেননি তাপস সেন। ‘সেতু’ নাটকে মঞ্চে ট্রেন ছুটিয়ে দেওয়াই হোক বা ‘অঙ্গার’ নাটকে কয়লা খনিতে জল ঢুকে শ্রমিকদের মৃত্যুর দৃশ্যই হোক, সবকিছুই সফল হয়ে উঠেছে একমাত্র তাপস সেনের জন্যই।

ভূশণ্ডীর মাঠে – তাপস সেন

তাপস সেনের সংগ্রহে যে প্রচুর দামি দামি আলোর ইকুইপমেন্ট বা যন্ত্রপাতি ছিল তা নয়, সাধারণ বনস্পতির টিন কেটে বা খুব সাধারণ কোনো সরঞ্জাম দিয়ে তিনি যে আলোর প্রতীকী চিত্র তৈরি করতেন তা দামি আলোর থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। সেই আলোগুলোর নামও ছিল খুব চমকপ্রদ – দুধের বালতি, ইকড়ি মিকড়ি, ইঁদুরকল। ‘যখন একা’ নাটকে একটি সাধারণ বেতের মোড়াকে একটি লাইট সোর্সের সামনে ঘুরিয়ে তাপস সেন কী অদ্ভুত আলোর ডিজাইন তৈরি করেছিলেন, তা বিভাস চক্রবর্তীর লেখায় পাওয়া যায়। কেবল মঞ্চে রেল ছোটানো, কয়লা খনিতে জল ঢোকা বা যুদ্ধ বিমান থেকে বোম পড়ার মতো তাক লাগানো আলোক পরিকল্পনাই নয়, বাস্তবধর্মী নাটকে কতটা সংযমের সঙ্গে তাপস সেন আলোক পরিকল্পনা করতেন, তার কথাও লিখেছেন বিভাস চক্রবর্তী। ‘চাকভাঙা মধু’ নাটকে বিকেলের আলো কোন অ্যাঙ্গেল থেকে কীকরে পড়লে বাস্তবসম্মত লাগবে বা মালসায় কয়লার তলায় কীভাবে আলো রাখলে সেটা গনগনে আগুনের মতো লাগবে সেগুলি নিপুণ দক্ষতায় সাজিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শম্ভু বা উৎপলের পরে তাপস সেন সবথেকে বেশি যদি কারোর সঙ্গে কাজ করে থাকেন, সেটি বিভাস চক্রবর্তীর সঙ্গেই।

৯৮৫ সালে প্যারিসে ভারত উৎসবে আইফেল টাওয়ারের গায়ে লেগেছিল তাপস সেনের আলোর আঁচ। এছাড়াও বিদেশের মাটিতে মস্কো, লেনিনগ্রাদ, তাসখন্দেও দেখা গিয়েছিল তাপস সেনের আলো।

তাপস সেন রাজনৈতিক দর্শনের দিক দিয়ে ছিলেন আদ্যপান্ত বামপন্থী। যদিও প্রথম দিকে তিনি মূল সিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত না হয়ে এসইউসি-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে যা হোক, শিল্পীর রাজনৈতিক চেতনা শিল্পের মধ্যে দিয়ে বেশি প্রকাশিত হয়, তাপসের ক্ষেত্রেও তার অনথ্যা হয়নি। ১৯৬৪ সালে, যে বছর কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে সিপিআই এবং সিপিআইএম পৃথক হয়ে যায়, সেই বছরেই উৎপল দত্ত মঞ্চে নিয়ে আসেন এক আস্ত জাহাজ। নৌবিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় এক বামপন্থী নাটক ‘কল্লোল’। জাহাজ তৈরি করেন সুরেশ দত্ত। আলো অবধারিতভাবে তাপস সেন। সেই সময় বাংলায় কংগ্রেস সরকার। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। অ্যান্টিএস্টাব্লিশমেন্ট অবস্থানের জন্য গ্রেফতার হলেন উৎপল দত্ত। সকল প্রথম শ্রেণির দৈনিকে বন্ধ করে দেওয়া হল কল্লোলের বিজ্ঞাপন। তখন তাপস সেন একটি স্লোগান দিয়েছিলেন, যে স্লোগানটির একটি অংশ পরবর্তীতে বাংলা রাজনৈতিক জগতেও বহুল প্রচলিত হয়ে পড়ে। তাপস সেন স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘কল্লোল চলছে চলবে’। এই স্লোগানের উপর ভর করেই সেই সরকারবিরোধী অবস্থাতেও মিনার্ভায় কল্লোলের হাউজফুল শো হয়।

বিভাষ চক্রবর্তীর মাধব মালঞ্চী কইন্যা নাটকের মঞ্চে আলো দেখাচ্ছেন তাপস সেন

তবে এত কিছুর পরেও বলতে হয়, তাপস সেনকে কেবলমাত্র থিয়েটারের আলোক প্রক্ষেপণ শিল্পী হিসাবে দাগিয়ে দিলে সেটা সবথেকে বড়ো ভুল হবে। তাপস সেনের আলোর ব্যাপকতা কেবল বাংলা রঙ্গমঞ্চে ছড়িয়ে ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারত তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তিনমূর্তি ভবন, সবরমতী আশ্রম, গোয়ালিয়র দুর্গ, চুনার দুর্গ, পুরানা কিল্লা, দেওয়ান-ই-আমে-সহ আরও অনেক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য সেজে ওঠে তাপসের আলোয়। ১৯৮২-তে দিল্লির সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়ামে এশিয়াড গেমসের উদ্বোধনে ছিল তাপস সেনের আলো। তবে এই লিস্টে সবথেকে বড়ো নাম অবশ্যই আইফেল টাওয়ার। ১৯৮৫ সালে প্যারিসে ভারত উৎসবে আইফেল টাওয়ারের গায়ে লেগেছিল তাপসের আলোর আঁচ। এছাড়াও বিদেশের মাটিতে মস্কো, লেনিনগ্রাদ, তাসখন্দেও দেখা গিয়েছিল তাপস সেনের আলো। ২০২০-তে নতুন আলোকসজ্জা সেজে ওঠার আগে পর্যন্ত হাওড়া ব্রিজে যে বেগুনি এবং হলুদ আলোর খেলা আমরা দেখতে পেয়েছি বহুদিন, মৃত্যুর আগে ডিজাইন করে যাওয়ার সেটিই সম্ভবত তাপস সেনের শেষ বড়ো কাজ। তবে তিনি সেই কাজটি শেষ করে যেতে পারেননি, তাপসের মৃত্যুর পর সেই কাজটি শেষ করেন তাঁর ছেলে জয় সেন। অন্যদিকে নাচের মঞ্চে তাপস কাজ করেছেন বালকৃষ্ণ মেনন, অনাদিপ্রসাদ, বৈজয়ন্তীমালা, বিরজু মহারাজ, বালা সরস্বতী, মঞ্জুশ্রী ও রঞ্জাবতী চাকি সরকার, মৃণালিনী সারাভাই এবং হেমা মালিনীর সঙ্গে। সিনেমার ক্ষেত্রে মৃণাল সেন, ভি শান্তারাম, তপন সিংহ, অপর্ণা সেন, অর্ধেন্দু চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

নিজের জীবনকালে বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন তাপস সেন। ১৯৭২ সালে পান এশিয়ার শ্রেষ্ঠ লাইট ডিজ়াইনার-এর স্বীকৃতি। ১৯৭৪-এ পান সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। ১৯৯২ সালে দীনবন্ধু পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ সরকার)। ২০০৫ সালে ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক তাঁকে এমেরিটাস ফেলো হিসাবে সম্মানিত করে।

বিভাষ চক্রবর্তীর মাধব মালঞ্চী কইন্যা নাটকের আলো

শেষ দিনগুলো খুব যে সুখের কেটেছিল তাপস সেনের, তা নয়। কাজ করতে চাইতেন কিন্তু শারীরিক অক্ষমতার জন্য পুরোদমে কাজ করতে পারতেন না, শরীরে ঝুলতো ক্যাথেটার, ছিল আরও অনেক শারীরিক সমস্যা। পরিবারগতভাবে অনেক ধাক্কাও খেয়েছেন, একের পর এক চলে যেতে দেখেছেন কাছের বন্ধুদের। ২৮ জুন ২০০৬, ২৬ এইচ, নাকতলা লেনের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আলোর জাদুকর।

বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রে উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ তাপস সেন বা খালেদ চৌধুরী। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, থিয়েটার সার্বিকভাবেই একটি কালেক্টিভ আর্ট ফর্ম। কেবল একজন অভিনেতা অথবা একজন নির্দেশক খুব তাত্ত্বিক স্তরের কোনো থিয়েটার করতে পারলেও আমরা যাকে সম্পূর্ণ থিয়েটার হিসেবে দেখি, তা আলো বা মঞ্চ ছাড়া হয়তো সেইভাবে সম্ভব নয়। সেইক্ষেত্রে অনন্য তাপস সেন, অনন্য তাঁর প্রবাদপ্রতিম আলো। যখন আকাশে মেঘ করে, আবার মেঘ হালকা ফাঁক হয়ে তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে সরু অথচ তীব্র আলোর রেখা, তখন একবারের জন্য হলেও মনে হয় আকাশে বসে মেঘকে ঠিকভাবে অ্যারেঞ্জ করে সূর্যটাকে ডিমার দিয়ে চালাচ্ছেন তাপস সেন। কী, মনে হয় না?

_____ 
তথ্যসূত্র:
১) Let There Be Light : A Documentary on  Shri Tapas Sen
২) মঞ্চ জুড়ে যেন কবিতা, ছন্দে মগ্ন আলোর তাপস/ আনন্দবাজার পত্রিকা/ ১০ অগাস্ট ২০১৯
৩) ‘চলছে চলবে’ স্লোগানের সৃষ্টিকর্তা তাপস সেনকে একজন জেনারেলের মতো যুদ্ধ পরিচালনা করতে দেখেছি/ লেখক- বিভাস চক্রবর্তী/ সংবাদ প্রতিদিন রোববার.ইন/ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

Developed by DXDasia