
টেরাকোটার কাজ মুগ্ধ করে পর্যটকদের
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সদর তমলুক। সেই প্রাচীন তাম্রলিপ্ত শহরে রয়েছে বর্গভীমা দেবীর মন্দির। তমলুক ছাড়িয়েও চারপাশের বিশাল অঞ্চলে তাঁর প্রসিদ্ধি। লোকজনের বিশ্বাস, দেবী জাগ্রতা। প্রাণভরে কিছু চাইলে মা নাকি ফেরান না। দেবীর মন্দির ওড়িশি স্থাপত্যের আদলে তৈরি। উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। দেউল রীতির এই মন্দিরে টেরাকোটার কাজ মুগ্ধ করে রসিকজনকে। মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথরে নির্মিত দেবীর মূর্তি বিরাজ করছে। মা এখানে পূজিতা হন ভিন্ন ভিন্ন রূপে। কখনো তিনি কালী, কখনো দুর্গা, কখনো বা জগদ্ধার্থী। ভীমরূপা এবং ভৈরব নামেও দেবী পরিচিত। তবে মন্দিরের বিগ্রহ যেহেতু কালিকারূপিনী, তাই কালীপুজোতেই এখানে ভক্তসমাগম হয় সব থেকে বেশি।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই মন্দির ধ্বংস করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেম কালাপাহাড়। মন্দির ভাঙতে ব্যর্থ হন। গবেষকরা বলেন, বর্গভীমা দেবী মন্দির হাজার বছরেরও পুরোনো। ভক্তরা এটিকে একান্ন পীঠের অন্যতম বলে মনে করেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে যখন সতীর দেহ খণ্ডিত হয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছিল, এখানে নাকি এসে পড়েছিল সতীর বাম গোড়ালি। তবে এই নিয়ে মতভেদ আছে। তমলুকের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ময়ূখ বংশের এক রাজা।
জনশ্রুতি আছে, মহাভারতের যুগে ময়ূখ বংশের রাজা ছিলেন তাম্রধ্বজ। তাঁর প্রাসাদে রোজ জ্যান্ত শোল মাছ দিয়ে যেত এক জেলে-বৌ। যতই ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক না কেন, তার দেওয়া মাছ সব সময়েই জ্যান্ত থাকত। এতে রাজা অবাক হতেন। একদিন তিনি জেলে-বৌকে চেপে ধরলেন। সে জানালো, জঙ্গলের গভীরে একটা কুয়ো রয়েছে। সেই কুয়োর জল ছেটালে মরা শোল জ্যান্ত হয়ে যায়। রাজা চললেন সেই কুয়োর সন্ধানে। সেখানে গিয়ে রাজা এক দেবীমূর্তি দেখতে পান। ওই জায়গাতেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন রাজা তাম্রধ্বজ। এই মন্দিরের সঙ্গে কৈবর্ত বা জেলে সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা জানা যায়। সম্ভবত, প্রথমে বর্গভীমা দেবীকে জেলেরাই পুজো করতেন।
দেবী বর্গভীমা
বেশ কয়েকজন পণ্ডিত দাবি করে থাকেন, আদতে এই মন্দিরে উপাসনা করতেন বৌদ্ধরা। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় রাজেন্দ্রলাল গুপ্ত এটিকে বৌদ্ধ মন্দির বলে উল্লেখ করেছিলেন। মন্দিরের আশেপাশে অনেকগুলো খুব পুরোনো ছোটো ছোটো ঘর পাওয়া গেছে। সেগুলো প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের বাসগৃহ হতে পারে। বৌদ্ধশাস্ত্রে ‘বজার ভীমা’ নামে এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। হয়তো সেই বজার ভীমাই আসলে বজ্রভীমা। একদল গবেষক বিশ্বাস করেন, বাংলা থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করলে এই মন্দির এক সময়ে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। পরে কোনো ধনী ব্যক্তি এই মন্দিরের সংস্কার করেন। অনেকে বলেন, এই মন্দিরে পূজিতা হতেন চণ্ডীতন্ত্রের ভীমাদেবী। স্থানীয় মানুষরা বলে থাকেন, তমলুকের এই দেবী ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ – এই চতুর্বর্গ দান করেন বলেই তাঁর নাম বর্গভীমা।
তথ্যঋণ – দীপক সেনগুপ্ত, কিরণ মান্না, সৈকত মাইতি।

