প্রতাপচন্দ্র বেড়ে উঠেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহের তত্ত্বাবধানে
কে জানে, এ সময়েরই গুণ, নাকি মানুষগুলোই সম্পূর্ণ আলাদা জলমাটিতে গড়া। অন্তত আজকে দাঁড়িয়ে কোনো সাধারণীকরণ খুঁজে বের করা বড়ো মুশকিল। আর এই সময়টার সঙ্গেও এতটা অমিল, যে উনিশ শতককে কোনোভাবেই আজকের চোখ দিয়ে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ করা যায় না। একটা বহুফসলি সময় তো বটেই। ম্যাজিকের মতোও খানিক। একজন ‘অতিসাধারণ’ মানুষ, একদিন ঠিক করলেন, মহাভারতের ইংরেজি অনুবাদের ব্যবস্থা করবেন, আর তা প্রকাশেরও দায়িত্ব নেবেন। এমনি ভাবনার জোর যে, মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে উজিয়ে এল শুভেচ্ছা। দেশে বিদেশে ধন্য ধন্য রব হল। এক ‘সামান্য’ মানুষ হয়ে উঠলেন অসামান্য প্রকাশক। তার নাম প্রতাপচন্দ্র রায়। যদিও স্মৃতির বোঝা হালকা করতে গিয়ে এই অপূর্ব প্রকাশককেও আমরা আর তেমন মনে রাখিনি।
প্রতাপচন্দ্র বেড়ে উঠেছিলেন বা গড়ে উঠেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহের তত্ত্বাবধানে। তাঁর আসল বাসা ছিল বর্ধমানের সাঁকোগ্রামে। পিতা হতদরিদ্র। সদ্যজাতর দেখভালের দায়িত্ব নিতে একেবারেই অক্ষম। তাকে তুলে দেওয়া হয় গ্রামেরই এক বিধবার কোলে। কৃষ্ণমণি প্রতাপচন্দ্রের লালনপালনের দায়িত্ব নেন। কিন্তু তাঁর নিজের অবস্থাও খুব সচ্ছল ছিল না। লোকের বাড়িতে কাজকম্ম করে দিন গুজরান হত। প্রতাপচন্দ্রকে পাঠশালায় ভরতি করেছিলেন তিনি। কোনোভাবে সেখান থেকে কলকাতায় এসে কালীপ্রসন্ন সিংহের স্নেহদৃষ্টি লাভ করেছিলেন প্রতাপচন্দ্র। তখন তাঁর ষোলো বছর বয়স। কালীপ্রসন্নর বাড়িতে ঠাঁই মিলেছিল। মিলেছিল অপার স্নেহ। সিংহীবাড়ির একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী প্রতাপ। কালীপ্রসন্ন তখন মহাভারত অনুবাদ করেছেন। সে অনুবাদ দেদার বিলোচ্ছেন। বিনামূল্যে। মহাভারতের অমৃতকথা সংগ্রহ করতে সিংহবাড়ির দরজায় সকাল সন্ধে ভিড় জমে। কেউ পায়, কেউ পায় না। প্রতাপ দেখতেন, মহাভারতের নাগাল না-পাওয়া অনুরাগীদের হতাশ চেহারা।
ইতিমধ্যে অনুরাগীদের আরো কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন কালীপ্রসন্ন। সিংহবাড়ির সিংহদুয়ার থেকেও পাততাড়ি গুটোতে হল প্রতাপ রায়কে। প্রতাপ রায় চিৎপুর রোডের ওপর নর্মাল স্কুলের গায়ে দোকান দিলেন। ছোটো দোকানটিতে মিলত বাল্যশিক্ষা, শিশুবোধকের মতো কিছু শিশুপাঠ্য বই। সঙ্গে শ্লেট খাতা পেন্সিল ও বিস্কুট। আজও স্কুল-লাগোয়া অনেক দোকানের মতোই। বিয়ে করলেন প্রতাপ। নতুন জীবনের হাত ধরে নতুন ভাবনাও দেখা দিল। মহাভারত ছাপবেন তিনি। কালীপ্রসন্ন সিংহের আমলে যারা মহাভারত থেকে বঞ্চিত হলেন, তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এই মহান গাঁথা৷ ১৮৬৯ সাল, এমনই জুন মাস। প্রকাশিত হল মহাভারতের প্রথম খণ্ড। পরপর সাত বছরে বাকি পুরোটাই। মূল্য রাখা হল বিয়াল্লিশ টাকা। যথারীতি মহাভারত হুহু করে নিঃশেষ হতে লাগল। প্রতাপচন্দ্রের জয়জয়কারের সেটা সূচনা।
এরপর পত্নীবিয়োগ। সংসারে আর মন নেই তাঁর। বইপ্রকাশও আপাতত স্থগিত। একমাত্র কন্যার বিবাহ দিয়ে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন৷ সেখানে মহাভারতের সুখ্যাতি শুনেই হোক বা নতুনভাবে ভাবনার অবসর পাওয়ার জন্যেই হোক, ঠিক করলেন নতুনভাবে মহাভারত বের করতে হবে। আর বিনামূল্যে তার বিতরণ চলবে। দেশের কথা জানতে মানুষকে অবশ্যই পড়ে ফেলতে হবে মহাভারত। দরকার পড়লে একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করবেন তিনি। কিন্তু এই বিনামূল্যে বিতরণে তো অর্থ দরকার প্রচুর। প্রতাপের এই উদ্যোগের কথা জানাজানি হল দেশের সর্বত্র। প্রতাপচন্দ্র স্থাপন করলেন, ‘দাতব্য ভারত কার্যালয়’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ৩৬৭ নম্বর, আপার সার্কুলার স্ট্রিট। সেখানে সাহায্যের হাত বাড়ালেন কাশিমবাজারের মহারানি স্বর্ণময়ী, পুটিয়ার শরৎসুন্দরী। এমনকি হায়দ্রাবাদের নিজাম। খবর রটে গেল সাহেবি মহলে। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির ডক্টর রস্ট, ম্যাক্সমুলার সাহেব, স্যার এডুইন আর্নল্ড প্রশংসায় ভরিয়ে তুললেন প্রতাপচন্দ্রের এই প্রতিষ্ঠানকে। সাত বছরে দাতব্য ভারত কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছিল মূল সংস্কৃত মহাভারতের মোট তিনটি সংস্করণ। বাংলায় চারটি সংস্করণ। হরিবংশ একটি সংস্করণ।
এরপর প্রতাপচন্দ্রের মাথায় আসে ইংরেজি সংস্করণের কথা। প্রায় দু লক্ষ শ্লোকের মহাভারতকে একশোটি খণ্ডে প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। ডিমাই অক্টেভো দশ ফর্মায় এক-একখানা খণ্ড। ম্যাক্সমুলার প্রথম অধ্যায় বা উপক্রমণিকার একটি অনুবাদ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রতাপচন্দ্রকে। তাঁর এক জার্মান ছাত্র, স্যার এডুইন আর্নল্ড, পণ্ডিত দুর্গাচরণ, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন গ্র্যাাজুয়েট সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৮৩ সালের ১৮ই মে প্রকাশিত হয় মহাভারতের ইংরেজি অনুবাদের প্রথম খণ্ড। এদেশের ইতিহাসে এই ঘটনা অবশ্যই স্মরণীয়। ১২৫০ কপি ছাপানো হয়েছিল। তারমধ্যে ২৫০ কপি এদেশের গণ্যমান্যদের আর ৩০০ কপি এদেশের শাসনকর্তাদের দেওয়া হয়েছিল।
এই উদ্যোগ ক্রমশ প্রসারিত হয়। কর্নেল নেভিল চেম্বারলেন থেকে শুরু করে রানি ভিক্টোরিয়া প্রত্যেকেই অভিবাদন জানাতে থাকেন প্রতাপ রায়কে। বিদ্যাসাগর, শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্তরাও প্রতাপ রায়ের জয়জয়কারে রত। মহাভারতও পৌঁছে যেতে লাগল দেশের জেলায় জেলায়। বিদেশেও।
৯৪টা খণ্ডে মহাভারত প্রকাশের পর ১৮৯৫ সালের ১০ই জানুয়ারি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন প্রতাপ রায়। পরে তাঁর দ্বিতীয় পত্নী সুন্দরীবালা পরবর্তী খণ্ডগুলি প্রকাশ করেন। ১৮৯৯ সালের জুলাই মাসে প্রকাশ পায় শততম খণ্ডটি।
কলকাতা শহর এরপরে আরো অনেক বই, পত্রপত্রিকা বা অনুবাদ প্রকাশের সাক্ষী থেকেছে ঠিকই। কিন্তু সেদিন যেভাবে একটি অনুবাদ প্রকাশকে ঘিরে দেশবিদেশে উন্মাদনা ছড়িয়ে ছিল, তা বিরল তো বটেই। তাছাড়া সমাজে লেখকের ভূমিকা, শিল্পীর ভূমিকার কথা আমরা জানি, সেগুলো নিয়ে চর্চাও সুপ্রচুর। কিন্তু প্রকাশকেরও যে এমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে- তা বাস্তবিকই আড়ালে থেকে যায়। জহুরির জহর চেনার মতো করে প্রকাশককেও হয়তো চিনে নিতে হয় এমনকিছু সাহিত্য। যা সত্যিই যুগান্তকারী, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। সেদিক থেকে বিচার করলে প্রতাপচন্দ্র রায় আদর্শ জহুরি প্রকাশক।
ঋণ : ‘কলকাতা’- শ্রীপান্থ।