পুরুলিয়ার চরণ পাহাড়ি কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলমান

হিন্দু-মুসলমান সম্মিলনের আশ্চর্য নিদর্শন এই মন্দির

পুরুলিয়ার নাম করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোটো-বড়ো টিলা আর পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা লাল মাটির এক রূপকথা। সেখানে আদিবাসীরা মনের আনন্দে গান গেয়ে বেড়ান, শহুরে মানুষও সেখানে পৌঁছলে মনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা খেপা বাউলকে জাগিয়ে তোলেন। কিংবা বলা যায়, পুরুলিয়ার স্বর্গীয় মায়ায় সেই বাউল জেগে ওঠে নিজেরই খেয়ালে। শিমুল-পলাশের জঙ্গল ভেদ করে ঢিমে তালে নদী বয়ে চলেছে, তার জল স্পর্শ করলে শহুরে ক্লেদ দূর হয়ে যায় এক লহমায়। ছৌ-এর আঙ্গিকে ধরা থাকে জীবনের গূঢ় সত্য – পুরুলিয়া আর ছৌ যেন সমার্থক।

তবে, এসবের বাইরেও পুরুলিয়ার আরেক রূপ আছে, আম-বাঙালি টুরিস্টের কাছে তার প্রচার খুব একটা পায়নি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন এক আশ্চর্য নিদর্শন পুরুলিয়াতে দেখা যায়, শুধু বাংলা কেন, সারা পৃথিবীতেই এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। এই জেলার পুঞ্চা থানা এলাকায় রয়েছে এক কালীমন্দির, যার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলমান পুলিশ অফিসার। এখনো সেই মন্দিরের পুজোয় হিন্দু-মুসলান নির্বিশেষে সবাই চাঁদা দেন। প্রতি বছর কালীপুজোর সময় দূর-দূরান্ত থেকে সহস্রাধিক ভক্ত জমায়েত হন সেখানে।পুঞ্চা থানার এক ওসি ছিলেন জিটি লতিফ। কথিত আছে, স্বপ্নে তাঁকে দেখা দিয়েছিলেন মা কালী। দেবী আদেশ দিয়েছিলেন মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। পরের দিন সকালে হাঁটতে বেরিয়ে তিনি এক পাহাড়ের চূড়ায় কালো পাথরের ওপর দেবীর পায়ের ছাপ দেখতে পান। তখন চারপাশের খান কুড়ি গ্রামের মানুষকে খবর দেন তিনি। সবাই মিলে সেই পাহাড়ের চূড়ায় এক মিলিটারি ক্যাম্পে মা কালীর আরাধনা শুরু করেন।

শুরুর দিকে ছোট্ট মাটির কুঁড়ে ঘর বানিয়ে দেবীর আরাধনা করা হত। তারপর বাংলা ১৩৫৭ সনে জিটি লতিফ সেখানে এক মন্দির গড়ে তোলেন। হিন্দু-মুসলামান নির্বিশেষে এলাকার সাধারণ মানুষেরাও মন্দির নির্মাণের কাজে সামিল হন। বাংলা ১৪০৩ সনে মন্দিরটিকে পরিবর্ধন ও সংস্কার করেন পুঞ্চা থানার তখনকার ওসি সমর কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের একদিকে লেখা আছে, “যত মত তত পথ”। আরেকদিকে লেখা, “যথা ধর্ম তথা জয়”। নিচ থেকে পাহাড়ের ওপর মন্দির পর্যন্ত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য সিঁড়ি আছে। চরণ পাহাড়ি কালীমন্দিরে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে পুজো এবং ভক্তদের আনাগোনা। লোকে বিশ্বাস করে, এখানে মানত করলে দেবী নাকি ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। হিন্দু-মুসলমান সবার কাছেই এই মন্দির এক তীর্থস্থান।

ছবিসূত্র – ফেসবুক  

 

Developed by DXDasia