কথা ছিল, সত্যজিতের চিত্রনাট্যে ‘ঘরে-বাইরে’ পরিচালনা করবেন হরিসাধন দাশগুপ্ত

হরিসাধন দাশগুপ্ত, যাঁকে বলা হয় ভারতীয় তথ্যচিত্রের জনক

৪০-এর দশকে কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই সিনেমার স্বর্গরাজ্য হলিউডে পোঁছে খুঁটিনাটি চাক্ষুস করছেন এক বাঙালি তরুণ। হাতেকলমে সিনেমার কাজ শিখে নিচ্ছেন তখনকার দিনের হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক আরভিং পিচেলের সংস্পর্শে থেকে। পিচেল ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত ছিলেন। সেই উৎসাহী বাঙালি তরুণকে হলিউডের বিভিন্ন ছবি তৈরি করার সময় পরিদর্শক ছাত্র হিসেবে সঙ্গী করে নেন তিনি। এবং সেই বাঙালি তরুণটির নাম- হরিসাধন দাশগুপ্ত। পরবর্তীকালে ভারতের তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে যাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে। যাঁকে বলা হয় ভারতীয় তথ্যচিত্রের জনক।

১৯৪৪ সালে অ্যাকাউন্টেন্সি পড়তে বিদেশে যান হরিসাধন। কিন্তু, শেষমেশ ‘ফিল্ম বাফ’ হয়ে দেশে ফেরেন। অ্যাকাউন্টেন্সি পড়াকালীন অসুস্থ শরীর সুস্থ করতে, মানে হাওয়া বদল করতে আমেরিকা গিয়ে ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’-এ চলচ্চিত্রের পরিচালনা বিভাগে ভর্তি হয়ে যান রীতিবদ্ধ পড়াশোনা করার তাগিদে। তবে, সেখানে তেমন কিছুই শিখতে পারেননি। সেসময় হঠাৎই কাজের সুযোগ পেয়ে যান আরভিং পিচেলের সঙ্গে। সিনেমার বিভিন্ন বিভাগের কাজকর্ম খুব কাছ থেকে দেখে দেশে ফিরে আসেন। ফিরেই যোগাযোগ হয় ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’র উৎসাহী সদস্যদের সঙ্গে। ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ ও তাঁর বন্ধু চিদানন্দ দাশগুপ্ত মিলে তৈরি করেছিলেন ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি। সঙ্গে ছিলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত ও আর পি গুপ্ত। কলকাতায় আন্তর্জাতিক ছবি, বিশেষ করে ইউরোপীয় নিও-রিয়েলিস্ট সিনেমা দেখার পীঠস্থান হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান। বাংলা ছবির বহু বিশিষ্ট পরিচালকই ছিলেন এই সংগঠনের সদস্য। হরিসাধনের বন্ধুত্ব হয় সত্যজিৎ রায়, অজয় কর, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, নিমাই ঘোষ প্রমুখের সঙ্গে।

১৯৪৮ সালে সকলে মিলে ১০ মিনিটের একটা ছবি করলেন—‘এ পারফেক্ট ডে’। একজন লোক সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কীভাবে এক প্যাকেট সিগারেট শেষ করলেন, এই ছিল ছবির প্রেক্ষাপট। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ, ক্যামেরা অজয় কর, শিল্প নির্দেশনা বংশীচন্দ্র গুপ্ত, মিউজিক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। ১০ মিনিটে গল্প বলার এই চেষ্টায় উতরে যাওয়ার পর হরিসাধন ভাবলেন হলিউডি কায়দায় রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ পরিচালনা করবেন। সেইমতো সত্যজিৎ রায় চিত্রনাট্যও রেডি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু অনেক প্রচেষ্টার পর থমকে যায় সেই কাজ। তার অনেক পরে, ১৯৮৪-তে সত্যজিৎ এ ছবি পরিচালনা করেন।

হলিউড তাঁর সিনেমা ভাবনাকে অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময় হলিউড থেকে বিখ্যাত ফরাসী পরিচালক জঁ রেনোয়াঁ কলকাতায় এসেছিলেন তাঁর ‘রিভার’ ছবির জন্য। হরিসাধন রেনোয়াঁর ছবিতে প্রধান সহকারী পরিচালকের কাজ পেলেন। রেনোয়াঁর সাহচর্যে হরিসাধনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছিল। কীভাবে ছোটখাটো বস্তু শিল্পের বিষয় হয়ে উঠতে পারে সেটা রপ্ত করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর অনেক ছবিতেই ধরা পড়েছিল।

তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে হরিসাধনের প্রথম ছবি- ‘কোনারক দি সান টেম্পল’। ১৯৪৯ সালে ডঃ পৃথ্বীশ নিয়োগীর লেখার ওপর ভিত্তি করে ডানলপ কোম্পানির প্রযোজনায় এই ছবি তৈরি হয়। ছবিটিতে সঙ্গীতের দায়িত্বে ছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ও আলি আকবর খান। আর ক্যামেরা করেছিলেন ক্লদ রেনোয়াঁ। তথ্যচিত্র বানানোর পাশাপাশি লিপটন, আই টি সি, আই সি আই প্রভৃতি কোম্পানির জন্য বিজ্ঞাপন চিত্রও তুলতে থাকেন হরিসাধন। ১৯৫৩ সালে বার্মা শেল কোম্পানির প্রযোজনায় বানান ‘দি উইভার্স আর মাহিন্দারগী’। ১৯৫৩-৫৪ সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় ইন্ডিয়ান টিউব কোম্পানির প্রযোজনায় হরিসাধন কুড়ি মিনিটের দু’টি ছবি করেন। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে ভারতবর্ষের গ্রাম ও শহরের চেহারা কেমন ছিল তা ধরা আছে এই দুই ছবিতে—‘শহর কি ঝলক’ ও ‘গাঁও কী কাহানি’। প্রথম ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মেহমুদ। ১৯৫৫ সালে তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘পাঁচথুপি’ তৈরি করেন। পশ্চিমবাংলার এই একটি গ্রামের মধ্য দিয়ে হরিসাধন সারা দেশের গ্রামের প্রাণকে ধরতে চেয়েছিলেন। গ্রামের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সঙ্গে বারো মাসের তের পার্বন তাদের জীবনে কীরকম প্রভাব ফেলে দেখাবার জন্য তিনি ক্রশ-কাটিং-এর সাহায্য নিয়েছেন। কিছু অসাধারণ কম্পোজিশন ছবিটির অন্যতম সম্পদ।

টাটা স্টীলের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ‘দি স্টোরি অফ স্টীল’ এই ছবিটি তৈরি করেন। চিত্রনাট্য সত্যজিৎ রায়ের। শুটিং এর আগে আলোচনা করে কি শট নেওয়া হবে ঠিক হতো। ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে স্টীলের মতো এক নীরস বিষয়ও হরিসাধনের পরিচালনার গুণে কাব্যময় হয়ে উঠেছিল। ৫০ মিনিটের এই ছবিতে মিউজিক করেছিলেন রবিশঙ্কর। টাটা-র ছবির পরে হরিসাধন ছোটোদের জন্য ‘হট্টোগোলে বিজয়’ নামে একটি ছবি প্রযোজনা করেন। ছবিটি পাপেটের মাধ্যমে তৈরি হয়। ক্যামেরা ও পরিচালনায় ছিলেন বুলু দাশগুপ্ত। চিত্রনাট্য করেছিলেন ‘অ্যাড-ম্যান’ রঘুনাথ গোস্বামী। ছবিটি শিশুচিত্র হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক পেয়েছিল।সংগীত নাটক অ্যাকাডেমীর প্রযোজনায় হরিসাধনবাবু দু’জন গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীত ব্যক্তিত্বকে পর্দায় তুলে ধরেন ১৯৬৪-৬৫ সালে। বড়ে গোলাম আলি ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। গায়নরীতি ও ভারতীয় সংগীতে তাদের অবদানকে খুব সুন্দর করে হরিসাধন ধরে রাখেন। ষাটের দশকে হরিসাধনবাবু অনেকগুলি জীবনীমূলক তথ্যচিত্র করেন এর মধ্যে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে বাঘা যতীন বা আচার্য নন্দলাল উল্লেখযোগ্য। আসলে তথ্যচিত্রের প্রায় সমস্ত শাখায় হরিসাধন বিচরণ করতে পেরেছিলেন।

১৯৭১ সালে কলকাতা বন্দরের শতবর্ষ উপলক্ষে হরিসাধন ‘পোর্ট্রেট অফ ক্যালকাটা’ নামে যে ছবিটি করেন তাতে পঞ্চাশ-ষাট দশকের মেজাজ ছিল। সত্তরের দশকে তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন—‘নাইন মান্থস্‌ টু ফ্রীডম’। ছবিটি তৈরি করতে পরিচালক এস সুখদেবকে সাহায্য করেছিলেন তিনি। তাঁর ছেলে রাজা দাশগুপ্তের কথায়, “সুখদেবের এই ছবিটি ছিল ১ ঘণ্টা ৬-৭ মিনিটের। এই ছবিটা বানানো সম্ভব হত না, যদি বাবা না থাকতেন। কারণ সুখদেব এদিককার কিছু চিনতেন না। ‘নাইন মান্থস্‌ টু ফ্রীডম’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ছবি।”

আশির দশকের পর থেকে হরিসাধন তুলনামূলক ভাবে ছবি তৈরি করা কমিয়ে দেন। তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের চল্লিশ বছর ধরে প্রায় ১০০টির মতো তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন তিনি। হরিসাধনের আরও একটি গুণ ছিল। তিনি ছবি তৈরি করতে করতে তাঁর কাজের সঙ্গে জড়িয়ে নিতেন একাধিক ব্যক্তিত্বকে। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে কাজ করেছেন তিনি। সত্যজিতের সঙ্গে সহ-প্রযোজনা করেছেন, চিত্রনাট্য করিয়েছেন, সঙ্গীতযোজনা করেছেন। রবিশঙ্কর তাঁর ছবিতে সঙ্গীত করেছেন, তিমির বরন, আলি আকবর খান, ভি বালসারা, সলিল চৌধুরী প্রমুখেরাও যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর ছবিতে ক্যামেরার কাজ করেছেন অজয় কর, ক্লদ রেনোয়াঁ, বুলু দাশগুপ্ত, সম্বিত বসু, ধ্রুবজ্যোতি বসু, সৌমেন্দু রায়, দীনেন গুপ্ত, গৌতম ঘোষ প্রমুখেরা। হরিসাধনের হাতে তাই তথ্যচিত্র আমাদের দেশে নতুন পথে চলতে শুরু করেছিল।

শুরুর সময়ে হরিসাধনের ভাবনা ছিল হলিউডি কায়দায় পূর্নাঙ্গ দৈর্ঘের ছবি করবেন। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে এবং পরে জন গ্রীয়ারসনের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজেকে তথ্যচিত্রের দিকে নিয়ে গেছিলেন। ভারতের মতো দেশে যেখানে জনশিক্ষার হার এত কম সেখানে তথ্যচিত্রের মতো আপাতঃ নীরস ছবিকে শিল্পময় প্রাণচ্ছ্বল করে করে তুলতে পেরেছিলেন হরিসাধন। উল্লিখিত তথ্যচিত্রগুলি ছাড়াও আরও অনেক কাজ করেছিলেন হরিসাধনবাবু। পারিবারিক উদ্যোগে তাঁর ‘চলচ্চিত্রযাপন’ বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে। প্রকাশ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সেই বই-প্রকাশ অনুষ্টানে প্রদর্শিত হয়েছিল হরিসাধন দাশগুপ্ত পরিচালিত, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্র চ্যাটার্জি, বসন্ত চৌধুরী অভিনীত ফিচার ফিল্ম ‘একই অঙ্গে এত রূপ’। সিনেমাটি ইউটিউবে সংরক্ষণও করেছেন রাজা দাশগুপ্ত। হরিসাধনের পরিচালনায় উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘কমললতা’ ছবিটিও ইউটিউবে পাওয়া যায়। অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের কাহিনি অবলম্বনে এই সিনেমাটি বানানো হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন উস্তাদ আলি আকবর খাঁ। সিনেমাটোগ্রাফি ধীরেন গুপ্তের।

একই অঙ্গে এত রূপ

১৯ অগাস্ট ছিল তাঁর মৃত্যুদিন। এই প্রজন্মের কাছে, এই সময়ের চলচ্চিত্র-তথ্যচিত্র ভাবনার ক্ষেত্রে ‘ইন্সপিরেশন’ হতে পারতেন যিনি, সেই হরিসাধন দাশগুপ্ত অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছেন চর্চার তাগিদ থেকে, হারিয়ে গিয়েছে তাঁর বেশীরভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলিও। 

 

Developed by DXDasia