‘ছাতুবাবুর ছাতা’র প্রচ্ছদে ‘অপটিকাল ইলিউশন’ তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ

নায়ক-এর সেট ডিজাইনেও এই শিল্পরীতি কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি

যাহা দেখিলাম তাহাই যে সবসময় সত্য হবে এমন কোনও কথা নেই। কোনও একটা জিনিস দেখার কথা একরকম, কিন্তু পার্সপেক্টিভ-এর কারণে আপনি অন্যকিছু দেখছেন বা বিভ্রান্ত হচ্ছেন, এই ইলিউশন বা চোখের ধাঁধাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না! আর অস্বীকার করা যায় না বলেই সারা পৃথিবী জুড়ে ‘অপটিকাল ইলিউশন’ধর্মী আর্টের আলাদা কদর আছে। এই ‘অপটিকাল ইলিউশন’-এর প্রেমিক ছিলেন সত্যজিৎ রায়ও, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ছোটদের গল্পগ্রন্থ ‘ছাতুবাবুর ছাতা’র প্রচ্ছদ তার অন্যতম নির্দশন।

সিগনেট প্রেসের সুবাদেই কামাক্ষীপ্রসাদ ও দেবীপ্রসাদের সঙ্গে সত্যজিতের পরিচয়। কিন্তু সত্যজিৎ রায়-অলংকৃত ও পরিকল্পিত সুকুমার রায়ের প্রথম বইটি সিগনেট থেকে প্রকাশের আগেই তিনি কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ছোটদের গল্পগ্রন্থ ‘ছাতুবাবুর ছাতা’র প্রচ্ছদ সমেত আটটি গল্পের প্রতিটির স্বতন্ত্র নামচিত্র আঁকেন। ১৯৫০ সালে ‘সংকেত ভবন’ থেকে প্রকাশিত হয় গ্রন্থটি।‘ছাতুবাবুর ছাতা’র আগে সত্যজিৎ একটিই প্রচ্ছদ করেছিলেন, তা হল- ১৯৪০ সালে এম সি সরকার প্রকাশিত ও রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা-সম্বলিত ‘পাগলা দাশু’র প্রচ্ছদ। ‘ছাতুবাবুর ছাতা’ করার সময় ড্রয়িং-এর ম্যাজিক আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন শিল্পী সত্যজিৎ; আঁকা ছবিতে কীভাবে অঙ্ক এবং বিজ্ঞানের কৌশল মিশিয়ে দিতে হবে তার সুস্পষ্ট বোধ জন্মেছিল তাঁর আঙুলে—শিল্পভাবনায়। ‘অপটিকাল ইলিউশন’ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ডাচ শিল্পী এম সি এশার-এর কথা না বললেই নয়, বিশেষত সত্যজিতের ‘অপটিকাল ইলিউশন’ আর্টের কথা হচ্ছে যখন। কারণ, ‘অপটিকাল ইলিউশন’-এ সিদ্ধহস্ত বিশ্বের সেরা গ্রাফিক আর্টিস্টদের মধ্যে অন্যতম এশার-এর শিল্পকর্মের একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন সত্যজিৎ, এমনকী বাড়ির বসার ঘরে এশারের একটি ড্রয়িংও রেখেছিলেন।

শিল্পী- এম. সি এশার

এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা, ‘নায়ক’ সিনেমার সেই অবিস্মরণীয় শট—ছুটন্ত ট্রেনের ভিতর মুখোমুখি আলাপচারিতায় মগ্ন অদিতি (শর্মিলা ঠাকুর) আর অরিন্দম (উত্তম কুমার)। ঠাহর করা দুষ্কর যে, এই দৃশ্যের সেট ডিজাইনেও ‘অপটিকাল ইলিউশন’ কাজে লাগিয়েছিলেন সত্যজিৎ। তবে, সেই কাজটি তিনি নিজে হাতে করেননি, করিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে একটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত আর্টিকেল-এ সন্দীপ রায় এ বিষয়ে বলেছিলেন, ‘যাঁরা নায়ক দেখেছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভাবেন ছবিতে আসল ট্রেন ব্যবহার করা হয়েছিল। আদপে তা হয় নি। সত্যিটা হল, ছবির জন্য ট্রেনের সেট বানিয়েছিলেন ‘নায়ক’-এর শিল্প-নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত। এবং এই অপটিকাল ইলিউশন-এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল তাঁকে।’

শিল্পী- এম. সি এশার

সত্যজিৎ রায়ের করা ‘ছাতুবাবুর ছাতা’র প্রচ্ছদ

মাত্র দু’রঙে লাইন ব্লকে ছাপানো ‘ছাতুবাবুর ছাতা’র প্রচ্ছদ। কালো রঙ চোবানো তুলিতে আঁকা ছাতুবাবু ছাতা মাথায় দিয়ে এগিয়ে চলেছেন, পিছন ফিরে রয়েছেন তিনি। মুখ না দেখা গেলেও, হাঁটার ভঙ্গি আর ছাতাই জানান দেয় তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য—কোনও হাসির গল্পের চরিত্র। ইয়োলো অকার-এর একটি নক্সাওয়ালা ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর মুদ্রিত সেই ছবি। নক্সা গড়ে উঠেছে ছাতার সমারোহে। হাফটোন ছবি পরিবর্ধিত করে লাইন ব্লকের উপযোগী বড়ো বড়ো সাদা-কালো দানায় রূপান্তরিত করলে যেমন দেখাবে, অনেকটা সেরকমই। এর ফাঁকেই তিনি তৈরি করেছেন ‘অপটিকাল ইলিউশন’। প্রচ্ছদের একার্ধে, ছাতাগুলি হলুদ রঙে ছাপা, ফাঁকগুলি সাদা। আবার, অন্য অর্ধে, ফাঁকগুলি রঙ করা, ছাতা ফুটে উঠেছে কাগজের নিজস্ব সাদা রঙ থেকে। বৃষ্টির ছাঁট আটকাতে এই ছাতাগুলি কখনো স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়, কখনো ছাতার সমাহারের মধ্যবর্তী জ্যামিতিক নক্সাই চোখ টানে। সেই নক্সা মনে করিয়ে দেয় এশার-এর বিভিন্ন খ্যাতনামা ‘অপটিকাল ইলিউশন’ধর্মী কাজ। শিল্পী-গুণীজনদের মতে, মজার গল্পের বইয়ের ডিজাইনে ‘ছাতুবাবুর ছাতা’ সত্যজিৎ রায়ের গ্রাফিক-কর্মের অন্যতম সেরা নিদর্শন।

সূত্রঃ

প্রবন্ধ সংগ্রহঃ সিদ্ধার্থ ঘোষ, বুক ফার্ম

টাইমস অফ ইন্ডিয়া

 

Developed by DXDasia