৭৫ বছরে তারাশংকরের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, কেমন আছে কোপাইয়ের সেই বাঁক?

একদিকে খোয়াই-কোপাই অন্যদিকে কোপাই-কুয়ে-বক্রেশ্বর, একদিকে রবীন্দ্রনাথ অন্যদিকে তারাশংকর

“হাঁসুলী বাঁকের ঘন জঙ্গলের মধ্যে রাত্রে কেউ শিষ দিচ্ছে, দেবতা কি রক্ষ কি যক্ষ বোঝা যাচ্ছে না, সকলে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কাহাররা।”

এভাবেই শুরু হয়েছিল তারাশংকরের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ (১৯৪৬)। এক অদ্ভুত নদীর বাঁক, উপন্যাসের প্রথম সংস্করণের ৭৫ বছর পার করা বিস্ময় চরিত্র, যা প্রকৃতির ভাঙা-গড়ার বহুস্তরীয় খেলাতেও অটুট। কথাটা বললাম বটে, কিন্তু বহুস্তরীয় প্রাকৃতিক ক্রীড়াজগতেও মূল চালিকা শক্তি যেহেতু সভ্যতা, তাই যে হাঁসুলী বাঁকের চিত্র ও চরিত্রদের ছবি তারাশংকর এঁকেছিলেন, তার অধিকাংশই আজ কালের গর্ভে। ফলে রাতের ঘন জঙ্গলে যে শিষের আওয়াজে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে কাহাররা, সে যে নিতান্তই একটা চন্দ্রবোড়া, তাকে আগুনে ঝলসিয়ে বীরত্ব দেখিয়ে কাহারকুলে বাড়তি সম্ভ্রম আদায় করে নেওয়া করালীর অ্যাডভেঞ্চার সেলফি লাঞ্ছিত সভ্যতা অনুমোদন দেয় না। ফলে হাঁসুলীর চর জেগে থাকলেও একটা জনজাতি, তার জীবনকাহিনি হারিয়ে যায় বরাবরের মতো।

হাঁসুলীতে গিয়ে দেখেছিলাম, ইটভাটার দৌরাত্ম্য। বড়ো বড়ো মাটি কাটার ট্রাক্টর ধুলোর ঝড় তুলে ছুটে যাচ্ছে। রুপো কিম্বা সোনার হাঁসুলী ভাঙছে প্রতিনিয়ত। কাহাররা নিশ্চিহ্ন, লাগোয়া ছোটো রেলের কাটোয়া-আমোদপুর লাইন ইতিহাসের পাতায় নাম তুলে নিয়েছে। তবে হাঁসুলীর বাঁক টিকে রয়েছে এখনও। স্বমহিমায়।

শান্তিনিকেতনে বন্ধু কৌশিকের মোপেডে চড়ে গিয়েছিলাম লাভপু্র। বোলপুর থেকে লাভপুর সাকুল্যে ২৪ কিমি পথ। প্রান্তিক রেলস্টেশন পেরিয়ে বেশ কিছুটা যেতেই কোপাইয়ের পাড় ঘেঁষে কংকালীতলা। মন্দিরে প্রবেশের গলি বাঁ দিকে রেখে রাস্তা চলে গিয়েছে সোজা। ভোর ভোর বেরিয়েছিলাম, ফলে মে মাসের রাঢ়বাংলা তত তেতে ওঠেনি। রাস্তার দু-ধারে চোখে পড়ছে বড়ো বড়ো জলাশয়। আর তাকে ঘিরে থাকা আদিবাসী গ্রামে লাল কৃষ্ণচুড়া ভোরের নীলাভ আকাশে আলপনা এঁকে রেখেছে। আড়মোড়া ভেঙে গলা তুলে ওস্তাদি চলনে হাঁকডাকে ব্যস্ত মোরগ। মায়ের সতর্ক নজরদারিতে ছাগশিশুদের একটা দল তাপ-উত্তাপহীন রাস্তা জুড়ে দুলকিচালে হাঁটছে। রাস্তা মোটের ওপর মসৃণ। কেবল লাভপুর পৌঁছানোর কিমি দুয়েক আগের অংশ কিছুটা খারাপ।

বিপ্রটিকুরি, ইন্দাস প্রভৃতি গঞ্জ এলাকা ছাড়ালাম। লাভপুর কলেজের গা ধরে একটু এগোতেই ধানখেত। বট-অশ্বত্থ আর ছেঁড়া ছেঁড়া জঙ্গলের মিলিজুলি সংসার। দু’টো প্রাথমিক স্কুলও চোখে পড়ল। রাস্তা মাটির, তবে ধুলোর চাদরে ঢাকা। ট্রাক্টরের আগ্রাসনে অন্তত তিন ইঞ্চি পুরু ধুলোর পথ পেরিয়ে বাইক ছুটল। প্রায় সাড়ে তিন কিমি যাওয়ার পর দেখলাম, রাস্তা একটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়ে ঘুরে গিয়েছে। বাইকও সেই পথ ধরে ঘুরতে লাগল। রাস্তার গা ঘেঁষে কোপাই নদী বয়ে চলেছে। এই সেই অদ্ভুত বাঁক, একেবারে ফাঁসের দড়ির মতো নদী বেঁকেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাস্তাও মোড় নিয়েছে। সত্যিই বড়ো বিচিত্র বাঁক। উপন্যাসে তারাশংকর যেমন বর্ণনা দিয়েছিলেন তেমনই।

“কোপাই নদীর প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় বিখ্যাত বাঁকটার নাম হাঁসুলী বাঁক অর্থাৎ যে বাঁকটায় অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের মধ্যে নদী মোড় ফিরেছে, সেখানে নদীর চেহারা হয়েছে ঠিক হাঁসুলী গয়নার মতো। বর্ষাকালে সবুজ মাটিকে বেড় দিয়ে পাহাড়িয়া কোপাইয়ের গিরিমাটি গোলা জলভরা নদীর বাঁকটাকে দেখে মনে হয়, শ্যামলা মেয়ের গলায় সোনার হাঁসুলী। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে জল যখন পরিষ্কার সাদা হয়ে আসে, তখন মনে হয় রুপোর হাঁসুলী। এই জন্যই বাঁকটার নাম হাঁসুলী বাঁক। এই হাঁসুলীর চরেই বাঁশবনে ঠাসা বাঁশবাদী গ্রাম”। একটু দূরে কোপাই-বক্রেশ্বর নদীর মিলনস্থল। দুই নদী মিলে সেখানে তৈরি হয়েছে নতুন নদী, কুয়ো। তিরতিরে স্রোত। নিঃসঙ্গ ঠাঠা পোড়া দুপুরে গ্রামের কিছু ছেলে সেখানে জল খেলছে। আর চোখে পড়ল ইট ভাটা। ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে কাটা হচ্ছে নদীর পাড়। বুঝলাম, পাড় কাটা বন্ধ না হলে প্রকৃতির এই বিস্ময়কর সৃষ্টির লয় অবশ্যম্ভাবী।

আমি বলি কী, যারা শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যান তারা একদিনের জন্য লাভপুরও ঘুরে আসুন। সেখানে হাঁসুলী বাঁক ছাড়া অবশ্যই দেখবেন, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। খুব পরিচ্ছন্ন যত্নে বাড়িটি সাজিয়ে রেখেছেন সাহিত্যিকের পরবর্তী প্রজন্ম। তারাশংকরের ধাত্রীগৃহ, তাঁর ব্যবহৃত চশমা, কলম, চিঠির দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ রয়েছে সেখানে। সেই চিঠির একটিতে লেখা, “তাকে গিয়ে বল, আমার নাম করে বল, দেশ স্বাধীন হয়েছে, এখন আর জমিদারি নেই। মানুষই এখন শেষ কথা বলবে।”

শান্তিনিকেতন-লাভপুর। একদিকে খোয়াই-কোপাই অন্যদিকে কোপাই-কুয়ে-বক্রেশ্বর। একদিকে রবীন্দ্রনাথ অন্যদিকে তারাশংকর। প্রকৃতি-সাহিত্যের এমন মেলবন্ধন রাজ্য তো বটেই গোটা দেশেই দুর্লভ। সুতরাং দেরি না করে চটজলদি একটা সাহিত্য-সার্কিট ভ্রমণের মকশো করে ফেলুন। তারপর বেরিয়ে পড়তে আর কতক্ষণ। পাশাপাশি আমাদের এ-ও ভুলে গেলে চলবে না, এবছর ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সাড়াজাগানো বিস্ময়কর সেই উপন্যাস বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের সম্পদ। লাভপুরে গেলে হাঁসুলীর বিস্তৃত সেই পথের বর্ণনা ভেসে উঠবে আপনার চোখের সামনে।

Developed by DXDasia