
শান্তিনিকেতন থানার ওসি কস্তুরী মুখোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায় শিশুদের জন্য পাঠশালা খুলেছেন থানাতেই
শিশুরা যেখানে অনেকক্ষেত্রে শ্রমিকের ভূমিকা পালন করে, সেখানে প্রশ্ন ওঠে শিশুদের সুরক্ষা কোথায়? শিশুদের অধিকার কোথায়? পশ্চিমবঙ্গ সরকার এযাবৎকাল অবধি বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং করে চলেছে। তবে এর পাশাপাশি শিশুদের হয়ে কথা বলার জন্য চাই সাধারণ মানুষদের কণ্ঠ। তাদের এগিয়ে আসাই একপ্রকার সুনিশ্চিত শিশু স্বাধীনতার পাঠ দিতে পারে। আর তার জন্য সবার আগে চাই শিক্ষা। চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা নয়, বরং নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে তাদের আপন হয়ে যাওয়া। ধীরে ধীরে মানুষ চেনার মতো তারা অক্ষর চিনবে, শব্দ শিখবে। এই দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন শান্তিনিকেতন থানার মহিলা ওসি কস্তুরী মুখোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায়। পেশার তাগিদে নয়। ভালোবেসে।
বীরভূম জেলার এই একটিমাত্র থানাতেই রমরমিয়ে চলছে পুলিশ পাঠশালা
দেখা গেছে, বীরভূম জেলার এই একটামাত্র থানাতেই রমরমিয়ে চলছে পুলিশ পাঠশালা। সেখানে পড়াশোনা করে প্রায় ১৩০ জন শিশু। দায়িত্বে শান্তিনিকেতন থানার ওসি কস্তুরী। এর আগে বঙ্গদর্শন পোর্টালের মাধ্যমে আপনারা ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছেন কাকিমার পাঠশালার কথা। আমফান ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বাংলার নানা জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভুবনেশ্বরী গ্রাম ছিল তার মধ্যে অন্যতম। এই সংকটকালে গ্রামের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন অসীমা ভাণ্ডারী। যাঁর পাঠশালা কাকিমার পাঠশালা নামেই পরিচিত।
প্রায় ১৩০ জন শিশুকে বিনামূল্যে পড়ানো হয় এই পাঠশালায়
ঠিক একই চিত্র দেখা গেল শান্তিনিকেতন থানায়। শান্তিনিকেতন থানার ওসি কস্তুরী মুখোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায় শিশুদের জন্য নানারকম কাজ করেন। যার মধ্যে অন্যতম একটি, থানার মধ্যে পুলিশ পাঠশালা। যেখানে বাচ্চাদের পড়াশোনা করানো হয়।এমনকি তাদের খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি পুজোর সময় নতুন পোশাকও দেওয়া হয়।
বইয়ের পড়া ছাড়াও নাচ, গান, ক্যারাটে ও আঁকাও শেখানো হয়
আরও পড়ুন: আমফান বিধ্বস্ত ‘কাকিমার পাঠশালা’য় পৌঁছালাম
শান্তিনিকেতন থেকে ওসি কস্তুরী মুখোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শনকে ফোন মারফত জানান, “আমি ২০১৮ সালে এই থানায় যোগ দিয়েছি। যদিও স্কুলটি এই অঞ্চলের কিছু দরিদ্র পরিবার থেকে আসা প্রায় ৮০ জন শিশুকে নিয়ে শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। আজ যার ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১৩০ জন। আমরা ভবিষ্যতে এটাকে সরকারি অনুমোদিত স্কুল হিসাবে গড়ে তুলতে চাই, এই স্বপ্নই দেখি” ।কস্তুরী আরও জানান, “খুব ভোরে শুরু হয় এখানকার ক্লাস। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এই স্কুল ভীষণ উপযোগী। আমরা বিনামূল্যে তাদের পড়াশোনা শেখাই। এখান থেকেই শিশুরা পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে যায় পঠনপাঠনের জন্য”।
শান্তিনিকেতন থানার কনস্টেবল থেকে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ অফিসাররা এখানকার বাচ্চাদের পড়ান। এছাড়াও বিশ্বভারতীর কয়েকজন শিক্ষক সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিন ক্লাস নিতে আসেন। শুধুমাত্র পড়াশোনা নয়; নাচ, গান, ক্যারাটে, আঁকা এরকম অনেককিছুর ক্লাসই হয়। অনেক স্থানীয় বাসিন্দাও স্বেচ্ছায় ক্লাস করাতে আসেন। যাঁরা মূলত পারফর্মিং আর্টসের উপর জোর দেন।
রাজ্যের তরফে এ বছর ‘বেস্ট চাইল্ড ফ্রেন্ডলি পুলিশ পার্সোনেল অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে পাঠশালার উদ্যোক্তা ওসি কস্তুরী মুখোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায়কে
এখন বীরভূম জেলা পুলিশের মাথায় তাই নতুন মুকুট। রাজ্যের তরফে এ বছর ‘বেস্ট চাইল্ড ফ্রেন্ডলি পুলিশ পার্সোনেল অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে কস্তুরীকে। এই পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে আগামী ২০ নভেম্বর। কস্তুরী নিজেও একাধিকবার চাইল্ড ফ্রেন্ডলি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ভেবেছেন। পাশাপাশি কাজ তুলে নিয়েছেন নিজের দায়িত্বে। এখন তাঁর শিক্ষার পাঠ এবং আদর ছড়িয়ে পড়েছে ১২০ জন শিশুর মধ্যে।
আজ শিশু দিবসে এমন একটি খবর কার্যত নজিরবিহীন। সারাদিন সমস্ত ডিউটির মাঝখানেও শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার এমন প্রয়াস নাড়া দিয়েছে সমাজের সর্বস্তরকে। আজ শিশু দিবসে তাঁকে কুর্নিশ।

