টানা দশদিন লতাবুনিতে শিল্পচর্চা
আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করি নিজেদের উদ্যোগে প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে সহযোগী শিল্প প্রকল্প (Collaborative Art Project) ও শিল্প কর্মশালার আয়োজন করব। বীরভূমের সদর শহর সিউড়ি থেকে ১৪ কিমি দূরে আদিবাসী গ্রাম জামদহ, লতাবুনি। গ্রামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই শিল্প প্রকল্পেরও নাম রাখি ‘লতাবুনি’। যেমন সুন্দর এই গ্রাম, তেমনি সুন্দর এখানকার মানুষজন।
গ্রামে ঢুকতেই দেখলাম, একটি ছোট্ট জল শূন্য ডোবাতে কয়েকজন আদিবাসী বাচ্চা কাদা মাখামাখি করে পাকের ভিতর থেকে মাছ ধরছে। মাছকে তাদের ভাষায় বলে ‘হাকু’। গ্রামের এদিক ওদিকে দাঁড় করানো আছে গরুর গাড়ি। দিন কয়েক আগেই পার হয়ে গিয়েছে ‘বাতনা পরব’। প্রতিটি বাড়ির দেওয়ালে জ্যামিতিক নকশা। পুঁথিগত শিক্ষার আলো এই প্রান্তিক গ্রামগুলিতে সেইভাবে বিস্তার করেনি। আমরা ঠিক করি, এই গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একাত্ব হয়ে আমাদের শিল্প কর্ম গড়ে তুলব। আমরা, মানে আমি সৌরভ নন্দী, দেবজিৎ রূদ্র পাল (ত্রিপুরা), চয়ন দাস ঠাকুর (বীরভূম), সিদ্ধার্থ শীল (ত্রিপুরা), সুশান্ত মিস্ত্রি (দক্ষিণ ২৪ পরগনা), চন্দ্রা বণিক (ত্রিপুরা) এবং অদ্বিতীয়া সরকার (জলপাইগুড়ি)। আমরা সকলেই বিভিন্ন আর্ট কলেজ থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর পাশ করেছি।

কাজ করার জন্য সীমন্ত সরেন তাঁর বাড়ির উঠোনটি আমাদের দেন। চোখে পড়ে একটি মাটির ভাঙা দেওয়াল। সীমন্তের স্ত্রী শিখিয়ে দেন কীভাবে মাটির দেওয়াল সুন্দরভাবে নেকানো যায়। প্রথমে লাল মাটি, তারপর পাথর দিয়ে সেটিকে ঘষে মাটিকে সমতল করা হয়। ঠিক যেন রাজমিস্ত্রির কাজ। শুকিয়ে গেলে গোবর দিয়ে কাপড়ের মাধ্যমে উলুটি দেওয়া হয়।
আমরা ছবি আঁকার জন্য লাল রং হিসেবে ব্যবহার করলাম বীরভূমের লাল মাটি। কালো রঙের জন্য উনুনের পোড়া ছাই। সাদা রঙের জন্য খড়ি মাটি। আর দেওয়াল চিত্রের বিষয় হিসেবে উঠে এল, গ্রামবাসীদেরই পরিচিত বিভিন্ন মোটিফ। আমাদের হাতে হাত মেলালো গ্রামের শিশুরাও। ড্রয়িং করার জন্য ব্যবহৃত হল কাঠ কয়লার টুকরো। শিশুদের চিত্রে কী অপূর্বভাবে উঠে এল গরুর গাড়ি, মাদল, মোটর বাইক, এমনকি তাদের দেবতা মারাংবুরুর থানও।
গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করি আমরা। এই যেমন- কাঠের গুঁড়ি, শুকনো গাছের ডালপালা, তালের রস সংগ্রহের পোড়া মাটির হাঁড়ি, চাষের লাঙল, বসবার জন্য ব্যবহৃত দড়ির খাটিয়া, ঝুড়ি, শালপাতা। সবকিছুকেই কাজে লাগিয়ে তৈরি করলাম নানান ইন্সটলেশন। এ-ও যেন একপ্রকার উৎসব। গ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রইল আমাদেরই করা বিভিন্ন সাইড স্পেসিফিক ইন্সটলেশন, ওয়াল মিউরাল, ওয়াল পেইন্টিং এবং গ্রামের বাচ্চাদের তৈরি করা নানান দেওয়াল চিত্র ও পুতুলের কারুকাজ। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে শিখে নিলাম মাটির রিলিফ, জ্যামিতিক নকশা, উঠোন নিকনো।
এই কাজে উঠে এসেছে অলচিকি হরফ। আস্ত একটা শিল্প গ্রাম, যেখানে সবাই সবার দর্শক, সমালোচক। আদিবাসী নাচের তালে, গানের সুরে, ধামসা-মাদলের বোলে, লাল মাটির রাস্তায়, গোবর নিকনো উঠোনে, হাঁড়িয়ার মাদকতায় নির্মিত হচ্ছিল আমাদের বেঁচে থাকা। এ এক অন্য পাঠ। দশ দিন যে কীভাবে কেটে গেল লতাবুনিতে! শেষ দিন গ্রামের এক মহিলা আমাদের বললেন, “কাল থেকে তো তুরা আর আসবি না, সামনে মাঘ পুজোয় আসিস, মাংসর পিঠে খাওয়াব।”
আমাদের শিল্পকর্মের কিছু ছবি রইল আপনাদের জন্য।


