আইওলাইটস : স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম টিকিটের বিনিময়ে কনসার্টের আয়োজন করেছিল

সে এক বাংলাদেশ ছিল। যেখানে ধর্মের নামে গোঁড়ামি ছিল না, মুক্তমনে অপর সংস্কৃতির প্রতি প্রেম ছিল, উচ্চমানের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বজোড়া ভাবের আদান-প্রদান ছিল, কুণ্ঠা ছিল না। সেই বাংলাদেশ আজও উদাহরণ হয়ে আছে আবিশ্বে। যে বাংলাদেশের দু:খে সমব্যথী হয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন, অ্যালেন গিনসবার্গরা

‘…পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন।’ এপর্যন্ত জীবনে বেশ কয়েকবার এই বাক্যটির মর্মার্থ বুঝতে পেরেছি। যেমন, ২০২২-এর কথাই যদি ধরি, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ড্রামার জর্জিনা হক-কে নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে জানতে পেরেছিলাম স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড ‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’ (প্রথমে যার নাম ছিল ‘আইওলাইটস’)-এর কথা।

বাংলাদেশ (Bangladesh) যে বছর স্বাধীন হয়, ঠিক তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় জয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Dhaka University) টিএসসি (Teacher Student Centre)-তে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে শেখ কামাল (বঙ্গবন্ধুর বড়ো ছেলে)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ব্যান্ড ‘স্পন্দন’-এর সঙ্গে ড্রামস বাজিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন জর্জিনা। তখন তিনি ১৬ বছরের কিশোরী। আজকের বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য তিনি অনুপ্রেরণা, স্পর্ধা। কিন্তু ওইটুকু বয়সে তিনি কোথা থেকে ড্রামসের মতো একটি বাদ্যযন্ত্র – পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে ভালোবাসার অনুপ্রেরণা পেলেন?

১৯৬৭ সালে বর্তমান ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশের (স্বাধীনতাপূর্ব) ইতিহাসে প্রথম টিকিটের বিনিময়ে কোনো ব্যান্ডের কনসার্টের আয়োজন করেছিল ‘আইওলাইটস’। কনসার্টের ব্যপ্তিকাল ছিল ঘণ্টা তিনেক। সেই বছরেই ব্যান্ডের নাম পাল্টে হয়েছিল ‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’।

যাঁরা পশ্চিমী যন্ত্রসংগীত বোঝেন-ভালোবাসেন এবং জর্জিনাকে সরাসরি মঞ্চে ড্রামস বাজাতে দেখেছেন বা ইউটিউবে তাঁর পারফরম্যান্স দেখেছেন, তাঁরা একবাক্যে মেনে নেবেন তিনি একজন প্রকৃত ‘রকস্টার’। ১২ বছর বয়সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, ড্রামস বাজাবেন। পরে সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছেন, “১২ বছর বয়সে আমি রান্নাঘরের বাসনপত্র নিয়ে ড্রামস প্র্যাক্টিস করতাম।” এমনকী তিনি ইটভাঙ্গা মহিলা শ্রমিকদের সঙ্গে বসে ইট ভাঙ্গার তালের সঙ্গেও বাজানো প্র্যাক্টিস করতেন। আর এসব কর্মকাণ্ডে তাঁকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল ‘আইওলাইটস’ বা ‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’। ব্যান্ডের ড্রামার সাব্বির কাদেরের ড্রামস বাজানো দেখে অনুপ্রাণিত হন জর্জিনা। তাঁর দাদা আলমগীর হক (Alamgir Haq) এই ব্যান্ডেরই মুখ্য কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। সেই আলমগীর হক যিনি আশির দশক থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়কদের একজন, উর্দু পপস্টার, অনেকে যাঁকে প্রাচ্যের ‘এলভিস প্রিসলি’ বলে ডাকেন। কোক স্টুডিওতে তার গাওয়া বাংলা-উর্দুর মিশেলে ‘আমায় ভাসাইলি রে’  গানটা হয়তো অনেকেই শুনেছেন। আলমগীর ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬/৬৭ সাল পর্যন্ত এই ব্যান্ডে ছিলেন। পরে পাকাপাকি ভাবে করাচি চলে যান।  একাধিকবার বাংলাদেশে গান গাইতে এসেছিলেন। 

‘আইওলাইটস’-এর মুখ্য কণ্ঠশিল্পী আলমগীর হক

রক, পপ, জ্যাজ, ব্লুজ, রক এন্ড রোল, মেটাল ইত্যাদি বিভিন্ন ধারার ব্যান্ড সংগীত সারা বিশ্বেই তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। বাংলাদেশে এই পাশ্চাত্য ব্যান্ড কালচারকে জায়গা করে দেওয়া সহজ ছিল না। শুরুটা হয়েছিল সেন্ট গ্রেগরির এক স্কুলপড়ুয়ার হাত ধরে। নাম ফজলে রব। ১৯৬৩ সালের ১৮ মার্চ তার মনে এক নতুন স্বপ্নের জন্ম নেয়। স্বপ্নটা ছিল গিটার শেখার আর দলবেঁধে গান করার। এই স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল স্কুলের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় অষ্টম শ্রেণীর পড়ুয়া টেলফার জনসন নামের এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছাত্রের গিটারের জাদুতে মুদ্ধ হয়ে। অনবদ্য গিটার প্লেয়িংয়ে টেলফার সেদিন গেয়েছিলেন বিটলস-এরও আগের মিউজিক ব্যান্ড ‘দি শ্যাডো’-র, ক্লিফ রিচার্ডের একটি জনপ্রিয় গান।

তারপরই ৩০০ টাকা দিয়ে কেনা একটি ইলেকট্রিক গিটার আর এ্যাম্প কিনে ফেলেছিলেন রব। পরের বছর সঙ্গী পেলেন গিটার বাদক রফিক মাযহার ইসলাম সাজু নামের আরেক স্কুলপড়ুয়া ও সুফি রশিদকে। তিনজন মিলে স্কুল, কলেজ, পাড়া-মহল্লায় গান গাইতে শুরু করলেন। ঢাকার বিখ্যাত নবাব বাড়ির ছেলে সাব্বির কাদের যোগ দিলেন তাঁর ড্রামসেট নিয়ে। অবশেষে ১৯৬৪ সালে ব্যান্ড গঠন হয়, নাম রাখা হয় ‘আইওলাইটস (Iolites)’। এরপর ভোকালিস্ট হিসেবে যোগ দেন  আলমগীর হক। 

সেই একই সময়ে, অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সাফাত আলী তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ‘জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী’ নামে গানের দল গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেই অর্থে ব্যান্ড ছিল না, এরা ছিলো পারিবারিক ঘরানার অর্কেস্ট্রা দল। ১৯৬৪ সালে সাফাত আলীর বোন নাজমা আলী (নাজমা জামান) আর সাহেলা পারভীন গায়ক হিসেবে দলে যোগ দেন। মূলত এই দুজনের পারফর্মেন্সের জন্যই জিংগার নাম খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চারিদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় টিভি চ্যানেল চালু হবার পরের বছরেই জিংগা সেখানে প্রথম পপগানের অনুষ্ঠান করে। এরা মূলত টেলিভিশন প্রোগ্রামই বেশি করতো। সে সময়ে জিংগার হাত ধরে বাংলা গানের নতুন ধারা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এছাড়া ১৯৬৫ সালে চট্রগ্রামে উদ্ভুত হয় ‘লাইটেনিংস’ নামে একটি ব্যান্ড। নারায়ণগঞ্জের জালাল আবেদিন ‘বকলম’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন। ১৯৬৭ সালে রবিনসহ আরো কয়েকজন মিলে ‘টাইম এগো ইমোশন’ গঠন করেন। ১৯৬৯/৭০ সালের দিকে চট্রগ্রামে গড়ে ওঠে ব্যান্ড ‘স্পাইডার’। ‘আইওলাইটস’-এর সমকালীন ব্যান্ড হিসেবে মোটামুটি এগুলিই উল্লেখযোগ্য।

১৯৬৫ সাল থেকে ‘আইওলাইটস’ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়মিত পারফর্ম করতে শুরু করে। তখন প্রতিটি বড়ো বড়ো হোটেলেই গানবাজনার ব্যবস্থা ছিল, যদিও স্বাভাবিকভাবে কোথাও বাংলা গান গাওয়া হতো না। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের শুরুর দিকে এই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ছিল সবচেয়ে বড়ো পৃষ্ঠপোষক। ইন্টারকনের ছোটো ডায়াসে গানবাজনা হতো, যেটা ‘চাম্বেলি রুম’ নামে পরিচিত ছিল। এই চাম্বেলি রুম ব্যান্ড মিউজিক বিস্তারের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ইন্টারকনে শো করার আগেই ‘আইওলাইটস’ শাহবাগ হোটেল (বর্তমান পিজি হাসপাতাল) ও ঢাকা ক্লাবে শো করতো। ১৯৬৫ সালে বিটিভিতে ৩০ মিনিটের একটি প্রোগ্রামে ‘আইওলাইটস’ ইন্সট্রুমেন্টাল পরিবেশন করেছিল। এরপর হাদী নামে এক প্রযোজকের হাত ধরে এই ব্যান্ডের পারফরমেন্সের মাধ্যমেই এদেশের টিভি চ্যানেলে প্রথমবারের মতো ‘ব্যান্ড শো’র সম্প্রচার শুরু হয়।

১৯৬৭ সালে বর্তমান ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশের (স্বাধীনতাপূর্ব) ইতিহাসে প্রথম টিকিটের বিনিময়ে কোনো ব্যান্ডের কনসার্টের আয়োজন করেছিল ‘আইওলাইটস’। কনসার্টের ব্যপ্তিকাল ছিল ঘণ্টা তিনেক। সেই বছরেই ব্যান্ডের নাম পাল্টে হয়েছিল ‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’। তারা এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তাদের ব্যাংক একাউন্টে তৎকালীন ২৭ হাজার টাকা জমা হয়েছিল। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রতি শো’তে তারা পেত ৭৫০ টাকা, আর প্রবেশমূল্য ছিল ৫ টাকা। সেই সময়ের ৭৫০ টাকা এখন কত টাকা হয়?

‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’-এর একটা মাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল ইউটিউবে পাওয়া যায়, যেটার থাম্বনেলে আছে একটা রেকর্ড, যার একপাশে রাগ ভাগশ্রী আরেকপাশে আছে “ব্যার্থ প্রেমিক” নামে দুটো ইন্সট্রুমেন্টাল। পাকিস্তান EMI থেকে প্রকাশিত এবং ‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’-এর একমাত্র রেকর্ড ২০১৫ সালে ইউটিউবে দেন বাংলাদেশের নাসের ইয়ামেন নামে এক গানপ্রেমী। নুতন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ব্যান্ড-সংগীতের ঐতিহ্য তুলে ধরেন তিনি। অত্যন্ত দুর্লভ রেকর্ডটি তাঁর কাছে অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষিত আছে বলেই বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন তিনি। নাসের জানিয়েছেন, “আমি আসলে নজরুল এবং বাংলা গানের আদি সংগীত এবং আদি রেকর্ড নিয়ে কাজ করি। এ কাজটা করতে গিয়েই এই ব্যান্ডের একমাত্র এবং খুবই দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডটি আমার হাতে আসে। এ কারনেই এই ব্যান্ডের তথ্য বা ইতিহাস আমি সংগ্রহ করি।”

‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’-এর একমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল রেকর্ড

বাংলাদেশে ব্যান্ড-সংগীত চর্চার সঙ্গে বহুদিন যাবৎ যুক্ত গৌতম কে শুভ একটি প্রতিবেদনে যথার্থই লিখেছেন, “যে যাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে, ১৯৬৯ সালে সেই যাত্রা কয়েক বছরের জন্য থেমে যায় বৃহত্তর স্বার্থে। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান শুরু হলে গোটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেমে যায়। তারপর শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধে সংগীতের সাথে জড়িত অনেকে গিটার, ড্রামস আর কিবোর্ড ফেলে হাতে রাইফেল তুলে নেন। এ পর্যন্ত সময়কে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসের প্রথম পর্ব বলা যায়। অবশ্য তাদের সে সময়ের কোনো সৃষ্টি সেভাবে এখন আর আমাদের মাঝে নেই, তবে তারা ঠিকই আছেন আমাদের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসের পাতায় অনুপ্রেরণা হয়ে।”

___________________
তথ্যঋণ:
The windy side of care (FB page)
গৌতম কে শুভ
নাসের ইয়ামেন

Developed by DXDasia