মহিলা শ্রমিকদের সঙ্গে বসে ইট ভাঙ্গার তালের সঙ্গেও বাজানো প্র্যাক্টিস করতেন
‘বাংলাদেশ’ (Bangladesh) যে বছর স্বাধীন হয়, ঠিক তার পরের বছর, ১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় জয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Dhaka University) টিএসসি (Teacher Student Centre)-তে বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে শেখ কামাল (বঙ্গবন্ধুর বড়ো ছেলে)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি ব্যান্ডের (স্পন্দন) সঙ্গে ড্রামস বাজিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন জর্জিনা। জর্জিনা হক (Georgina Huq)। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ‘ড্রামার’তখন ১৬ বছরের কিশোরী।
যাঁরা পশ্চিমী যন্ত্রসংগীত বোঝেন-ভালোবাসেন এবং জর্জিনাকে সরাসরি মঞ্চে ড্রামস বাজাতে দেখেছেন বা ইউটিউবে তাঁর পারফরম্যান্স দেখেছেন, তাঁরা একবাক্যে মেনে নেবেন তিনি একজন প্রকৃত ‘রকস্টার’। ১২ বছর বয়সে ‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’ (প্রথমে যা ‘আইওলাইটস’ নামে খ্যাত ছিল) ব্যান্ডের ড্রামার সাব্বির কাদেরের ড্রামস বাজানো দেখে অনুপ্রাণিত হন। সেই বয়সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন যে ড্রামস বাজাবেন। পরে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “১২ বছর বয়সে আমি রান্নাঘরের বাসনপত্র নিয়ে ড্রামস প্র্যাক্টিস করতাম।” এমনকি মহিলা শ্রমিকদের সঙ্গে বসে ইট ভাঙ্গার তালের সঙ্গেও বাজানো প্র্যাক্টিস করতেন।
১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শান্তিনগরে জন্ম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফরমাজুল হকের কন্যা। জর্জিনার দশ ভাই বোনের সকলেই কমবেশি গান-বাজনার সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের প্রথম চারটি ব্যান্ডের উদ্ভব হয়েছিল তাঁদের বাড়ি থেকেই। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত তাঁর পরিবারের কাছে ঋণী। জর্জিনার বড়ো দাদা আলমগীর হক, যিনি আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়কদের একজন। উর্দু পপস্টার আলমগীরকে অনেকে প্রাচ্যের ‘এলভিস প্রিসলি’ বলে থাকেন। কোক স্টুডিওতে অনেকেই হয়তো শুনেছেন তাঁর গাওয়া বাংলা-উর্দুর মিশেলে ‘আমায় ভাসাইলি রে’। বাংলাদেশের পপ সম্রাট আজম খানের সঙ্গে গিটার বাজাতেন ছোট ভাই নয়ন মুন্সী, যাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম গিটারিস্ট বলা হয়। কানাডায় গিয়ে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিলেন যে একটি পাঁচতারা হোটেল তাঁর নামে প্রাত্যহিক শো ঘোষণা করে—‘দ্য নয়ন মুন্সী শো’। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে কানাডাতেই পথ-দুর্ঘটনায় মারা যান নয়ন। আরেক ভাই দস্তগীর ছিলেন স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার’-এর ভোকালিস্ট ও ড্রামার। জর্জিনা ও তাঁর দুই বোন ‘ত্রি হক সিস্টার্স’ নাম দিয়েও কিছুদিন গানবাজনা করেছেন। বেইলি রোডের মহিলা একাডেমি, হলি ক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রেসকোর্স ময়দানে ছোটোখাটো কয়েকটি অনুষ্ঠানে ‘থি হক সিস্টার্স’ পারফর্ম করেছিল। ছোটো বোন রোক্সানা হক মূলক তবলা বাদক হিসেবে পরিচিত হলেও প্রায় সবধরনের বাদ্যযন্ত্রই তাঁর আয়ত্তে ছিল। জর্জিনাও একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় দক্ষ। ড্রামস, গিটার বা মাউথঅর্গ্যানের সঙ্গে গানটাও দিব্যি গাইতে পারেন। বিদেশি সংগীতস্রষ্টাদের গানও যেমন তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছেন, তেমনি গেয়েছেন মাতৃভাষার গান। তবে, সারা বিশ্বে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ড্রামার হিসেবেই।
জর্জিনা হক
মেয়েদের জন্য ড্রামস বাজানো কষ্টের বা ড্রামস মেয়েদের জন্য উপযুক্ত বাদ্যযন্ত্র নয় এমন মানসিক প্রতিবন্ধকতা হয়তো অনেক মেয়েই অতিক্রম করতে পারেনি। ষাট-সত্তরের দশকে বাদ্যযন্ত্র বিশেষ করে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র বাজানো ছেলেদের কাজ- এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে কাজ করতো। স্বাভাবিকভাবে সত্তরের দশকে জর্জিনাকেও এইধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অনেকেই নানা ধরনের কথা শোনাতেন তাঁর ড্রামস বাজানোকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে যে শুধু পুরুষরা ছিল তা নয়, ছিল অনেক মহিলারাও। তাদের কোনো কথায় কান না দিয়ে তিনি চর্চা করে গেছেন নিজের মত। পরবর্তীতে তিনি যখন ব্যান্ডের সঙ্গে বাজানো শুরু করলেন, তখন অনেকেরই দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে শুরু করল এবং কেউ কেউ নিজের সন্তানদের পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখাতে শুরু করলেন। সাধনা ও শিক্ষার জোরে মেয়েরা সকল বাধা অতিক্রম করতে পারে বলে মনে করেন জর্জিনা। তিনি বলেন, “নিজেকে কেমন দেখতে লাগছে, তার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে মেয়েদের বরং গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ গানের চর্চার প্রতি।”
পরিবারের সহযোগীতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা, আগ্রহ ও মনোবলের জোরে বৈরি পরিবেশেও স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিলেন। পর্দানসীন সমাজের অনুপ্রেরণা, আলোকিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন জর্জিনা। তাঁকে দেখে বাংলাদেশের অসংখ্য মেয়ে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কথা ভাবতে পেরেছে।
বিয়ের পর স্বামী-সন্তানসহ বহু বছর বিদেশে ছিলেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে মজার একটি কথা বলেছিলেন, বিয়ের পর দিন শ্বাশুড়ি যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি কী পারো?” তিনি বুঝতে পারেননি শ্বাশুড়ি ঠিক কী জানতে চাইছেন এবং নিতান্ত সরল ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি ড্রামস বাজাতে পারি।” বিয়ের পর প্রবাসে গিয়ে সেভাবে আর মূলস্রোতে থেকে গানবাজনা চর্চা করেননি।
না, তিনি বাজানো ছাড়েননি। সেভাবে কোনো ব্যান্ডের সাথে না বাজালেও চর্চা চালিয়ে গেছেন বরাবরই। প্রবাসে থাকাকালীন বিশেষ অনুরোধে দু-একটা অনুষ্ঠানে বাজিয়েছেন। তারপর তাঁর জীবনে ফিরে আসে সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০১৬ সাল। বিজয়ের মাস, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি কেন্দ্রিক সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিজয় দিবস উপলক্ষে একত্রে প্রতিবছর ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আয়োজন করে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। সে বারের অনুষ্ঠানসূচী জানিয়ে দিয়েছিল ৪৪ বছর পর বাংলাদেশ আবার ফিরে পেতে চাইছে সেদেশের প্রথম মহিলা ড্রামারকে—জর্জিনা হককে।
৪৪ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-তে জর্জিনা
যে মঞ্চে প্রথম ড্রামস বাজিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন, সেখানে আবার নিজের গান-বাজনা পরিবেশনার সুযোগ পেয়ে চোখ ভিজে গিয়েছিল জর্জিনার, বাংলাদেশের তামাম সংগীতপ্রেমী মানুষদেরও। ব্যান্ড ‘ল্যাম্পপোস্ট’-এর সঙ্গে ড্রামস বাজিয়ে জর্জিনা পারফর্ম করেন জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ এবং পরে গেয়ে শোনান বব ডিলানের ‘ব্লোউইন ইন দ্য উইন্ড’। মৌসুমি ভৌমিক তার পরের বছরই এই অনুষ্ঠানে জর্জিনার পারফরম্যান্সের প্রংশসা করে নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে বড়ো একটি পোস্ট লেখেন, যেখানে তিনি জানান জর্জিনার সঙ্গে ই-মেলে তাঁর প্রথম বার্তালাপের কথা। ‘আমার কিছু কথা ছিল’ গানটি মৌসুমির জন্য গেয়ে পাঠিয়েছিলেন জর্জিনা।
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ টিএসসি-তে আসার আগেই ঢাকা টাইম্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জর্জিনা বলেছিলেন,
“৪৪ বছর পর আবার সেই টিএসসিতে বাজাবো। মনে হচ্ছে একটা টাইম মেশিনে করে সেই ১৯৭২-এ ফেরত যাচ্ছি। তখন আর এখনকার মধ্যে তো অনেক পার্থক্য। জানি না লোকজন কেমন হবে, কেমন ভাবে নেবে আমাকে, এতোদিন পর বাজাবো। আমার এখনো মনে আছে সেদিন স্পন্দনের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল, আর আমি বোকা মেয়ের মতন মাথা নিচু করে ড্রাম টিউন করছিলাম। কামাল ভাই বললেন জর্জিনা মাথা উঁচু করে দাড়াও। কামাল ভাই যে আজ নেই, সাহস দেওয়ারও কেউ নেই, টিএসসিতে খুব ফিল করবো এটা।” তিনি আরও বলেন, “আশা করি ভেঙে পড়বো না, অবশ্য বয়সও তো হয়েছে। জানি না কি হবে। কেঁদে না ফেলি আবার। কাঁদলে তো গানের বারোটা বেজে যাবে।”
সেদিন কান্না আটকাতে না পারলেও গান-বাজনার বারোটা বাজাতে দেননি তিনি। এটাই ছিল জর্জিনা হকের শেষতম মঞ্চ অনুষ্ঠান।
তথ্যসূত্রঃ
প্রথম আলো
Scroll.in
Sakib sharif, Roar media
Moushumi Bhowmik’s facebook page