‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ৫০ বছর : স্মরণে রবিশঙ্কর-জর্জ হ্যারিসনের উত্তরসূরিরা

৭১’এ বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের ত্রাণ তহবিলের জন্য আয়োজিত হয় এই কনসার্ট

টালমাটাল পরিস্থিতি, বিশ্বযুদ্ধঘটিত পৃথিবী, হিরোশিমা-নাগাসাকি, ইতিহাসের গায়ে লেপ্টানো হয়েছে নিদর্শনমূলক কিছু মৃত্যুনামাবলী, ঘেঁটে যেতে শুরু করেছে মানুষ-সমাজ-চিন্তা-চেতনা-মূল্যবোধ। সেই সময়ের কথা। ১৯৬৭, জুন মাস। ‘মন্টেরি ইন্টারন্যাশনাল পপ মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’-এর মুক্তমঞ্চে তবলা আর সেতারের আলাপে পৃথিবীর যাবতীয় হিংস্রতা, অরাজকতা, অবসাদের ভীত কাঁপিয়ে দিতে পেরেছিলেন দুই সঙ্গীত-ঈশ্বর—রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী ওরফে পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং উস্তাদ আল্লারাখা।

প্রায় দু’লক্ষ মানুষ সেদিন সাক্ষী থেকেছিলেন সঙ্গীতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম জনপ্রিয় এই উৎসবে। ফেস্টিভ্যালে যাঁরা সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র রবিশঙ্কর ছাড়া আর কোনও শিল্পী সম্মানী নেননি। রবিশঙ্কর নিয়েছিলেন তিন হাজার ডলার। সম্মানীর পুরো টাকাই তিনি দিয়ে দিয়েছিলেন সমাজকল্যাণমূলক তহবিলে। এরপর ১৯৭১-এও তাই করেছিলেন। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণে লড়ছে মুক্তিকামী বাঙালি, আর সীমান্তের ওপারে ভারত সীমান্তে মানবেতর জীবনযাপন করছে এক কোটি শরণার্থী। তাদের দুর্দশা দেখে কিছু করতে উদ্যোগী হন রবিশঙ্কর, নিজের ভাবনার কথা জানান দীর্ঘদিনের বন্ধু বিটলস তারকা জর্জ হ্যারিসনের কাছে। হ্যারিসনের আমন্ত্রণে সেই কনসার্টে অংশ নেন বব ডিলান, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল ও গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটন সহ আরও অনেকে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের ত্রাণ তহবিলের জন্য নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ১৯৭১-এর ১ আগস্ট আয়োজিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

সেই কনসার্ট থেকেই বাংলাদেশের নাম রাতারাতি পৌঁছে যায় পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই কনসার্টেরই ৫০ বছর পূর্তিতে ১ আগস্ট দিনটি স্মরণ করলেন রবিশঙ্কর-জর্জ হ্যারিসনের উত্তরসূরিরা।

CBS রেকর্ডস-এর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অ্যালবামের বিরল কভার

কনসার্টের একটি ভিডিওর অংশ টুইটারে পোস্ট করে রবিশঙ্করের মেয়ে সুরকার ও সেতারবাদক আনুষ্কা শঙ্কর একটি টুইটে লেখেন, “৫০ বছর আগে আজকের এই দিনে বাংলাদেশের জরুরি ত্রাণ সহায়তার জন্য বাবা ও জর্জ হ্যারিসন কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন করেছিলেন। বেনিফিট কনসার্টের যে ধারণা আজ আমাদের মধ্যে রয়েছে, সেই সময় তার মানদণ্ড তারা তৈরি করে দিয়েছিলেন।”

একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালির সমর্থনে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তকে স্মরণ করেন সেই আয়োজনের মূল দুই উদ্যোক্তা রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসনের উত্তরসূরিরা।২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে মারা যান জর্জ হ্যারিসন। ২০১০ সাল থেকে তার উত্তরাধিকারদের পক্ষ থেকে তার নামে একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট সচল রাখা হয়েছে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে সেই অ্যাকাউন্ট থেকেও বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করা হয়েছে। একটি টুইটে লেখা হয়, “৫০ বছর আগে আজকের এই দিনে বাংলাদেশের জরুরি ত্রাণ সহায়তায় অর্থ সংগ্রহের জন্য জর্জ হ্যারিসন ও রবি শঙ্কর কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন করেছিলেন। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সঙ্গে সেই উত্তরাধিকার আজও অব্যাহত আছে।”

সেই বেনিফিট কনসার্ট থেকে পাওয়া অর্থ একটি চেকের মাধ্যমে পাঠানো হয় জাতিসংঘ শিশু তহবিলে (ইউনিসেফ)। দুই লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮ ডলার ৫০ সেন্টের ওই চেকের একটি অংশে লেখা ছিল ‘বাংলাদেশের শরণার্থী শিশুদের ত্রাণের জন্য’। এ ছাড়া ক্যাপিটল রেকর্ডস কনসার্ট ফর বাংলাদেশ লাইভ অ্যালবামের আগাম বিক্রি বাবদ ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের আরেকটি চেক অ্যাপলকে দেয়। পরে অ্যালবাম বিক্রি থেকে আরও অর্থ আসে। কিন্তু ওই কনসার্ট যে দাতব্য উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তা আগে থেকে নিবন্ধন না করায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর ছাড় দিতে অস্বীকার করে। ফলে ওই টাকার একটি বড় অংশ ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসের অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকে। ১৯৭২ সালে ইউনিসেফের মাধ্যমে ২০ লাখ ডলার শরণার্থীদের কাছে পৌঁছায়। আর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ ডলারের মত বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল।

১৯৭১-এ একটি সাংবাদিক বৈঠকে জর্জ হ্যারিসন এবং রবিশঙ্কর

সত্তরের দশকের শুরুতে বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের ওই সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের অংশগ্রহণে সেই কনসার্ট বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজনে একাত্তরের পুরো জুন আর জুলাইয়ের অর্ধেক সময় বিভিন্ন শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাটান জর্জ হ্যারিসন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে বব ডিলানও কনসার্টে অংশ নেন। প্রাক্তন বিটলস সদস্য রিঙ্গো স্টারও রাজি হন কনসার্টে অংশ নিতে। এগিয়ে আসেন আরও দুই বিখ্যাত মার্কিন গায়ক বিলি প্রেস্টন ও লিওন রাসেল এবং তখনকার দিনের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটন।

ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ব্যাডফিঙ্গার, জার্মান মিউজিশিয়ান ক্লাউস ভুরম্যান, মার্কিন ড্রামার জিম কেল্টনার, জিম হর্নসের নেতৃত্বে ‘হলিউড হর্নস’দলের সদস্যরা, গিটারিস্ট জেসি এড ডেভিস, কার্ল রেডল এবং আরও অনেক শিল্পী অংশ নেন বাংলাদেশের জন্য কনসার্টে। আর কনসার্টের প্রথম অংশে ভারতীয় সংগীতপর্বে রবিশঙ্করের সঙ্গে অংশ নেন বিখ্যাত দুই ভারতীয় শিল্পী, ওস্তাদ আলী আকবর খান আর আল্লারাখা।

কনসার্টের শেষ গানটি ছিল জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’। ওই গানের শুরুর কথায় পণ্ডিত রবি শঙ্করের সঙ্গে তার কথোপকথনটিই যেন ফুটে ওঠে।

হাজার হাজার দর্শকের সামনে জর্জ হ্যারিসন গেয়ে ওঠেন-

“মাই ফ্রেন্ড কেইম টু মি, উইদ স্যাডনেস ইন হিজ আইজ;

টোল্ড মি দ্যাট হি ওয়ান্টেড হেল্প, বিফোর হিজ কান্ট্রি ডাইজ।

অলদো আই কুডন্ট ফিল দ্য পেইন, আই নিউ আই হ্যাড টু ট্রাই;

নাউ আই অ্যাম আসকিং অল অব ইউ টু হেল্প আস সেইভ সাম লাইভস।

বাংলাদেশ বাংলাদেশ…”

আর রবিশঙ্কর? যখন বিদেশের মাটিতে তাবড় তাবড় সঙ্গীত স্রষ্টারা তাঁর বাদ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কুর্নিশ জানাচ্ছে, তিনি তখন জনপ্রিয়তার গড্ডালিকায় পিছলে না গিয়ে দেশের কথা ভেবেছেন, দশের কথা ভেবেছেন, মাতৃভূমির জন্য কান্না ঝরে পড়েছে তাঁর আঙুল থেকে। আসলে, অসহায়তা কাকে বলে ছোটবেলাতেই জেনে ফেলেছিলেন। তিয়াত্তর বছর বয়সে দগদগে স্মৃতি উস্কে ‘স্মৃতি’-তে লিখেছিলেন, “মা প্রত্যেকবার হয় একটা শাড়ি, নয় নাকের ফুল এইসব দুঃখী তেলীর কাছে বাঁধা রেখে আসতেন। এই করে উনি আমাদের মানুষ করেছেন—কাউকে জানতে দেননি। কী অদ্ভুদ! আমি ভাবি—কী strength of character ছিল। আমার দাদারাও জানতে পারত না। কেবল আমিই কিছুটা বুঝতাম। আমিই দেখতাম।”

ঋণঃ

Alamy, getty images

 

 

Developed by DXDasia