
প্রকৃত স্রষ্টার মতোই স্বীকৃতি নিয়ে কোনও ভাবনা ছিল না তাঁর
আমি জুন মাসে জন্মেছি, সেটা বড় কথা নয়। এমনকি, কীভাবে পৃথিবীর সংকটে নকল আলো জ্বালিয়ে উল্লাস করতে হয়, এখন তাও আমরা জেনে গেছি; সেটাও আর বড় কথা নয়। অতঃপর…
টালমাটাল পরিস্থিতি, বিশ্বযুদ্ধঘটিত পৃথিবী, হিরোশিমা নাগাসাকি, ইতিহাসের গায়ে লেপ্টানো হয়েছে নিদর্শনমূলক কিছু মৃত্যুনামাবলী, ঘেঁটে যেতে শুরু করেছে মানুষ-সমাজ-চিন্তা-চেতনা-মূল্যবোধ। সেই সময়ের কথা।
১৯৬৭, জুন মাস। ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরি কাউন্টি ফেয়ার গ্রাউন্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ ছেলেমেয়েদের ভিড়, বেশিরভাগেরই হাতে-গলায়-মাথায় ফুলের গোছা, হিপি ছেলেমেয়ারাই বেশি, উপস্থিত হয়েছেন সহস্র সঙ্গীতপ্রেমী। বিরাট মাঠের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁরা, মুখে হাসি, আলুথালু ব্যাপার। কেউ সদ্য ঘুম থেকে উঠছেন, কেউ পসরা সাজিয়েছেন কারুকর্মের। ছড়ানো ছিটানো ভিড় হঠাৎই একমুখী হতে শুরু করে, কারণ সবার কানেই ততক্ষণে পৌঁছাতে শুরু করেছে রিনরিনে সুরের ঝংকার, যে সুর প্রাচ্য থেকে বহু যত্নে এসে পৌঁছেছে পাশ্চাত্যে, যে সুর আগে কখনও এভাবে শোনেননি তাঁরা। ভিড় আরও আরও আবিষ্ট হতে শুরু করে, একদিকে ঘন হয়ে আসে। সকলেরই মন-মাথা দুলতে থাকে। কারও চোখে শ্রুতিমধুর আচ্ছন্নতা, কারও বিস্ময়। কেউ কেউ একাগ্র, ঝাঁকিয়ে চলেছেন মাথা, যেন কান বেয়ে-স্নায়ু বেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নেশাদ্রব্য। সেই আচ্ছন্নতা, বিস্ময় আর ঝাঁকুনিতে সামিল হয়েছেন জিমি হেন্ড্রিক্স, জর্জ হ্যারিসন, জানিস জপলিন…অন্যান্য সঙ্গীত স্রষ্টারা; তাঁদেরকে দেখে সহজেই টের পাওয়া যাচ্ছে অবর্ণনীয় বিভোরতা। বিহ্বল হয়ে তাঁরা এবং অন্য সকলে তাকিয়ে রয়েছেন সেদিকে, যেদিক থেকে ভেসে আসছিল সেই সুর।
সকলে তাকিয়ে ছিলেন মন্টেরি কাউন্টি ফেয়ারগ্রাউন্ডে নির্মিত ওপেন স্টেজের দিকে, যেখানে বেহেড হয়ে নিজেদের বাদ্যযন্ত্রকে সুর-নেশাতুর করে তুলেছিলেন দুই সঙ্গীত-ঈশ্বর। রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী ওরফে রবিশঙ্কর এবং আল্লারাখা। সুরের ছটায় বিলকুল অন্ধ হয়ে গিয়েছেন তাঁরা, যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, তবু চারিদিক আলো করে রেখেছেন তাঁরাই। সেদিন ‘মন্টেরি ইন্টারন্যাশনাল পপ মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’-এর মুক্তমঞ্চে তবলা আর সেতারের আলাপে পৃথিবীর যাবতীয় হিংস্রতা, অরাজকতা, অবসাদের ভীত কাঁপিয়ে দিতে পেরেছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ আল্লারাখা।
প্রায় দু’লক্ষ মানুষ সেদিন সাক্ষী থেকেছিলেন সঙ্গীতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম জনপ্রিয় এই উৎসবে। ফেস্টিভ্যালে যাঁরা সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র রবিশঙ্কর ছাড়া আর কোনও শিল্পী সম্মানী নেননি। রবিশঙ্কর নিয়েছিলেন তিন হাজার ডলার। সম্মানীর পুরো টাকাই তিনি দিয়ে দিয়েছিলেন সমাজকল্যাণমূলক তহবিলে। এরপর ১৯৭১-এও তাই করেছিলেন। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের ত্রাণ তহবিলের জন্য ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এর আয়োজন করেছিলেন।
যখন বিদেশের মাটিতে তাবড় তাবড় সঙ্গীত স্রষ্টারা তাঁর বাদ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কুর্নিশ জানাচ্ছে, তিনি তখন জনপ্রিয়তার গড্ডালিকায় পিছলে না গিয়ে দেশের কথা ভেবেছেন, দশের কথা ভেবেছেন, মাতৃভূমির জন্য কান্না ঝরে পড়েছে তাঁর আঙুল থেকে। আসলে, অসহায়তা কাকে বলে ছোটবেলাতেই জেনে ফেলেছিলেন। তিয়াত্তর বছর বয়সে দগদগে স্মৃতি উস্কে ‘স্মৃতি’-তে লিখেছিলেন, “মা প্রত্যেকবার হয় একটা শাড়ি, নয় নাকের ফুল এইসব দুঃখী তেলীর কাছে বাঁধা রেখে আসতেন। এই করে উনি আমাদের মানুষ করেছেন—কাউকে জানতে দেননি। কী অদ্ভুদ! আমি ভাবি—কী strength of character ছিল। আমার দাদারাও জানতে পারত না। কেবল আমিই কিছুটা বুঝতাম। আমিই দেখতাম।”

সুরসখাঃ জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে
অনেক কিছুই দেখতে পেতেন তিনি, যা বাকি সকলে দেখতে পেতেন না। একজন প্রকৃত স্রষ্টার মতোই। যেমন বার্গম্যানের সিনেমা দেখতে দেখতে মন তৈরি করতেন, সুর বাঁধতেন। স্বীকৃতি নিয়ে কোনও ভাবনা ছিল না তাঁর। অনিবার্য সুরে ডুবে-ভেসে থাকতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “১৯৬৬ সালে আমি যখন জর্জ হ্যারিসনের সাথে কাজ শুরু করি, আমি একজন পপ স্টারের মতো হয়ে উঠেছিলাম। যেখানেই যাচ্ছিলাম, স্বীকৃতি পাচ্ছিলাম। কিন্তু সেটা আমি একদমই পছন্দ করিনি।”
পরম্পরাঃ গুরুপিতা বাবা আলাউদ্দিন খানের সঙ্গে
তাঁর গুরুপিতা বাবা আলাউদ্দিন খান ছাড়াও আর এক মহান সুরস্রষ্টা মোৎজার্ট-কে তিনি ভগবান মানতেন। তাঁর কথায়, “মোৎজার্ট নিয়ে তো অঢেল কথা লেখা হয়েছে ওঁর মৃত্যুর পর থেকে। এরকম একটা সাঙ্গীতিক প্রতিভা তিন-চার শতাব্দীতে একবার জন্মায়। আমি তো ওঁকে শঙ্করাচার্য, যীশুখ্রীষ্ট, বিবেকানন্দ বা রামানুজ গোত্রের মানুষ বলে ভাবি… মোৎজার্টের একটা বড় ব্যাপার যে, তিনি ও তাঁর সঙ্গীত খুব সরল, আবার জটিলও। এ যে কী কঠিন ব্যাপার তা আমরা যাঁরা গানবাজনা করি, তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। একেই তো বলে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত। মানব-সভ্যতা যতদিন থাকবে ততদিনই ভদ্রলোককে শুনতে হবে। আর যেই শুনবে সে-ই জানবে সঙ্গীতে ভগবানের রূপ কী রকম।”
আরও পড়ুন: মনোহরণ মনোহারি
খুব স্পষ্ট করে বললে, রবিশঙ্করের জন্মশতবর্ষে তাঁকে আমরা মনে করছি কারণ, অবিশ্রান্ত ধারায় আমৃত্যু নিজের যা কিছু, সবই নিঃস্ব করে দিয়ে গিয়েছেন পৃথিবীর জন্য, মানুষের জন্য, সঙ্গীতের জন্য, শান্তির জন্য। তা-ই পরিশেষে, তাঁর ভগবান- মোৎজার্টের উদ্দেশ্যে তাঁর বলা কথাই তাঁকে ফিরিয়ে দেবো-
রবিশঙ্কর’কে নিয়ে তো অঢেল কথা লেখা হয়েছে ওঁর মৃত্যুর পর থেকে। এরকম একটা সাঙ্গীতিক প্রতিভা তিন-চার শতাব্দীতে একবার জন্মায়। আমি তো ওঁকে শঙ্করাচার্য, যীশুখ্রীষ্ট, বিবেকানন্দ, রামানুজ বা মোৎজার্ট গোত্রের মানুষ বলে ভাবি… রবিশঙ্করের একটা বড় ব্যাপার যে, তিনি ও তাঁর সঙ্গীত খুব সরল, আবার জটিলও। এ যে কী কঠিন ব্যাপার তা যাঁরা গানবাজনা করেন তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পান। একেই তো বলে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত। মানব-সভ্যতা যতদিন থাকবে ততদিনই ভদ্রলোককে শুনতে হবে। আর যেই শুনবে সে-ই জানবে সঙ্গীতে ভগবানের রূপ কী রকম।
