লক্ষ্মীছাড়া ফিরল এক দশক পর, বদলে যাওয়া ব্যান্ড-সংস্কৃতি নিয়ে মুখ খুললেন গাবু

লক্ষ্মীছাড়ার অন্যতম সদস্য গৌরব চট্টোপাধ্যায়/গাবু-র সাক্ষাৎকার

বাংবাংলার ব্যান্ড-সংস্কৃতি (Bengali Band Culture) অনেক বছরের। সত্তরের দশকে মহীনের ঘোড়াগুলি যে দৌড় শুরু করেছিল, তা চরমে ওঠে ৯০-২০০০-এর দশকে। সে সময়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলা ব্যান্ডের গান। নতুন প্রজন্ম-পুরোনো প্রজন্ম, সবার মুখে-মুখে ঘুরতো গানগুলি। প্রেম, বিরহ, জীবনের পাওয়া-না পাওয়া, চেনা শহরের অচেনা বাঁকের জলছবি আঁকা থাকতো সেসব গানে। নিজের মনের যা কিছু নিজে থেকে বুঝে ওঠা যায় না, সেসব অনুভূতির সহজ আশ্রয় ছিল প্রায় প্রতিটি গান। তারপর সময় এগিয়েছে। কিন্তু সেসব গানের নস্টালজিয়া আজও মায়াবিষ্ট করে রেখেছে এই সময়ের তরুণ-তরুণীদেরও। সেই নস্টালজিয়াকে উস্কে দিয়ে নিজেদের ষষ্ঠ অ্যালবাম প্রকাশ করল জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড লক্ষ্মীছাড়া (Lakkhichhara Band)। অ্যালবামের নাম ‘এক দশক পর’। লক্ষ্মীছাড়া ব্যান্ড এখনও জনপ্রিয়। বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করে। তবে প্রায় দশ বছর পর নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করে তখনকার স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের স্মৃতির রাস্তায় আরেকবার হাঁটার সুযোগ করে দিলেন তাঁরা। সেই সূত্রেই বঙ্গদর্শন.কম-এর প্রতিনিধি সৌমিক দাস কথা বললেন ব্যান্ডের ড্রামার-সুরকার গৌরব চ্যাটার্জি (গাবু)-এর সঙ্গে। গৌরবের আরও একটি পরিচয়, তিনি বাংলা ব্যান্ড-সংস্কৃতির মহীরূহ কিংবদন্তি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র। এর উপর সম্প্রতি শহর হারিয়েছে মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম আদি ঘোড়া তাপস বাপি দাসকে। ফলে আলোচনায় উঠে এল মহীনের ঘোড়াগুলির প্রসঙ্গও।

________________________________________________________________

নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগলো কেন?

গৌরব: এর বেশ কিছু কারণ আছে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমাদের ব্যান্ডটা অনেক ভাঙা-গড়ার মধ্যে দিয়ে গেছে। ২০১৬ সাল থেকে আমরা একটা স্থায়ী দল পাই। তারপর ২০২০ সালে করোনা অতিমারী এসে গেলো। স্টুডিওতে একসঙ্গে বসে কাজ করা আমাদের বহু বছরের অভ্যাস। করোনার জন্য সেই অভ্যাসটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন আমরা ঠিক করেছিলাম নিজেরাই আলাদা করে রেকর্ড করে কম্পাইল করে গানগুলো তৈরি করবো। আমরা প্রত্যেকেই আসলে খুবই ব্যস্ততার মধ্যে থাকি। তাই তাতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। আর একটা কারণও আছে। এই গ্রুপে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সব সদস্যের মতামত নেওয়া হয়। অ্যালবাম আদৌ বার করবো কি না, করলে তাতে কোন গান থাকবে, সেসব ভাবতে গিয়ে খানিকটা সময় গেছে। আমাদের অনেক অপ্রকাশিত গান আছে। তেমন নতুন কিছু গান স্টেজে গাইতে গিয়ে মানুষের দারুণ সাড়া পেলাম। লোকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলো গানগুলো কোথায় পাওয়া যাবে। তখন ঠিক করি অ্যালবামটা করতে হবে। অ্যালবামটা বার করার কথা ছিল প্রায় একবছর আগে। যাইহোক, সব ঠিকঠাক করে এখন বার হল শেষপর্যন্ত। এটা প্রথম পদক্ষেপ বলা যায়। আমাদের এখন একটা স্থায়ী দল আছে ৭ বছর ধরে। অনেকগুলো অপ্রকাশিত নতুন গান আছে। ধীরে ধীরে সেগুলোকেও প্রকাশ করতে থাকবো।

অ্যালবাম প্রকাশের অনুষ্ঠান

আগে ছিল ক্যাসেটের সময়। তারপর এলো সিডি-ডিভিডি। আর এখন ডিজিটাল যুগ। এই পুরো বদলটাই আপনারা দেখেছেন। এই সময় দাঁড়িয়ে অ্যালবাম প্রকাশ করার সুবিধা-অসুবিধা কী?

গৌরব: সময় এখন অনেক বদলেছে। এখন মানুষের কাছে অনেক বিকল্প। তাই পছন্দ-অপছন্দও দ্রুত বদলায়। ৯০-এর দশকে সারা পাড়া একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান দেখতো। এখন আর সেই দৃশ্য প্রায় দেখাই যায় না। পাশাপাশি বসে থেকেও নিজের নিজের জগতে থাকে মানুষ। সবার হাতে সময় কমে গেছে। গানের স্বাদও বদলেছে সবার। আমরা এই বদলের বিরোধী নই। কারণ, আমরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। সচেতন ভাবে এবং নিজেদের অজান্তে, বদলেছি আমরাও। গানের স্বাদও বদলেছে সবার। আমাদের ভাবনাও পাল্টেছে। সেসব কিছু মাথায় রেখেই এই অ্যালবামটি প্রকাশ করা হয়েছে। অ্যালবামে ৪টে গান আছে। পুরো অ্যালবামটা শুনতে একজনকে ২০-২৫ মিনিটের বেশি সময় দিতে হবে না। এটা মূলত সিঙ্গলস আর অ্যালবামের মাঝামাঝি একটা ব্যাপার বলা চলে। আমাদের বিশ্বাস, শ্রোতারা নিশ্চয়ই পছন্দ করবেন আমাদের এই নতুন উদ্যোগকে। 

এই নতুন অ্যালবামের গানগুলির বিষয়বস্তু কী রকমের? আপনাদের পুরোনো গানগুলোর বিষয় সাধারণত প্রেম, নগরজীবন ইত্যাদি। তার সঙ্গে কোনও সাযুজ্য আছে?

গৌরব: প্রেম একেবারেই নেই। এখন আমাদের প্রায় সব সদস্যের বয়সই চল্লিশের কোঠায়। এসময়ের প্রেমগুলো তো আর কুড়ির প্রেমের মতন হবে না। গানগুলো পুরোনো দিনের মতন করে তৈরি হয়নি। আমরা মানুষগুলোও তো পাল্টেছি। আমাদের ভাবনা, মনন সবই পাল্টেছে। এখনকার ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই গানগুলো তৈরি হয়েছে। সেই সময়ের ভাবনাতে ফিরে গিয়ে গান লিখতে পারলে হয়তো পুরোনো দিনের মতো গান লেখা সম্ভব হতো। কিন্তু তার জন্য খানিক অভিনয় করতে হতো। তা আমরা পারি না, করতেও চাই না। আমরা এখন যেমন, চারপাশকে এখন যেভাবে দেখি, তারই প্রতিফলন ঘটেছে গানগুলোতে। চিরকালই আমরা স্টেজে যেমন, স্টেজের বাইরেও তাই। তাই আমাদের গানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাবনার বদল সহজেই চোখে পড়ে। এই অ্যালবামের ক্ষেত্রে প্রথম তিনটে গানে দেশের, সমাজের, সিস্টেমের এখনকার অবস্থার ছবি ধরতে চেয়েছি, তাকে বদলানোর কথা বলেছি। এত নেতিবাচকতার মধ্যেও আমরা যে জীবনকে উদযাপন করার চেষ্টা করছি রোজ, সেটাই চতুর্থ গানের বিষয়। চারটে গান মিলে সময়ের একটা সম্পূর্ণতা ধরা পড়ে।

নতুন অ্যালবামে মিউজিক নিয়ে কি কোনও পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে?

গৌরব: লক্ষ্মীছাড়া একটা বাংলা রক ব্যান্ড। সেই ধারা থেকে আমরা সরিনি। অল্প কিছু অন্যরকমের মিউজিক থাকলেও গানগুলো সবকটাই রক ঘরানার গান।

লক্ষ্মীছাড়ার নতুন অ্যালবাম

লক্ষ্মীছাড়ার নতুন অ্যালবামের গান

নব্বইয়ের দশক থেকে দু হাজার দশ। এই সময়কালে বঙ্গ-সংস্কৃতিতে বাংলা ব্যান্ডের প্রভাব ছিল বিরাট। প্রচুর বিখ্যাত বাংলা ব্যান্ড তৈরি হয়েছে ঐ সময়ে। তাদের নাম, তাদের গান এখনও ভোলেনি তরুণ-তরুণীরা। পরের প্রজন্মের অনেকের কাছেও পৌঁছেছে সেই গান। তারপর হঠাৎ ভাঁটা। এ বিষয়ে কী বলবেন?

গৌরব: এটা সিস্টেমের দোষ বলে আমার মনে হয়। টিভি আর রেডিও এই ধরনের গান চালানো বন্ধ করে দিয়েছে। এখন টিভি বা রেডিওতে নিজেদের গান চালাতে গেলে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। রেডিও-টিভির সব স্লট বরাদ্দ শুধুমাত্র সিনেমার গানের জন্য। রিয়েলিটি শোতেও সবাই অন্যের গাওয়া গান গায়। অনেকেই স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছেন। কিন্তু সেই গান মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। নতুন অনেক বাংলা ব্যান্ডও আছে। স্বতন্ত্র বাংলা গানও তৈরি হচ্ছে অনেক। কিন্তু মূলধারার মিডিয়া তাঁদের কাজ নিয়ে কথা বলছে না। আগে এইসব গান অনায়াসে মানুষের কাছে পৌঁছাত। এখন খুঁজতে হয়। তাই যাঁরা খুঁজছেন, শুধু তাঁরাই শুনতে পারছেন। তাও আমাদের গানের জনপ্রিয়তা আছে। আমদের মতো আরও অনেক স্বতন্ত্র গায়কদের জনপ্রিয়তা আছে। কারণ মানুষ আমাদের গান পছন্দ করেন।

নতুন প্রজন্মের যাঁরা বাংলা ব্যান্ড খুলেছেন বা খোলার স্বপ্ন দেখছেন, তাঁদের কী বলতে চান?

গৌরব: নিজের শিল্পীসত্ত্বা আর গান করে পয়সা উপার্জন দুটো ভিন্ন বিষয়। দুটোকে এক করে দিলে চলবে না। যাঁরা গানকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায়/চান, তাঁদের অন্যের গান তো কিছু গাইতেই হবে পেশার স্বার্থে। তবে নিজের গানকে সরিয়ে রাখলে চলবে না। নিজের গান গাইতে হবে, নিজের শিল্পীসত্ত্বার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।

সময় এখন অনেক বদলেছে। এখন মানুষের কাছে অনেক বিকল্প। তাই পছন্দ-অপছন্দও দ্রুত বদলায়। ৯০-এর দশকে সারা পাড়া একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান দেখতো। এখন আর সেই দৃশ্য প্রায় দেখাই যায় না।

ফিরে আসি নতুন অ্যালবামের প্রসঙ্গে। আপনাদের নতুন অ্যালবামের নাম ‘এক দশক পর’। আর বিখ্যাত মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের শেষ অ্যালবামের নাম ‘আবার বছর কুড়ি পরে’। নামের এই মিল কি নেহাতই কাকতলীয়?

গৌরব: একটা মিল তো আছেই। মহীনের ঘোড়াগুলির ঐ অ্যালবামটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৯৫ সালে। অ্যালবামটা ছিল মহীনের ঘোড়াগুলির সম্পাদিত বাংলা গানের অ্যালবাম। সেখানেই প্রথম গান গেয়েছিল লক্ষ্মীছাড়া ব্যান্ড। তাই খানিক সচেতনভাবে, খানিক অজান্তে মিলটা এসেই গেছে।

লক্ষ্মীছাড়া ব্যান্ডের সদস্যরা

বাংলা ব্যান্ড নিয়ে কথা বলতে গেলে অবধারিত ভাবে এসে পড়ে মহীনের ঘোড়াগুলি আর গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ। আপনার মতে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের জীবনদর্শন আজও কতটা প্রাসঙ্গিক?

গৌরব: অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। বাবা কখনোই সমাজকে নিজের মাথায় চরতে দেননি। মহীনের ঘোড়াগুলির গানে উঠে এসেছে সমাজ, সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি। এই ছোটো ছোটো শিক্ষাগুলো খুবই জরুরি। সমাজ বদলেছে, চিন্তাধারারও বদল ঘটেছে। কিন্তু যে কোনও শিল্পীরই সমাজের প্রতি দায় থাকে। সেটা পালন করার যে শিক্ষা মহীনের ঘোড়াগুলির সদস্যরা দিয়ে গেছেন, সেটা গ্রহণ করা জরুরি। অনুকরণ নয়, অনুসরণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলা দরকার। মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ড নিয়ে অনেক ভুল তথ্য ছড়িয়ে আছে সমাজ মাধ্যমে। বাপিকাকু (তাপস বাপি দাস) মারা যাবার পর অনেককেই বলতে শুনেছি, উনিই এতদিন ব্যান্ডের শেষ জীবিত সদস্য ছিলেন। কিন্তু এখনও আরও পাঁচজন সদস্য বেঁচে আছেন, কাজ করছেন। উনি মারা যাবার পর অনেক জায়গাতেই বলা হচ্ছে ‘হায় ভালোবাসি’ গানটা ওঁর একার লেখা এবং গাওয়া। কিন্তু গানটা ব্যান্ডের সব সদস্য একসঙ্গে বসে লিখেছিলেন। সুর করেছিলেন বাবা। গানটাতেও অনেকের সমবেত গলা আছে। বরং বাপিকাকুর লেখা এবং গাওয়া গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘তাকে যত তাড়াই দূরে দূরে’। আর আছে মহীনের ঘোড়াগুলির সম্পাদিত গান। যেখানে বাবা নতুন শিল্পীদের দিয়ে গান লেখাতেন, তাঁদের সঙ্গে গাইতেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে চেষ্টা করি, গানগুলো যাতে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। তিনি এবং বাকি সদস্যরা যেভাবে নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দিতেন, পাশে দাঁড়াতেন, সেটাও শিক্ষনীয়।

_________________________________________
লক্ষ্মীছাড়া ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যরা: রাজীব মিত্র (ভোকাল), গৌরব চ্যাটার্জি (ড্রামস), সংকেত ভট্টাচার্য (বেস), দেবাদিত্য চৌধুরী (কিবোর্ড), বোধিসত্ত্ব ঘোষ (গিটার), জন পল (গিটার), অনির্বাণ বব মজুমদার (ওয়ার্ডস)

Developed by DXDasia