‘A Chairy Tale’ : রবিশঙ্কর, চতুরলাল, নরমান ম্যাকলারেন ও ক্লদ জুত্রা’র অবিস্মরণীয় কীর্তি

‘চোখ শোনে, কান দ্যাখে’ একথা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন তাঁরা

৯৫৭ সালে ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ড অফ কানাডা (NFB)-র তত্ত্বাবধানে নরমান ম্যাকলারেন এবং ক্লদ জুত্রা’র যৌথ পরিচালনায় তৈরি হয় ৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডের ছোটো ছবি A chairy Tale। সে ছবিতে প্রাণদান করেছিলেন সেতার-ঈশ্বর পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও চতুরলাল। যে যে কাজের মাধ্যমে রবিশঙ্কর ভারতীয় ধ্রুপদ সংগীতের মূর্ছনা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন, তার মধ্যে এটি অন্যতম। যুগোত্তীর্ণ এই ছবিটি নিয়ে আজ আর আলোচনা হয় না অথচ, ‘চোখ শোনে, কান দ্যাখে’ একথা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন তাঁরা।

রবিশঙ্কর ও নরমান ম্যাকলারেন

নরমান ম্যাকলারেনের জন্ম স্কটল্যান্ডে। আঠেরো বছর বয়সে গ্লাসগো ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ততায় ফিল্মের শৈল্পিক দিক নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৩৫ সালে গ্লাসগো অ্যামেচার ফিল্ম ফেস্টিভালে, ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সমালোচক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা জন গ্রিয়ারসন-এর নজরে আসে তাঁর তৃতীয় ছবি ‘সেভেন টিল-ফাইভ’, পুরস্কৃত হন ম্যাকলারেন। তাঁকে চাকরির প্রস্তাব দেন লন্ডনের জি. পি. ও-এর ফিল্ম ইউনিটে। এর পরেই ১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। এর কিছুদিন পরে, বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে আমেরিকা যাত্রা এবং চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া। ততদিনে বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপ আচ্ছন্ন করেছে। এই সময়ই ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ড স্থাপন করেন গ্রিয়ারসন। ১৯৪১ সালে ম্যাকলারেনকে ফিল্ম বোর্ডে আমন্ত্রণ জানান। চলচ্চিত্রজগতে ম্যাকলারেনের ঐতিহাসিক সফর শুরু হয়। ১৯৪৯-এ চিন এবং ১৯৫৩-এ ভারতে আসেন। ১৯৫৩-তেই অস্কার পান ‘Neighbours’-এর জন্য। এই ছবিটি বিশ্বে সর্বাধিক প্রদর্শিত স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত অর্থহীন বিবাদ-বিরোধের কথা—যেখানে দুই প্রতিবেশী হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ফুলের মালিকানা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে—যার পরিণতি তাঁদের অনিবার্য মৃত্যু। যুদ্ধ সম্পর্কে এই মর্মান্তিক জবানবন্দি আমাদের বিবস্ত্র, শঙ্কিত ও সচেতন করে তোলে। ১৯৫৬-এ মন্ট্রিয়াল যাত্রা। নতুন স্টুডিও তৈরি করেন সেখানে। শেষদিন অবধি সেখানেই ছিলেন। পঞ্চাশ বছরের শিল্পী জীবনে পঞ্চাশের উপর চলচ্চিত্র (স্বল্প দৈর্ঘ্য) নির্মাণ করেছেন। ১৯৭০-এ বিবিসি ম্যাকলারেনকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপনা করে যার নামকরণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ—The Eye Hears, the Ear Sees।

টেলিভিশনের একটি কাজে রবিশঙ্কর এবং চতুরলাল যখন মন্ট্রিয়াল যান, তার আগেই ম্যাকলারেন বানিয়ে ফেলেছিলেন A Chairy Tale। কিন্তু ছবিটিতে তখনও কোনওরকম সংগীতের ব্যবহার ছিল না। ম্যাকলারেন ছবিটি দেখার আমন্ত্রণ জানান দুই সংগীত ব্যক্তিত্বকে। ছবিটি দেখার পরই রবিশঙ্কর ছবিটির জন্য সংগীত পরিচালনা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আগেই সম্পাদিত হয়ে থাকায়, ম্যাকলারেন ছবিটিকে প্রায় দশটি লুপে ভাগ করেন এবং প্রত্যেকটি লুপ ধরে ধরে সংগীত রেকর্ড করেন। সংগীত এবং পারফরম্যান্স মেলানোর জন্য প্রত্যেকটি লুপে ১০ সেকেন্ডের নীরবতা যোগ করেছিলেন। ছবিটির জন্য সেসময় স্টপ মোশন পদ্ধতিতে চেয়ারটির অ্যানিমেশন করেছিলেন ইভলিন ল্যাম্বার্ট। 

বিশ্বচলচ্চিত্রে ভারতীয় ধ্রুপদ সংগীতের ব্যবহার, তার একাগ্রতা, আজকের এই বাজারে যন্ত্রনির্ভর জগঝম্পে, আজকের প্রজন্মে, নির্বাসিত। ‘A Chairy Tale’ সেই নির্বাসিত সময়েরই ঐতিহাসিক দলিল।

ক্লদ জুত্রা ও নরমান ম্যাকলারেন

একজন মানুষের সঙ্গে তার চেয়ারের মান-অভিমান, এই ছিলো A Chairy Tale-এর প্রেক্ষাপট। অভিমানী ও অবাধ্য চেয়ারকে তাঁর মালিক (ক্লদ জুত্রা) কীভাবে তোষামোদ করে শেষপর্যন্ত বশীভূত করেন তার একটি অত্যন্ত রসগ্রাহী বিবরণ রয়েছে এই ছবিতে। যখন চেয়ারের মত আপাত নির্জীবও সজীব হয়ে মানুষের মতো ব্যবহার করতে থাকে, তখন তা আমাদেরই মনের প্রতিফলিত বিশ্বরূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। চেয়ারটির গতি এখানে নিয়ন্ত্রণ করেছে রবিশঙ্করের সেতারের সুর ও চাতুরলালের তবলার তাল। ম্যাকলারেন, রবিশঙ্কর, চতুরলালের সঙ্গে এই ছবির অন্যতম স্তম্ভ কানাডিয়ান অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার ক্লদ জুত্রা’র অভিনয়। কিউবেকের সিনেমার ইতিহাসে কেন তাঁর গুরুত্ব রয়েছে এই ছবি দেখলেই বোঝা যায়। ‘চলচ্চিত্রের একটাই উদ্দেশ্য বুদ্ধিবৃত্তিকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দেওয়া’ – ম্যাকলারেনের এই কথাটিই যেন বলে চলে এই ছবি। 

A Chairy Tale

ম্যাকলারেন ও জুত্রা’র ধৈর্য, তাঁদের মননশীলতা, তাঁদের অভিপ্রকাশ একটা বিশেষ ভাষায় কথা বলে। কিন্তু আমাদের বোধ, তাঁর বোধের গলিঘুঁজিতে, আলাপচারিতায় কতটা মনোনিবেশ করতে পারে, সেই প্রশ্ন জাগে মনে। তাকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করা যায় না। আমাদের রুচি, বোধ, সবই নয় ‘এথনিক’, নয় ‘অ্যান্টিক’ চেহারা নিচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বচলচ্চিত্রে ভারতীয় ধ্রুপদ সংগীতের ব্যবহার, তার একাগ্রতা, আজকের এই বাজারের জগঝম্পে, আজকের প্রজন্মে, নির্বাসিত। ‘A Chairy Tale’ সেই নির্বাসিত সময়েরই ঐতিহাসিক দলিল।

ঋণস্বীকারঃ

blog.nfb.ca

Wikipedia

A Chairy Tale

নরমান ম্যাকলারেনের ‘শব্দ-ছবি’, হিরণ মিত্র

 

 

Developed by DXDasia