বর্তমানে ধীমাল উপজাতির সংখ্যা মাত্র ১০০০
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২৭তম সংস্করণে সম্প্রতি প্রদর্শিত হল পরিচালক আশিস চক্রবর্তীর “ধীমাল : ইন সার্চ অফ রুটস” তথ্যচিত্রটি। আক্ষরিক অর্থেই এটি একটি গবেষণাধর্মী কাজ, যা বাংলার লুপ্তপ্রায় উপজাতি ধীমালের শিকড়কে খুঁজেছে।
ক্রমশ নিজেদের জায়গা হারাতে থাকে ধীমালরা। জুটেছে ‘ওবিসি’ তকমা। যদিও ডাল্টন, হান্টার, রিজলি প্রমুখের লেখাতে ধীমালদের উল্লেখ প্রমাণ করে এই জনগোষ্ঠীর প্রাচীনত্ব।
অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালক খুঁজে বের করেছেন উত্তরবঙ্গের হারিয়ে যাওয়া এই উপজাতির জীবনধারাকে। ২৮ তারিখ নন্দন ৩-এ ছবি শুরুর আগে বক্তব্য রাখেন পরিচালক। জানান, “আমাদের সংস্কৃতিকে হারিয়ে যাওয়া থেকে আমরাই আটকাতে পারি। এই বাংলার অতীত ঘাঁটলে অনেক অজানা কিছুর সন্ধান মেলে। যার কিছু জীবিত আছে, কিছু তলিয়ে গেছে। তবে আমাদের দায়িত্ব হারিয়ে যাওয়া তথ্যকে উদ্ধার করা।”

দার্জিলিঙের পাহাড় থেকে কোচবিহার–আলিপুরদুয়ার–জলপাইগুড়ি-সহ দুই দিনাজপুর ও মালদহতেও ধীমালদের অস্তিত্ব ছিল একসময়। তবে বিবিধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধীমালরা সামান্য হলেও আলাদা। ‘অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী’ বা ডিমিনেটিভ গ্ৰুপ অথবা হারিয়ে যাওয়া জনজাতি, এই যেন তাদের একমাত্র পরিচিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। অথচ উত্তরবঙ্গের জনজাতির ইতিহাসে তাদের অবস্থান ভোলার নয়। সম্ভবত ‘হিমাল’ শব্দটি থেকে ধীমাল কথাটির উৎপত্তি। এঁদের আদি নিবাস উত্তর ও উত্তর-পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ধীমালদের সংখ্যা ছিল প্রায় পনেরো হাজারের কাছাকাছি, এখন তা কমতে কমতে হয়েছে ১০০০ জন মতো। তাদেরও বেশিরভাগের মধ্যে নেই নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতির প্রভাব। যেন কালের গর্ভে তলিয়ে যেতে বসেছে আস্ত একটা উপজাতি। পরিচালক সেই হারিয়ে যাওয়া উপজাতির মধ্যে মিশে গেছেন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে। তাঁদের ভাষা, প্রাচীন ঐতিহ্য, উৎসব, সনাতনী জীবিকা, বিনোদন অথবা শিকার করার রীতি সবকিছুকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে। ক্যামেরা নিয়ে পৌঁছে গেছেন একেবারে ধীমালদের অন্দরে। ঘরের কাজ থেকে দাওয়ায় বসে আড্ডা, হাড়িয়া খাওয়ার রেওয়াজ থেকে বিবাহের রীতিনীতি সবকিছুকে মুহূর্তবন্দি করেছেন পরিচালক আশিস।
চৈত্র সংক্রান্তি, বর্ষবরণ, মাছ ধরার গানের মতো ধীমালদের নানান উৎসবচিত্র উঠে এসেছে এই তথ্যচিত্রে। পাশাপাশি রাখা হয়েছে ধীমালদের আজকের প্রজন্মের কথোপকথনও। একদিন অরণ্যাঞ্চল সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল বলে তরাই-ডুয়ার্সের অরণ্য থেকে ধীমালরা সরে যেতে বাধ্য হয়। তৈরি হয় বাসস্থানের সংকট। একের পর এক চা-বাগান তৈরির ফলে চলতে থাকে ক্রমাগত অরণ্য নিধন৷ ক্রমশ নিজেদের জায়গা হারাতে থাকে ধীমালরা। জুটেছে ‘ওবিসি’ তকমা। যদিও ডাল্টন, হান্টার, রিজলি প্রমুখের লেখাতে ধীমালদের উল্লেখ প্রমাণ করে এই জনগোষ্ঠীর প্রাচীনত্ব।

কয়েক বছর আগে ধীমালদের খোঁজে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল ‘বঙ্গদর্শন’। ধীমালদের সঙ্গে মিশে জানা গিয়েছিল নানাবিধ তথ্য। শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি থানার কেটুগাবুরজোত এমন একটি গ্রাম, যেখানে ধীমালরাই বেশি সংখ্যায় রয়েছেন। সেই গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ধীমালদের বিষয়ে আরও অনেক তথ্য জানা গিয়েছিল। ধীমালদের মধ্যে কন্যাভ্রুণ হত্যা কোনওভাবেই কেউ মেনে নেন না। কন্যাভ্রুণ হত্যাকে মহাপাপ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। বাল্যবিবাহও তাঁরা মানেন না। বরং পাত্রের চেয়ে পাত্রীর বয়স বেশি হলেই তাঁরা সেই পাত্রীকে সাদরে গ্রহণ করেন। বলেন, পাত্রীর বিয়ের পর সন্তান হলে মা হন। আর মা যদি একটু বাবার চেয়ে বয়সে বড়ো হয় তবে একটু পরিণত ভাবনা বা চাপ নিয়ে সংসার সামলে ছেলেমেয়ে মানুষ করতে পারেন।
যদিও অনেককিছু হারিয়ে ধীমালরা আর কতদিন টিকে থাকতে পারবেন, সেটাই বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। ধীমালদের বাড়ির সদস্য হয়ে পরিচালক আশিস চক্রবর্তী এই অসামান্য তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন৷ “ধীমাল : ইন সার্চ অফ রুটস” আসলে লুপ্তপ্রায় উপজাতির স্বপ্নের চালচিত্র। যেখানে আলোর পথই একমাত্র পথ।