ঝরা পালক : জীবনানন্দ-লাবণ্যের দাম্পত্য জীবনগাথায় প্রেম-অপ্রেম-বিষণ্ণতা

সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘ঝরা পালক’-এর একটি ব্যক্তিগত পাঠ

“বাংলা সাহিত্যকে তাহলে তোমার দাদা অনেককিছুই দিয়ে গেলেন, কিন্তু আমার জন্য কী রেখে গেলেন?” —  জয়া আহসানের মুখে এরকমই একটি সংলাপ দিয়ে শেষ হয় ‘ঝরা পালক’ চলচ্চিত্র। স্বামী জীবনানন্দ দাশের (Jibanananda Das) মৃত্যুর পর স্ত্রী লাবণ্যের চিরকালীন না পাওয়ার ক্ষোভ, জীবন যন্ত্রণার অসহায়তা অসাধারণ ভাবে ফুটে উঠেছে শেষ সংলাপের মধ্য দিয়ে। ‘ঝরা পালক’ (Jhara Palok) অনেকের মতে কবি জীবনানন্দ দাশের বায়োপিক। যেখানে কবির জীবন বহুমুখী ও বিস্তৃত। কবিজীবনের মতোই চলচ্চিত্রের ঘটনা পরম্পরায় রয়েছে হতাশা, যন্ত্রণা, বিদ্রোহ আর তুমুলভাবে বেঁচে থাকার প্রতিচ্ছবি।

এ ছবির কেন্দ্রে রয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশের দাম্পত্য জীবনের ধূসর কাহিনি। রয়েছে লাবণ্য এবং জীবনানন্দের সাংসারিক টানাপোড়েনের গল্প। পাশাপাশি রয়েছে সে সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট, কবি মহলে জীবনানন্দ দাশের অবস্থান এবং কবির জীবনের পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব।

কবিতার জগতে ‘ঝরা পালক’ শব্দের নতুন করে পরিচিতির প্রয়োজন পড়ে না। বাংলা সাহিত্যের ‘নির্জনতম কবি’ হিসেবে পরিচিত জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামানুসারে ছবির নাম রাখা হয়েছে ‘ঝরা পালক’। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ‘ঝরা পালক’-এর শুটিং শুরু হলেও নানা কারণে ছবি মুক্তির তারিখ ক্রমাগত পিছিয়েছে। তার পরেই করোনা মহামারির থাবা। ফলে সিনেমা হলে পৌঁছতে পারেনি ‘ঝরা পালক’। অবশেষে গত ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রবীন্দ্র সদনে প্রথমবারের জন্য দেখানো হল পরিচালক সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়ের (Sayantan Mukherjee) ছবি ‘ঝরা পালক’।

কবির দুই বয়সের চিত্রকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ ছবিতে। তরুণ জীবনানন্দ দাশের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাহুল অরুণোদয় বন্দোপাধ্যায় এবং পরিণত বয়সের কবির চরিত্রে রয়েছেন ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)। কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান (Jaya Ahsan)। এছাড়া, ছবির নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা গিয়েছে দেবশঙ্কর হালদার, কৌশিক সেন, সুপ্রিয় দত্ত, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক অভিনেতাকে।

ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, – ক্লান্ত শেষ প্রহরের শশী / অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যাবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী / নিঝুম বিছানার পরে / মেঘবৌর খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে / চেয়ে থাকি চোখ তুলে – যেন মোর পলাতকা প্রিয়া…

জীবনানন্দ দাশের গল্প বা উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করতে গিয়ে দেখা যাবে তাঁর রচনার অধিকাংশই আত্মজৈবনিক উপাদান এবং দাম্পত্য ও দাম্পত্যবহির্ভূত সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রেম-অপ্রেমে গড়া। কখনও অসফল প্রেম, অতৃপ্ত দাম্পত্য, আবার কখনও বেকারত্ব ও দারিদ্র্য তাঁর গল্পগুলোকে পৌনঃপুনিকতায় ক্লান্ত করে। ১৯৩০ সালে বিবাহের পর ১৯৩১ সালে বেকার অবস্থায় তাঁর মেয়ে মঞ্জুশ্রীর জন্মের পরই গল্প লেখা শুরু করেন এবং তিন বছরে শ’খানেক গল্প ও আটটি উপন্যাসও লিখে রেখেছিলেন তিনি। তবে সেগুলোর কোনোটিই কেন কোথাও ছাপতে দেননি, সে এক বিস্ময়! কোনো এক সেকেলে তোরঙ্গে সবটুকু জমিয়ে রেখেছিলেন কবি। এ ছবিতে রয়েছে সেই প্রসঙ্গও।

তাঁর বেশিরভাগ গল্পেই স্বামী বেকার কিংবা সংসারে অর্থাভাব, স্ত্রী সচ্ছল পরিবারে লালিতা, স্বামী উদাসীন ও সদা অভিযোগপ্রবণ। গল্পগুলোয় নিজেকে লুকোনোর কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি, স্ত্রী লাবণ্যর জন্যও রাখেননি কোনো ছদ্মবেশের সুযোগ।

জীবনানন্দ দাশের ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নির্মিত হয়েছে ‘ঝরা পালক’। উপন্যাসে উৎপলার বাইরেও তাঁর অনেক গল্পের কাহিনিতে বারবার চলে এসেছেন লাবণ্য দাশ, একই ভূমিকায়। ‘মাংসের ক্লান্তি’ গল্পের হেম, ‘মা হবার কেনো সাধ’-এর শেফালী, ‘শাড়ি’-এর ঊষা, ‘কোনো গন্ধ’-এর কাঞ্চনমালা, ‘বত্রিশ বছর পর’-এর স্বর্ণ, ‘চাকরি নেই’-এর নির্মলা— এমন বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে এসব স্ত্রীরা স্বামী উৎপীড়নকারী চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত। এমনকি ‘নষ্ট প্রেমের কথা’-তে মোহিতের বউ হয়ে আসার দিন থেকেই সুরূপা নিজমূর্তি ধারণ করে, ‘বাসর রাত’-এর মনিকা প্রথম দিন থেকেই স্বামীর সঙ্গে শুরু করে দুর্ব্যবহার; ‘সুখের শরীর’ গল্পে ‘বউকে ঘরে আনার পর থেকেই’ যেমন ‘নিরুপম’-এ রকম পথহারা পথ-উদাসী হয়ে যায়। এ ছবিতেও পরিচালক সেই দিকটি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জয়া আহসান অভিনীত লাবণ্য চরিত্রটি কখনও স্ত্রী, কখনও বারবনিতা, কখনও আবার দেবী রূপে আবির্ভূত হয়েছে পর্দায়।

অতৃপ্ত প্রেম আর দ্বান্দ্বিক দাম্পত্যের জীবন্ত খতিয়ান এবং কোনোও এক নিভৃতচারী কবির যাপনচিত্র, সবটাই যেন মিলেমিশে গিয়েছে এ ছবিতে। চমৎকার পরিচালনায়, জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো গভীর চিত্রনাট্য ও সংলাপে, প্রত্যেক অভিনেতার অসামান্য অভিনয়ে এ ছবি প্রাণ পেয়েছে।

আগামী ১ মে রবিবার দুপুর ২টো থেকে নজরুল তীর্থ ২-এ দ্বিতীয়বারের জন্য প্রদর্শিত হবে ‘ঝরা পালক’। কবি, সাহিত্যিক জীবনানন্দের জীবনবেদ ও বোধের নিরানন্দ ভূমিতে নতুন করে আলোর হদিশ করতে চাইলে এই ছবিটি আপনার দেখার তালিকায় রাখুন।

Developed by DXDasia