
আজ হাঁটব ক্যানিং স্ট্রিট এবং ব্র্যাবোর্ন রোডের আনাচে কানাচে
আর্মেনিয়ান চার্চ
“আগামী সপ্তাহে আমরা ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিটে যাব” – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষ করেছিলাম গত পর্ব। আজ কলকাতার অন্যতম পুরোনো অংশ ঘুরে দেখাব আপনাকে। ব্রিটিশরা পা ফেলারও আগে এইসব অঞ্চলের কোথাও কোথাও জনবসতি গড়ে উঠেছিল। আমরা যাত্রা শুরু করব জিপিও থেকে। ইন্ডিয়া এক্সচেঞ্চ প্লেস পার হয়ে বাঁদিকে ঘুরে হাঁটতে থাকব রাধাবাজার স্ট্রিট হয়ে। যেটা গিয়ে ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিটে মিশেছে। এই বাজারের নামও এক সময় ছিল রাধাবাজার। মালিক ছিল আর্মেনিয়ান আপকার পরিবার। রাধাবাজারের নামটি এসেছে রাধানাথ ঠাকুরের সূত্রে। ঠাকুর পরিবারই ছিল জমিটির আদি মালিক।
কয়েকটি নথি থেকে জানা যায়, চায়না বাজারের ইতিহাস শুরু হয়েছে সেই ১৭৫৭ সাল থেকে। যেহেতু চিনা বাসনপত্র এবং চিন দেশের নানা সামগ্রী বেচাকেনা হত, সেখান থেকেই ‘চায়না বাজার নামটি এসেছে। বর্তমানে এমন কিছু নেই, যা ওই বাজারে পাওয়া যায় না। আক্ষরিকভাবেই কথাটি সত্য। তবে পাইকারি ব্যবসাই হয় বেশিরভাগ দোকানে। ছোটো ক্রেতারা খুব কম দোকান থেকেই কিনতে পারবেন।
আরও পড়ুন: এসপ্ল্যানেড – পুরোনো কলকাতার হৃৎপিণ্ড
আর্মেনিয়ান চার্চ
১৭ শতকের শেষে কলকাতায় প্রথম আসেন জোব চার্বক। আর্মেনিয়ানরাও প্রায় সেই সময়েই আসেন। তবে এখনকার আর্মেনিয়া দেশ থেকে নয়। পশ্চিম এশিয়া থেকে। ইউরোপ থেকে বাংলায় প্রথম আসেন পর্তুগিজরা। ১৬ শতকে। চুঁচুড়া অঞ্চলে ওলন্দাজরা বসতি গড়েন ১৬১০ সাল নাগাদ।
ব্রিটিশরা জাঁকিয়ে বসার আগে কলকাতার সবচেয়ে ধনী সম্প্রদায় ছিলেন আর্মেনিয়ানরা। ব্যবসায়ী বুদ্ধির জোরে সমৃদ্ধির শিখরে উঠেছিলেন। কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো সব অট্টালিকা এঁদেরই বানানো। খোঁজ নিলেই জানতেই পারবেন, এক সময় চাতার, আপকার, গালস্তাউন প্রভৃতি আর্মেনিয়ান পরিবার থাকত সেইসব প্রাসাদে।
ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিট যেখানে ক্যানিং স্ট্রিট পার হয়ে ডান দিকে আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে ঘুরেছে, সেখানেই দেখতে পাবেন চার্চ অফ দ্য হোলি নাজারেথ। সাধারণভাবে আর্মেনিয়ান চার্চ নামেই পরিচিত। ১৭০৭ সালে প্রথমে কাঠ দিয়ে এটি গড়ে তোলা হয়। কয়েক বছর পরে আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে যায় গির্জা। ইট এবং মর্টার দিয়ে আবার গাঁথনি উঠল ১৭২৪ সালে। কয়েক দশক পরেই সেন্ট জন’স চার্চ প্রতিষ্ঠিত হবে মহানগরে। আর্মেনিয়ান চার্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য হল প্রাচীন সমাধিশিলা। যেগুলো মধ্যে বেশিরভাগের গায়ে সিরিলীয় লিপি খোদাই করা। রাশিয়ান এবং আরও কয়েকটি ভাষায় এই বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়।
আজও বিতর্কিত হয়ে আছে কয়েকটি সমাধি। যেমন রেজাবিবির কবর। তিনি ছিলেন ‘প্রয়াত দানশীল বণিক সুকিয়াস’-এর স্ত্রী। ১১ জুলাই ১৬৩০ সালে মারা যান। সমাধিফলকে লেখা কথাগুলি যদি বিশ্বাস করা হয়, এটিকেই কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো খ্রিস্টান কবর বলতে হবে। প্রশ্ন ওঠে, গির্জা তৈরি হয়েছিল ১৭০৭ সালে, তাহলে এই সমাধিফলক এল কোথা থেকে? তাতে সিরিলীয় লিপির বদলে কেন ইংরেজি ভাষা খোদাই করা?

ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ
ক্যানিং স্ট্রিট বা বিপ্লবী রাসবিহারী বসু রোড যেখানে ব্র্যাবোর্ন রোডে পড়েছে, তার ডান দিকে ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ দাঁড়িয়ে। কলকাতায় অল্প কয়েকজন ইহুদি থাকেন। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা বহু শতাব্দী আগে ভারতে পা রেখেছিলেন। বেশিরভাগ ইহুদি বাস করতেন ভারতের পশ্চিম অংশে। ১৭৯০ সাল নাগাদ ব্যাবসা করতে আমাদের তিলোত্তমায় চলে আসলেন তাঁদের একটা অংশ। ধনসম্পদে ফুলেফেঁপে উঠতে থাকলেন। ভারত স্বাধীন হলে বেশিরভাগ ইহুদি চলে যান ইসরাইল। আজ খুব নগণ্য সংখ্যকই রয়েছেন কলকাতায়।

এখন যেখানে ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ দাঁড়িয়ে, আগে সেখানে নেভে শালোম সিনাগগ ছিল। তৈরি হয়েছিল ১৮২৬ সালে। আজও তার অংশবিশেষ চোখে পড়ে। ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ নির্মিত হয় ১৮৮৪ সালে। সেবছরই কলকাতা পায় তার প্রথম ইহুদি শেরিফ – এলিয়াস ডেভিড জোসেফ এজরা। এখন সিনাগগ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ করে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ। আপনি কেবল বাইরে থেকে ছবি তোলার অনুমতি পাবেন। প্রতি শনিবার ইহুদি সাবাথের দিন সিনাগগ খোলা থাকে।

পর্তুগিজ চার্চ
ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ দেখার পর ব্র্যাবোর্ন রোড পার করে চলে যান পর্তুগিজ চার্চে। আগে যার নাম ছিল ক্যাথিড্রাল অফ দ্য হোলি রোজারি। ১৭৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গির্জা কলকাতার প্রথম ক্যাথলিক উপাসনাকেন্দ্র। কেউ কেউ বলেন, ১৭০০ সাল থেকে এখানে ছিল অর্ডার অফ সেন্ট অগাস্টাইনের প্রার্থনাগৃহ। অ্যাংলিকান ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় ১৮ শতকে কিছু সময় এই চার্চ বন্ধ ছিল। তবে এখন পুরোদমে খোলা। প্রচুর লোকের আনাগোনা লেগেই আছে।

সইফি মসজিদ
ক্যানিং স্ট্রিটের ক্রসিংয়ে ফিরে এলে দেখতে পাবেন একটি মসজিদ। বোহরা মুসলিমদের উপাসনাকেন্দ্র। কোনো এক সৈফুদ্দিনের নামে মসজিদের নামকরণ হয়েছে। এটি মাত্র ১৩০ বছরের পুরোনো। আগে যে ক’টি ধর্মীয় স্থান ঘুরলাম, তাদের বয়স অনেক বেশি। তবে স্থাপত্য এবং রঙের কারুকার্যের জন্য মসজিদটি আকর্ষণীয়।
আজকের ছোট্ট সফরে দুটি গির্জা, একটি সিনাগগ এবং একটি মসজিদ দেখলাম। পুরোনো কলকাতায় নানা সংস্কৃতির কীভাবে সমন্বয় ঘটেছে, উপলব্ধি করা যায় সহজেই। পরের সপ্তাহে এই অঞ্চলেই হাঁটব। ঘুরে দেখব আরও কিছু দ্রষ্টব্য।

