
শুধু শরীর নয়, এ শহরের একটা মনও আছে
যত দিন গেছে, যত পথ হেঁটেছি, “কি এক ইশারা যেন মনে রেখে এক-একা শহরের পথ থেকে পথে/ অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;/ তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে…” এই শহরে দিনের পর দিন জীবনানন্দের ‘পথ হাঁটা’ বুঝেছি আমি। বুঝেছি শুধু শরীর নয়, এ শহরের একটা মনও আছে…তার উচ্চতার কাছে মনুমেন্টও ফেল! কলকাতার পথঘাটই তার প্রমাণ।
হাজার দুয়েকের ওপর নানা মাপের, নানা নামের, নানা পথ আছে কলকাতায়। কলকাতায় রোড, রো, স্ট্রিট, লেন, বাইলেন –রাস্তার কত রকমফের! আদি কলকাতায় দু’রকম ভাবে রাস্তা তৈরি হয়েছিল। জঙ্গল, বাদা সাফ করে চওড়া রাস্তা আর নদী, খাল, নর্দমা বুজিয়ে গলি বা লেন। তবে, আদি কলকাতার মানচিত্রে এত সব পথের বাহার ছিল না। ১৭৪২ সালে মার্ক উডের আঁকা কলকাতার মানচিত্রে পথগুলোর অন্য রকম পরিচয় পাওয়া যায়। সেই মানচিত্রে পথের সংখ্যা ছিল ২৬টি। এর মধ্যে ২০ জন ইংরেজ রাজপুরুষের নামে আর ৬টি ছিল বাঙালিদের নামে—মদন দত্ত, প্রাণকৃষ্ণ বাবু, নীলু দালাল, নারায়ণ চ্যাটার্জি, মুক্তারাম বাবু ও বলরাম ঘোষ। এ ছাড়া কিছু কিছু পথের নামকরণ তখন হয়েছিল, যেমন ধর্মতলা স্ট্রিট, বৈঠকখানা স্ট্রিট বা বোবাজার (বৌবাজার নয়), জানবাজার রোড ইত্যাদি। এবং মানচিত্রে প্রধান প্রধান পথগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘রোড টু চৌরঙ্গি’, ‘রোড টু চিৎপুর’ বলে। চিৎপুর রোড কলকাতার প্রাচীনতম পথ। মোঘল বাদশাহের আমল থেকেই পথটির অস্তিত্ব। তখন চিৎপুরের দু’পাশে গভীর জঙ্গল। এমনকি ১২৩২ সালের ২৭ আষাঢ়ের ‘সমাচার দর্পণ’-এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বাঘ-টাঘও চরে বেড়াতো এ অঞ্চলে।
বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় কলকাতা হয়ে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বকলমে ইংরেজ শাসিত ভারতের রাজধানী। দ্রুত ফুলে ফেঁপে উঠে কলকাতা তখন মহানগর – তার ছত্রছায়ায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসতে শুরু করলো এবং যথারীতি বসবাসের হিড়িক পড়ে গেল। লোকসংখ্যা, ঘড়বাড়ির সঙ্গে বাড়তে থাকলো পথের সংখ্যাও।
১৮৭৬ সালে ‘ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল কনসলিডেশন অ্যাক্ট’ আইনের বলে ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় পথ নির্মাণ ও তার নামকরণের কাজও দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে। আর এই নামকরণের মধ্য দিয়ে এই শহরের এক বিশেষ চরিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে জন্ম নেয় পথের নামকরণের এক বিশেষ ধারা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইংরেজদের মুখ্য ভূমিকা থাকায় স্বাভাবিক ভাবেই কলকাতার বাছাই করা পথের নামকরণ বড়োলাট, ছোটোলাট বা ঐ ধরনের ইংরেজ কেউকেটাদের নামে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল এবং হয়ও তাই। অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত ছিল এমন ইংরেজদের নামের পাশাপাশি ইহুদি, জার্মান, পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ানদের নামও খুঁজে পাওয়া যায়। আছে নানা দেশের নানা মানুষ।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য-কুঠি যিনি কলকাতায় প্রথম গড়লেন, সেই জোব চার্নকের নামে এখন কোনও রাস্তা না থাকলেও, আগে ছিল—চার্নক প্লেস। ক্লাইভের নামে রাস্তা ছিল—ক্লাইভ স্ট্রিট, সেই নাম পাল্টে এখন নেতাজী সুভাষ বসু রোড হয়েছে। মধ্য কলকাতায় ব্রিটিশ আমলের লর্ড বেন্টিঙ্ক, জেনারেল আউটরাম, বড় ব্যবসায়ী উইলিয়াম ফেয়ারলি, সেকালের বাণিজ্য পর্ষদের সভাপতি স্যামুয়েল মিডলটনের নামে যথাক্রমে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট, আউটরাম রোড, মিডিলটন রোড রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে দেওয়া অনেক পথের নাম পাল্টে দেশীয় লোকজনদের নাম বসানো হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর।
মুর্শিদাবাদের নবাবদের কথা মনে করানো ‘নবাবপট্টি স্ট্রিট’ বাদে খাস নবাবদের নামে তেমন কোনও পথ না থাকলেও টিপু সুলতান ও তার ছেলেদের নামে পথ আছে কলকাতায়। রাজা-মহারাজাদের মধ্যে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের মতো রাজার নামে পথ কমই আছে। যা আছে তার বেশিরভাগই উপাধি পাওয়া—রাজা রামমোহন রায় তার হাতে গরম উদাহরণ। আগেকার আমহার্স্ট স্ট্রিটের নাম বদলে রাখা হয়েছে রাজা রামমোহন রায় রোড।
রাজা-মহারাজা-প্রভাবশালীদের পাশাপাশি নানান পেশায় থাকা অতি সাধারণ মানুষের নামেও পথ আছে। শিক্ষাবিদ হিসেবে বিদ্যাসাগর এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম আছে। আছে দেশ-বিদেশের বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম—লেনিন, হো-চি-মিন, সূর্য সেন, পুলিন দাস, বিনয়, বাদল, দীনেশ। কলকাতার পথনামের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে বড়ো পরিবারের বংশ পরম্পরায় নাম রাখা। এর অব্যর্থ উদাহরণ- ঠাকুরবাড়ি। দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের নামে পথ আছে। পোস্তার রাজা রাজনারায়ণ, ছেলে রাজা ব্রজেন্দ্র, নাতি দীনেন্দ্রর কথাও এ ক্ষেত্রে বলা যায়।
কলকাতার পথের নামের মধ্যে ডাক্তার-বদ্যির পাশাপাশি হেকিমি চিকিৎসকরাও রয়েছেন। অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার বিধান রায়, গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জি, হোমিওপ্যাথ ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের পাশাপাশি কবিরাজ শ্যামাদাস বাচস্পতি, হাকিমি চিকিৎসক আজমল খানকে খুঁজে পাওয়া যায়। বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, গিরিশ অ্যাভিনিউ, কৃত্তিবাস রোড, কালীপ্রসন্ন সিংহ স্ট্রিট, সত্যজিৎ রায় ধরণী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরণি, প্রমথেশ বড়ুয়া সরণি, ওস্তাদ এনায়েৎ খান অ্যাভিনিউ, আচার্য জগদীশ্চন্দ্র বসু রোড, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোড, পি সি সরকার সরণির মতো পথগুলো সাহিত্যিক, নাট্যকার, পরিচালক, সঙ্গীত শিল্পী, বিজ্ঞানী, কৃতি জাদুকরের নাম বহন করে চলেছে। প্রখ্যাত কুস্তিগীর গোবর গুহ’র নামেও পথ আছে কলকাতায়। আছে জাঁদরেল পুলিশকর্তা জন ইলিয়টের নাম বহনকারী ইলিয়ট রোড, তেমনই মনোহর পুকুর রোড বহন করে চলেছে মনোহর ডাকাতের নাম; চোরবাগান, চোরাবাজারও আছে।
পথনামের ক্ষেত্রে কলকাতা জাতপাত, শ্রেণী, বর্ণের ঊর্ধ্বে। মুখোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়, বসু, মিত্র জাতীয় উচ্চ বর্ণের পদবী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কলকাতার পথের নামে এখনও বেঁচে আছে বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিট, রামমোহন বেরা লেন, গোপী মণ্ডল লেন, তারক প্রামাণিক রোড। পাঁচি ধোবানির গলি, অখিল মিস্ত্রি লেন, গুলু ওস্তাগর লেন, হিংগন জমাদার লেন, চমরু খানসামা লেন-এর মতো পথগুলি বুঝিয়ে দেয় কলকাতা অস্পৃশ্যতার ধার ধারেনি।
ইংরেজ, পর্তুগিজ, ইতালি, ইহুদি, চীন, ভিয়েতনাম, আর্মেনিয়ান, পার্সি মানুষের নাম যেমন পাওয়া যায় কলকাতার পথনামের মধ্যে, তেমনি পাওয়া যায় দেশের পাঞ্জাব, কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, উত্তর প্রদেশ ও অন্যান্য রাজ্যের মানুষের নাম। এ শহর আয়তনে যত বেড়েছে, বেড়েছে তার হৃদয়ও। কলকাতার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অভিন্ন অংশ কলকাতার পথনাম, এ এক অন্য জগৎ–সম্প্রীতির জগৎ, বিশ্বজনীনতার জগৎ।
তথ্যসূত্রঃ
কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত : বিনয় ঘোষ, কলকাতার পথঘাট : প্রাণতোষ ঘটক, কলকাতার পথের পাঁচালি : ড. জলধর মল্লিক
