বেনজির সফরের বন্দোবস্ত করেছেন দাওয়া তেনজিন
দার্জিলিংয়ের কথা শুনলেই প্রথমে মনে পড়ে তুষারধবল কাঞ্চনজঙ্ঘা, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগান, অর্কিড, পাইন, রডোডেনড্রন এবং বাঁশি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে চলা টয় ট্রেন। তবে কেবল এটুকুতেই পাহাড়ের রানিকে চেনা যাবে না। স্থানীয় মানুষদের রোমাঞ্চকর জীবনযাত্রাও উল্লেখ করার মতো। পাহাড়ে থাকার ফলে কঠোর সংগ্রাম তাঁদের চিরসঙ্গী হয়ে গিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রক্তে বয়ে চলেছে অ্যাডভেঞ্চার। অজানাকে জানার দুর্দম নেশা তাঁরা পর্যটকদেরও উপহার দিতে চান।
আরও পড়ুন: সংগীত গুহার দেশ চামুরচি
যেমন তরুণ উদ্যোগপতি দাওয়া তেনজিন। পর্যটকদের ল্যান্ড রোভারে বসিয়ে তিনি দার্জিলিং ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। কিন্তু ল্যান্ড রোভার কেন? বঙ্গদর্শনকে তিনি জানালেন, “এই গাড়ি আমাকে শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস দেয়। ১৯৫৭ সিরিজের এই ল্যান্ড রোভার চালিয়ে দারুণ গর্ব অনুভব করি। কারণ পুরোনো দিনের ঐতিহ্যবাহী গাড়ি আবার পাহাড়ে ফিরিয়ে এনেছি আমি।”

পাহাড়ি এলাকায় ল্যান্ড রোভার গাড়ির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের চা বাগানের মালিকরা ফার্স্ট সিরিজ ল্যান্ড রোভার (১৯৪৮-১৯৫৮) প্রথম নিয়ে আসেন কলকাতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রোভার মোটর কোম্পানি চালু করে এই সিরিজ-১ ল্যান্ড রোভার। চারটে চাকা, লো গিয়ারিং, অ্যালুমিনিয়ামের শরীর এবং দুই লিটার পেট্রলের ৪টি মোটর সিলিন্ডার। ব্রিটিশ চা বাগানের মালিকরাও এক সময় পাহাড়ের দুর্গম খাড়া পথে চা পরিবহনে ব্যবহার করতেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় মানুষদের কাছে থেকে যায় ল্যান্ড রোভার।
দার্জিলিং ভ্রমণের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন তেনজিন নিজের www.series1.in ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। তাঁর কথায়, “১৯৫৪ সাল থেকে আমাদের কাছে রয়েছে সবচেয়ে পুরোনো মডেলের ল্যান্ড রোভার। এই মডেলের অল্প কিছু পার্টস আজও পাওয়া যায়। তবে বেশিরভাগ পার্টসই এখন বাজারে মেলে না। নতুন ধরনের পার্টস দিয়ে কাজ চালাতে হয়। আমাদের গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশ পার্টসই নতুন রকমের।

শুরুর দিকে দাওয়া তেনজিনের কাজ সহজ ছিল না। যদিও বাধা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল তাঁর প্যাশন। ভ্রমণের বেশ কয়েকটি প্যাকেজ রেখেছেন তিনি। ‘দার্জিলিং সিটি ট্যুর’-এ ঘুরে দেখানো হয় ঐতিহ্যবাহী হোটেল, বাংলো এবং অন্যান্য হেরিটেজ এলাকা। ‘টি গার্ডেন ট্যুর’-এর মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত দার্জিলিং চায়ের পাতা তোলা থেকে বাক্সবন্দি করা পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়া নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাবেন। আরেকটি প্যাকেজের নাম ‘অ্যাডভেঞ্চার উইথ সিরিজ-ওয়ান’। যাতে রয়েছে টয় ট্রেন চড়া, প্যারাগ্লাইডিং, মাউন্টেন বাইকিং, পাহাড়ে ওঠার মতো রোমাঞ্চ। ল্যান্ড রোভার করে নিয়ে যাওয়া হবে ১০ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে টংলু শৃঙ্গে। সেখানে ক্যাম্পে সারা রাত কাটানো এবং নানা রকম মজার বন্দোবস্ত থাকবে। আরেকটি আকর্ষণীয় প্যাকেজ ‘এক্সপিরিয়েন্স দ্য কলোনিয়াল এরা’। পর্যটকদের জন্য ব্রিটিশ বাংলোতে রাত কাটানোর পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস এবং প্রকৃতি দেখার আয়োজন করেছেন তেনজিন।
আরও পড়ুন: এসপ্ল্যানেড – পুরোনো কলকাতার হৃৎপিণ্ড
পাহাড় ভ্রমণে ল্যান্ড রোভার আলাদা অনুভূতি এনে দেয়। তেনজিন বলেন, “পাহাড়ের আঁকাবাঁকা চড়াই-উতরাই পথে এই গাড়ি আরামেই চালানো যায়। যাঁরা অন্য গাড়ি চালান, সহজেই পার্থক্যটা বুঝবেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে ল্যান্ড রোভার অপরাজেয়। রাস্তার অনেক বাধা কাটিয়ে উঠতে পারে না অন্য সব গাড়ি। কিন্তু ল্যান্ড রোভার অবলীলায় চলাফেরা করা। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর সারা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র দার্জিলিংয়ে এই গাড়ি কাজ করার উপযোগী রয়েছে এখনও। সুতরাং তাকে ব্যবহার করাই উচিত।”

সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং আরও কয়েকটি সংস্থার উদ্যোগে দার্জিলিংয়ে প্রদর্শিত হয় ১৯৫০-এর দশকের সিরিজ ল্যান্ড রোভার গাড়ি। কোভিড মহামারির কারণে বিপর্যয় এসেছে পর্যটনে। তবে দাওয়া তেনজিনের মতো লড়াকু মানুষেরা হার মানতে নারাজ। অসম্ভব বলে তাঁদের অভিধানে কিছু নেই। পরেব বার দার্জিলিং গেলে ল্যান্ড রোভারের মজা নিতে ভুলবেন না।
দার্জিলিংয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব মেঘবালিকা ট্যুরিজম প্রপার্টি। সেখানেই কয়েকদিন থেকে নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারেন নানা গন্তব্যে। প্রয়োজনে ফোন করুন ৯৭৩৩০০৮৭৭৫ নম্বরে। এছাড়া দার্জিলিংয়ে বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল এবং রিসর্ট আছে। বুকিং এবং অন্যান্য তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন –
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd.
Udayachal Tourist Lodge
DG Block (1st floor), Sec II, Salt Lake, Kolkata – 700091
Phone: 033 2358 5189
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
Website: https://www.wbtdcl.com/
